চিরন্তন সরকারের গদ্য

চিরন্তন সরকারের গদ্য

সকাল

শূন্য ঘরে জর্জ বিশ্বাসের কণ্ঠ উঁচুতে পৌঁছে ঢাল বেয়ে নেমে আসছে। এরই মধ্যে একটা টিকটিকি দেয়ালে আর একটাকে জাপটে ধরেছে। আরশোলা, বইয়ের পোকা সক্কলে ব্যস্ত, তবু তাদেরই জন্য এই গান। আমরা, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই যুদ্ধ, দেশভাগ বা মন্বন্তরের মত ঐতিহাসিক ঘটনার আবর্তে বেড়ে উঠিনি, এইসব সকালগুলোই বরং আমাদের গড়েছে। সকালবেলার টিকটিকি, আরশোলা, গান। বারান্দায় জিভ উলটে পড়ে আছে দু-জোড়া বাটার জুতো। তার পাশে বাজারের থলে, সেখানে মেটে আলু, মটর শাকের ফাঁকে বারোটা জ্যান্ত কাঁকড়া। প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে পা-গুলো বাঁধা বলে তারা সব উঠতে গিয়ে থলের মধ্যে কেবলই এ অন্যের গায়ে গড়িয়ে পড়ে। উঠোনে উজ্জ্বল দাঁড়াশের দিকে হামা টেনে চলেছে দুধের শিশু। সকলেই শুনছে আনমনে। শুধু যে বুড়ো খেয়ালের বশে এই গান চালিয়ে দিয়েছে সেই তা বেবাক ভুলে গিয়ে কাগজ পড়ছে, দাড়ি কামাচ্ছে, বিড়বিড় করতে করতে রুটি খাচ্ছে আধমরা সকালবেলায়।

ঘুম

চল্লিশ পেরিয়ে এখন আমার ব্যর্থতাকে স্পষ্ট দেখতে পাই, সে রোদ্দুরে দুলে দুলে নামতা পড়ছে। সাফল্যকেও দেখতে পাই এখন, সে জঙ্গলে পাখিধরা সেজে ঘুরে বেড়ায়। জয়তীর্থ মেহুন্ডির কণ্ঠে গৌড় সারঙ শুনতে শুনতে মুষকো, উজবুক এই জীবন মুড়ি খেয়ে কেদারায় ঘুমিয়ে পড়ছে যখন, আজও পাশের বাড়ির মেয়ে তার দিকে তাক করে কাগজের গোল্লা ছুঁড়ে চকিতে পর্দার পিছনে সরে যাচ্ছে। হতভাগা সাফল্য ওত পেতে বসে ছিল, কিন্তু জঙ্গলে হ্রদের দক্ষিণে করাতের মতো উঁচু ঘাসের শিখরে তাকে দিনান্তে ঘাড় মটকে মারে অপদেবতার অট্টহাসি। আমি যে কেদারায় ঘুমিয়ে পড়ে দেখি এইসব, তারই নীচে ছাইরং বেড়ালের চোখের মনিতে মুড়ি মুখে নিয়ে চলা পিঁপড়েরা ফুটে ওঠে। যাবে তারা চৌকাঠ, ফুলের টব পেরিয়ে তুলসীতলায়, তারও পরে মাটির গুহার দিকে। কিন্তু এখন কেদারার কাঠে ঘুণপোকার শব্দ পেয়ে নিমেষে থেমে সেই একসার পিঁপড়ে চোখ তুলে হঠাৎই পাশের বাড়ির কার্নিশে পড়ন্ত ঘুড়িকে দেখতে পেল। তাতে গেভারার মুখ আঁকা। দুপুরে গড়িয়ে যাবার আগে আজকাল নিজেদের এইভাবে নিঃশেষ করতে চায় কোনো কোনো ছুটির সকাল।

রিশপ

কালিম্পং থেকে লাভা, লাভা থেকে আবার রিশপ যাওয়ার পথে অনেকক্ষণ একদিকে অতলান্ত শূন্য, তারপর দুই দিক থেকে ঘিরে ধরে নিঃসীম, ঠান্ডা, ঘন, প্রায়ন্ধকার পাইনের বন। সারাদিন সন্ধ্যাকাল। নীচে যতদূর চোখ যায় ভেজা পাতা, রোদ্দুর পৌঁছতে পারে না, মাঝপথে ভেষজের তীব্র কটু গন্ধে রোদ্দুরের বোধহয় নেশা হয়ে যায়, সে মুর্ছিত হয়ে লুটোয় গাছের ছালে। ড্রাইভার বললেন, রাত্তিরে হায়না আর লেপার্ড চরে বেড়ায় এখানে। পুড়ে পুড়ে নরম হয়ে আগুনের শিখায় যেই শুকনো পাহাড়ি কাঠ ভেঙে যায় অমনি পূর্ণ চাঁদের রাত্তিরে উপত্যকায় পেঁচা ডেকে ওঠে, তার চোখ পাষাণের মতো স্থির, আর কেউ নেই ভেবে হাওয়া এসে লহমায় শিখা নিবিয়ে দেয়, আবার চতুর্দিকে নিঃশব্দ, শুধু ঝোরায় জলের আওয়াজ আর এক-একবার মনাস্ট্রির মন্দ্রস্বর। সকাল হলে শিশিরে অহিংস পোকাদের ঘুম ভাঙে, পোড়া কাঠ স্ফটিকের মতো বার্চ গাছের নীচে জেগে থাকে।

তিরবিদ্ধ

বাংলা সংবাদপত্রে পিটিআই এর দেওয়া একটি ছবি দেখেছিলাম। দিল্লিতে প্রতিবন্ধীদের আইন অমান্য। দড়ির ওপার থেকে এপারে আসতে চেয়ে গোঙানি, কলরব। এদিকে নাচার পুলিশ। ওদিকে শত শত মানুষ। কেউ এমনভাবে চিৎকার করছেন, হঠাৎ দেখলে মনে হয় উচ্চকণ্ঠে হাসছেন। দীর্ঘ পদযাত্রার পর কেউ ঝুঁকে পড়েছেন ক্লান্ত হয়ে সেই দড়ির ওপর। কারো নিরুদ্ধ ঠোঁটে বার্গম্যানের ছবির স্তব্ধতা। হো হো হাসছেন যিনি কিম্ভূত হতাশায়, তাঁরই পাশে কান্নায় ঢলে পড়া হাঁ-মুখ তরুণ। সকলে আর্ত, শ্রান্ত, তোলপাড়। সকলেই তিরবিদ্ধ সেনানী। আইনের উদ্দেশে তাঁদের ওই হুঙ্কার মনে নিয়ে আসে বাদল সরকারের ‘মিছিল’ নাটকের শেষ দিকের একটি দৃশ্য— একটা ফ্রিজড শট— ‘শতাব্দী’-র কলাকুশলীরা তাঁদের ইতিপূর্বক চাঞ্চল্য সহসা স্তব্ধ করে এনে চাকদহের শ্যামাপ্রসাদ ময়দানে সেদিন অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তাঁদের এক-এক রকম দেহবিভঙ্গ, এক এক রকম অভিব্যক্তি— সবই ফ্রেমবন্দি স্তব্ধতায় গতির নতুন ধারাভাষ্য হয়ে উন্মোচিত হচ্ছিল।

পুরী

উৎপলকুমার বসু যেদিন মারা যান সেদিন পাণ্ডা দুপুরে এসে জানায়, আজ ঠাকুর অপবিত্র, কাল দর্শন হবে। কাঠিয়াবাবার আশ্রমের সামনে যে সমুদ্র নিজের খেয়ালে গাঢ় সবুজ ঢেউ ভাঙছে তার মুখের কাছে অলক্ষে কপাল নামিয়ে এনেছে মেঘভারাতুর পুরীর আকাশ। বালুর উপর দিয়ে শখের সওয়ারি নিয়ে নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছে রঙিন জামা পরা উট, হাওয়া কিছুটা আনমনা, সুভদ্রা বলরাম হাতকাটা জগন্নাথ মহানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন হাবাগোবা মেয়েদের ঝাঁকায়। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী আর কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী— গুরুশিষ্যের মুখোমুখি দুই আশ্রমে এখন রোদ্দুর খরগোশের মতো লাফিয়ে পড়ছে মাটিতে দাওয়ায়, গাছের পাতায়। কিন্তু, মুসলমান-উসলমান যাঁরা আছেন তাঁরা এখান থেকেই ঘুরে যান— এই কথা যখন পাণ্ডা মূল মন্দিরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলে তার রক্তটীকায় সনাতন ধর্মের চিতাধূম এসে আলগোছে লেপটে যায়।

Spread the love
By Editor Editor গদ্য 6 Comments

6 Comments

  • এলোমেলোচিন্তারা জটবাধে অজান্তে এক অসম্ভাবির পথে। পৃথিবীতে কাব্য আর অবশিষ্ট কোথায়? গদ্যের ধারাপাত আজানুলম্বিত হয় মহাকালের অমিত্রাক্ষর সন্ধানে।
    ভালো লাগল।

    Anirban Sen,
  • কয়েকটা লাইন ভালো, সমগ্রের তুলনায় ।

    Samanwaya,
  • খুব খুব ভালো লাগলো । এমনটাই তো লিখতে চাই!

    প্রীতম,
  • Reflection of thoughts that travel from sun-lit space to dark alleys where we dare to enter. Few told and untold whispers kept us engaging with the narrative. The rhythm creates on its own and invites us to the beyond with some real truth of life.

    SANJIBAN ROY,
  • উফফ..কী ভালো যে লাগল

    Prabir Majumdar,
  • “Ghum” o “Rishop” osadharon. “Tirbiddha” er shesh bakya o “Puri” er prothom bakya duti chomotkaar. “Sakaal” belai e kon ostibaad vabiye tole amai? Porabastob chitrakolpo bastobatar drishyamanota k bariye dyai… “Puri” er shesh bakyer sheshangshotir mormartha onyavabe bykto korle hoito valo hoto.

    Chinmoy Dey,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *