সৌমনা দাশগুপ্তের কবিতা

ছায়াশলাকার ঘর

অ্যাসিডবৃষ্টি। ভিজে যাচ্ছে মহাফেজখানা। দেহ এক হাড়ের দলিল। দেহ এক অস্থাবর ভূর্জপত্র। সেঁকে নাও। তুলো উড়িয়ে দিতে দিতে হাসিতে ভেঙে পড়ছে বালিশ। বিছানা ছিল না। শুধু এক অদৃশ্য খাঁচার ভেতর শুকিয়ে যাচ্ছে নগরকীর্তন। গান খুলে রাখা দিনে খরিশগোখরো এসে ঢুকে যায় এই ঘরে। আর শব্দবীজ ছিটিয়ে দিতে গিয়ে ছিপিখোলা বোতল থেকে উথলে উঠছে কালো কবুতর।
হাড় বাজছে, হাড়…
##

আয়ুধ লুকিয়ে রাখি ঢেকে রাখি শব ও নগ্নিকা
ছিন্নভিন্ন চরাচর সাধনায় সঙ্গী হয়েছিল কে যে কার
#

আমার ভুলের নিচে চাপা পড়ে এককোষী প্রাণ
সে প্রাণে জোছনা লেগে সেই প্রাণে জোনাকির স্তব
#

আমি এক বানভাসি একতারা ডুবে আছে জলে
ঘাম পড়ে ভুল শামাদানে; কে কার শ্রাবণে সুর ঢালে
#

পড়েছিল শাদা পাতা। তাতে ছাড়ি নিযুত ময়ূর
অখিল হরিণ পাণে ছুটে আসে দৌড়
#

তবুও জলের কাছে বারবার স্বপ্ন খুলে ধরি
জড়গাছে পাতা আসে, মায়াবৃক্ষের ডালে ডালে অস্থি-কুসুম
#

আমি শুধু ভাঙা হাড়ে লাগিয়েছি স্ক্রু
ঘুরেছি লাটিম যেন এর ঘর তাদের দরোজা
#

পাবক আছেন সাক্ষী; আর জানে জল ও বাতাস
বসন্ত শোধন করে কবচ কুণ্ডল রেখেছিলে
#

বোবা মুখ সারি সারি পিউ কাঁহা বলেছে কোকিল
#

রুদ্রপলাশের জন্য এত হাহাকার! এখনও অনেক ধার বাকি পড়ে আছে বরফকলের কাছে। হিম নামাও, হিম নামাও… আর কতবার খুলে খুলে রাখবে এই চাকা। ডায়েরিভর্তি পাহাড় নিয়ে উচ্চতার দিকে চলে যাচ্ছে জুতো। রুকস্যাক খুলতেই যে প্রজাপতি জিভের ওপর এসে বসে পড়ল, তার রং কালো, পিকচার পোস্টকার্ড এসব কিছুই টের পাচ্ছে না। সে শুধু বারবার হাত পিছলে চলে যাচ্ছে অভ্যেসের কাছে…
##

ছায়াশলাকার ঘর; সারটুকু খুঁটে নিয়ে আসা
লবণে হলুদে তাকে জারিয়ে তুলছে যেন সোনামুগ
বাসটুকু বুকে নিয়ে অখিল গেরস্তি খেলে সূর্য
#

রোদ নেমে গেলে পরে সেখানে জিরেন নিচ্ছে চরাচর
তবে ধুয়ে মুছে ফেলি এতসব অক্ষর বিলাপ
আরামকেদারায় ঠেস; রাত্রির স্নায়ুগাছ লিখছে ঊর্ণাজাল
#

খোলো খোলো খুলে রাখো দিকচক্রবাল
এখানে সীমান্ত বলে কোনো কথা নেই, নেই কাঁটাতার
কাছাকাছি পাশাপাশি শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকা দিনরাত
#

অশ্রুবীজের মালা হাতে ধরণী বসেছে একা হুতাশনে
#

পত্রমোচনের দিন; গাছটি সশব্দে ফেটে যায়
যুদ্ধের সময় এল, কত কত ক্ষেপণাস্ত্র
ছুটছে ছুটছে শুধু ছুটছে
#

বিদ্ধ করো বদ্ধ করো কে হাঁকে উন্মাদ এক
ক্ষয় ও খরার মাঝে জীবচক্র
#

বালির ওপর দাগ কাটতে কাটতে সে আসলে শল্যবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠছিল। তারপর ঘুম আসে। আসলে ঘুম নয় ঘোর আসে। সে তখন নিজেই নিজের ঘাতক । খাঁড়ায় শান দেয়। দলে যাচ্ছে রক্তজবা। থেঁতলে যাচ্ছে। পিষে যাচ্ছে। তার পায়ের পাতা ক্রমে ক্রমে লাল হয়ে ওঠে। এই লাল রং তাকে দীক্ষিত করে আগুনে। তারপর দাবানল। শেষ দৃশ্যে সে একজন জ্বলন্ত গাছ। শেষ দৃশ্যে সে একজন উড়ন্ত গাছ। রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ছে…
##

শাটার নামছে চুল্লিতে
জলভরা বাটি আর, দর্পণে মুখ
মুখ শুধু বেঁকেচুরে যায়
#

বাটি চালানোর প্রহর। কেউ যেন সিঁধ কাটে
তার দেহ ঢাকা আছে কালো ও গভীর এক জোব্বায়
লাল-চোখে ঝরছে আগুন
#

জরা জরা জরা জরা
শোক শোক শোক শোক
#

তাপসহ হয়ে ওঠে দেহ-মৃদঙ্গ
টাং টাং বাজছে চামড়া
কিমাশ্চর্যম
#

টান মারছে মুণ্ড ধরে
শিয়রে কাঁটা নিম্নে কাঁটা
গোলার্ধ থেকে গোলার্ধ জুড়ে
#

ছুটে যাচ্ছে হাহাকার; মৃতরেখা
#

এভাবে নিজেকে খুলে ধরে আলখাল্লা। শুধু দুটো হাত ছাড়া এই দৃশ্যে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দু-হাত ছড়িয়ে দিতে দিতে আরও বিস্তৃত হচ্ছে সেই দীঘল পোশাক। এত তাপ, এতটা হলকা! তবে কি… তবে কি সরে যাবে বিকিরণ থেকে। কালো রঙের নিচে অঞ্জলি পেতে দিয়ে সে কি আসলে লিথোস্ফিয়ার ভেদ করে পৌঁছে যেতে চাইছে সেই ভরকেন্দ্রে, যেখানে কেন্দ্রাতীগ ও কেন্দ্রাভীগ টান। এ খেলায় একবার কিস্তিমাত করতে পারলেই সে পেয়ে যাবে তার অভীষ্ট শয্যা…
##

এইখানে বসেছিল মৃত এই আগুনের পাশে
বোধ ও বোধির মাঝে পরশপাথর এক
#

মহিষের বাঁকা শিঙে এখনও যুদ্ধের ডাক
শঙ্খ-চক্রে বেজে ওঠে। মাংসল যূথদাগ
একেই যাপন ভেবে ফুল আঁকো পাখি আঁকো
#

কেঁপে ওঠে প্রজাপতি ডানায় ডানায় তার বালির আঘাত
লেখো তবে লিখে ফেলো মরুভূমি তৃষাকাতরতা
#

চক্রে চক্রে দাও তাকে উত্থান; সহস্রারে
শিব শিব শিব শিব
#

অযথা রক্তাক্ত হল হাত
#

রৌদ্রচালিত এ তাঁত বুনে চলে স্মৃতি ও শৃঙ্গার
সেইদিন সর্পযজ্ঞ সেইদিন বিষগান বাজে
#

নীলকণ্ঠ ডাক দেয় বম বম ববম ববম
#

এই তার আসন। এই শবদেহ। তাকেই সম্ভাষণ করছে সে। এই করোটিভরা আসব তারই রক্ত। টান দিচ্ছে ফুসফুসে, টান দিচ্ছে মগজভেদী। আর লংশটে ক্যামেরা প্যান করা হচ্ছে তার ইচ্ছে আর অনিচ্ছের ওপর, তার খিদে ঘাম আর লবণের ওপর। ট্রেন চলতেই থাকছে, এই দৃশ্যে কোনো ছুরি-কাঁচি-ফরসেপ ইত্যাকার কোনও ধাতব যন্ত্রাদি নেই, মাংসল গোলাপি রঙের ভেতর জেগে থাকছে তীক্ষ্ণ ও তীব্র এক হাড়ের অভিসন্ধি
##

কে কাকে পিণ্ড দেয়
চোখ থেকে খুলে আসছে কোটর
কোটরের থেকে স্নায়ু-পাণ্ডুলিপি
#

অন্ধকারে শেয়াল ও শেয়ালিনীর
চোখে সবুজ মণির ধকধক
বৃন্দযাপন আর রতি-অভ্যেস
#

এ-বিছানা ছাই দিয়ে পাতা
সৎকার শেষ হলে থেকে যায়
পোড়া কলিজার ঘ্রাণ
ভেসে আসে মৃতকল্প ছবি
#

কৃষ্ণগহ্বর অব্দি ছড়িয়ে পড়ছে কা-কা কা-কা

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 7 Comments

7 Comments

  • যেন এক কবিতার নিবিড় প্রহর বাঙ্ময় হলো । আহা কতো ভাবনা ও রঙের আততি। পুরো কবিতাটিই মনোতলদেশের বিচিত্র ইশারা ও অব্যক্ত ইঙ্গিত নিয়ে ক্রমবিকশিত। কখনো কখনো আভিধানিক শব্দার্থের বাইরে গিয়ে নবতর অর্থবাচকতায়। যা যা বলা হচ্ছে, তারও নিচে আরো কতো চোরাস্রোত, শব্দের হিমশৈলের নিচে। কতো কতো গূঢ় ব্যঞ্জনা। প্রচল লজিকে পাশ কেটে চলা। বোধহয় একেই বলে পোয়েটিক লজিক। কবিতাপাঠের এমন অভিজ্ঞতা উপহার দেবার জন্য কবিকে অভিবাদন। তারও আগে ”ডায়েরিভর্তি পাহাড় নিয়ে উচ্চতার দিকে চলে যাচ্ছে আমাদের জুতো”—দেখতে দেখতে বলে উঠি চিয়ার্স চিয়ার্স।

    jewel mazhar,
    • অনেক ধন্যবাদ জুয়েল, Jewel Mazhar.

      SOUMANA DASGUPTA,
  • একসঙ্গে একগুচ্ছ ভালো লেখা। ধন্যবাদ সৌমনাদি। এত অপূর্ব প্রকরণ, আর অসামান্য বক্তব্যকে এত অবলীলায় উপস্থাপিত করার জন্য…

    শাশ্বতী সান্যাল,
    • ভালোবাসা জেনো শাশ্বতী। তোমার ভালোলাগা আমাকে আনন্দ দিল।

      SOUMANA DASGUPTA,
  • আবার, বারবার….
    মুগ্ধতা শুধু সৌমনাদি

    অনিন্দিতা গুপ্ত রায়,
  • অসম্ভব সব লেখা। আপনি যেন তাড়িত হয়ে আছেন এখন । যা লিখেছেন সবই মনে হচ্ছে যেন ঈশ্বরপ্রেরিত । অসাধারণ উচ্চতা এদের

    প্রীতম বসাক,
  • অসাধারণ উচ্চতার লেখা দিদি

    Pritam,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *