সৌমাল্য গরাইয়ের গুচ্ছকবিতা

সম্পাদকীয়

স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া মানুষের মুখ না লিখতে পারা কবিতা। অপাপবিদ্ধ। যন্ত্রণাকে শিকার করতে করতে দক্ষ শিকারীর মতো চুপ থাকে। তারপর একদিন নিজেই নিজের শিকার বনে যায়। আমি শিকারি নয়, বরং জল্লাদ হতে চাই। নিজেকে হত্যা করে প্রতিটি যাপনে শরীর থেকে শরীরকে ছুঁড়ে ফেলে দেখতে চাই তার প্রতিটি গোপনাঙ্গে কী লেখা আছে!
যা লিখতে পারিনি এতকাল ধরে, যা কিছু স্বপ্নের অন্তর্গত স্বপ্নভঙ্গুর মানুষের হাতে সে-সব দিয়ে যেতে চাই

অসীম শূন্যতা নিয়ে ঢুকে পড়ি তাদের ভিতর। মৃত্যু ও শোকের পাণ্ডুলিপি থেকে আমি তাদের জন্য একটি কবিতাজীবন নির্বাচিত করে রাখি…

মন্ত্র

উচ্চারণ সহজ ছিল না। প্রত্যেক ধ্বনির ঘায়ে ভেঙে পড়ে মুখ

আঘাত, উৎসর্গ মাত্র। তাকে রোজ পালনের শেষে
অলীক সংসার থেকে বর্ম করে রাখি

দূরে যেতে চাই বলে, প্রভাব রাখিনি
শাশ্বত, গভীর এই প্রস্থানের পথে
চলে যাওয়াটাই তীর্থ। না ফেরা কারোর
কাছে তুমি মন্দিরের অনুচ্চ প্রার্থনা—
আসবে না জেনেও
প্রতিদিন মনে মনে ডেকে নিতে হয়

পলাতকা

শরীরী প্রপাত থেকে অভিধান খুলে গেলে দেখি
সেখানে শব্দের মায়া, শব্দহীন আলুথালু শুয়ে
সরল শিশুর বুকে হামাগুড়ি দেয় আর কাঁদে

কখনো খিদের চোটে কামনা জড়িত লোলজিহ্বা
চেটে চেটে সুললিত একজোড়া স্তনের প্রপাতে
রেখে আসে স্রোতস্বিনী, স্নান শেষে তার নগ্ন পায়ে
প্রসববেদনা বাজে, গর্ভবতী জলস্তম্ভ সেও
জানে না কীভাবে হায়! ভূমিষ্ঠ কান্নার বর্ণমালা
কবিতা জরায়ু ভেঙে প্রতি রাতে কোথায় পালায়

কিশোরী নর্তকী মেয়ে, মৃতবৎসা হলেও জীবিত
আমি তার কিনারায় কবিতারোপণ করে দেখি
আসলে তফাত নেই প্রেমিকা ও ঈশ্বরীর দেহে
কাছে দূরে আশ্রয়ের সাধনা দুয়ার খুলে রেখে
আমিও পালাব ঠিক, শরীরে শরীর ঠেলে ফেলে

সীমান্ত

সীমানা দু’ধারে থাকে, কাঁটাতার নিজে
পেরোতে পারে না বলে, শহিদ হয়েছে ভাষাদের অবধূত
সে এক আনোখা পাখি,
অন্য এক দেশ
বসত গড়েছে বুকে কিছুতে ছাড়েনি
নদী, মাঠ, গল্পগাছা, পুরোনো বিনুনি

দু’হাত জড়ানো মেঘ ঘুরে মরে আনাচে কানাচে
তোমার সিঁথির পাশে এখনো সে দেশ, ভাগ হয়ে আছে…

কোমল নিষাদ

তুমি এক নক্ষত্র বিষাদ। দূরত্ব মেনে চলো। কোনো এক অসম্পৃক্ত আলোর ফুঁ তোমাকে জন্ম দিয়ে ফেলে গেছে অন্তরমহলে।

জন্মদাহ থেকে বাঁচব বলে যে ভালোবাসা শনাক্ত করেছি, তারা মায়াবর্তিনীর কালো জাদু। প্রতারক। অথচ নিপুণ বিশ্বাসে আঁকড়িয়ে ধরি সমূহ বিনাশ

জানি, এইসব শ্যামবর্ণ মিথ্যা, এইসব অদৃষ্টের ফাঁদ, সবটুকু ছলনার জল থেকে হেসে ওঠা ছদ্ম নোলক

যে-সব আরতির গান স্তব্ধ হয়ে গেছে পাথরের বিহ্বল জড়তায়, সেখানে মানুষ আর দেবতার পারস্পরিক সন্দেহে সৃষ্ট পথচক্রের আমিও এক পাচারকারী। শুধু ঘুরছি আর ঘুরছি তাকে খুঁজে পেতে। একদিন এইসব ঘূর্ণন থেকে ছিটকে যাবার সময়,
বুঝতে পারি—
তুমি এক বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস যাকে কেবলই ছেড়ে দিতে হয়…

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *