বিধান সাহার গদ্য

বাদামি বায়স্কোপ

সিমি আর চৈতি সেদিন সকাল সকালই চলে এসেছিল। ‘আঙ্কেল আঙ্কেল চলেন ঘুইরবার যাই।’ আমারও ভোর দেখার বাতিক। মেয়ে দু’টির মুখের ওপর ভোরের পবিত্র আভা পড়ে ওদের আরও স্নিগ্ধ আর কোমল দেখাচ্ছে। হালকা-পাতলা গড়নের শ্যামবর্ণের মেয়ে দুটোর চোখে অপার বিস্ময় আর কৌতূহল। কোনো এক শহুরে আঙ্কেলকে দেখার। আঙ্কেলের কাছে তাদের পারাগুলোকে জানাবার এক তীব্র ইচ্ছা ওদের আচরণে। একজন বলছে, ওই তুই তিনের ঘরের নামতা ক তো! আঙ্কেলেক হুনা। আরেকজন বলছে, আমি পুঁইয়ের বিচি দিয়া একখান ছবি আঁকছিলাম আঙ্কেল জানো! ওদের স্কুলে কবে কোন টিচার ওদের কোন কাজে প্রশংসা করেছিলো এসব গল্প বলে যাচ্ছে ক্লান্তিহীন। সূর্য তখন একটু একটু করে উঠছে।
ধুলোয় ঢাকা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম এক জোড়া তালগাছ সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। তার নীচের দিকের পাতাগুলো শুকিয়ে খয়েরি রং ধারণ করেছে। গাছ দুটোর ওইপাড়ে ঘোষপাড়া। ঘোষপাড়ায় একটা জাগ্রত কালী মন্দির আছে। সেই মন্দিরে কালীর পায়ের নীচে মহাদেবও আছে। মহাদেবের মাথার জটা থেকে গঙ্গা ঝরছে। এই ঠাকুর বানাইছে হরি পাল। হরি না হরি না নরহরি পাল— সংশোধন করে দেয় চৈতি। দেখলাম ডাকিনী যোগিনী ছাড়াও আরও দুইটা মূর্তি। মুখটা রাক্ষসীর অবয়বে সাজানো। ওগুলো কি শিবের চেলা ভৃঙ্গি আর নন্দী? কী জানি! সিমি বলছিল, মন্দির থিকা ওম্মুক গেলে না আঙ্কেল একটো পুকুর। মে…লা বড়ো পুকুর কাইটতেছে। য্যাবান ওম্মুক? ঘোষপাড়ার চিকন একটা গলি দিয়ে আমরা কাটতে থাকা পুকুরের দিকে হাঁটি। আমের মুকুল আর ছোটো ছোটো গুটি পড়ে আছে পথে।

একদিকে ভাঁট ফুলের সারিবদ্ধ গাছ। ফুলে ভরা। আরেকদিকে সবুজ ধানি জমি। তার মাঝখান দিয়ে জমিতে পানি দেয়ার ড্রেন। কিছু দূরে একটা ছোট্টা ঘর। ঘরের সামনের অংশে ছোট্ট গোল করে কাটা। কাটা অংশের চারপাশে আয়রনের খয়েরি দাগ। পুকুরের পাড়ে যখন গিয়ে দাঁড়ালাম দেখি বিশাল আয়োজন! বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের মাঝখান দিয়ে টায়ারের মোটা দাগ। দূরে হলুদ রঙের দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে। একটা মাটি কাটার যন্ত্র। পুকুরের বাম পাড়ে শিমুলের গাছ। পাতাগুলো সব ঝরে গেছে। এই পাড়ে লিচুগাছভরতি ফুল। সেই ফুল ঝরে ঝরে পড়ছে। পাতার উপর ফুল পড়ার অদ্ভুত মোলায়েম শব্দে একটা ঐন্দ্রজালিক ঘোর তৈরি হচ্ছে মুহুর্মুহু। ওরা ভাঁটফুল তুলছে। ওই ফুলগুলো দিয়ে অনেকগুলো মালা গাঁথবে। তারপর শনিবারে স্কুলে গিয়ে ওদের সব বন্ধুদের গলায় পড়িয়ে দেবে। সব স্যার আর ম্যাডামদেরও। ভাঁটফুলের নাম আসলে ভাণ্ডিফুল। আমরা শহরে থাকি বলে এর আসল নাম জানি না। বলল, চৈতি। আমি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালাম। একটা লোক বেল বাজাতে বাজাতে সাইকেল ছুটিয়ে আমাদের অতিক্রম করল। দক্ষিণ দিকের জমিটার ওইপাড়ে একটা বটগাছ দেখা যাচ্ছে। পাতাহীন। বটগাছের পাশ দিয়ে যে রাস্তা পূর্ব দিকে চলে গেছে সেখানে দু’জন মানুষকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। ছোটো একজনের গায়ে লাল জামা। বয়স্কজনের গায়ে গোল হাফহাতা স্যান্ডো গেঞ্জি। বটগাছ তার ডালগুলোকে উদ্দেশ্যহীন মেলে ধরে আছে। যেন বহুদিন তার অনেক অনেক বলবার কথাগুলো সে ধরে আছে। যেন একটা মাত্র সুযোগের অপেক্ষা। বটগাছ কথা বলতে পারে না। বটগাছ আমার মতো শান্ত আর নীরব। বটগাছ ছায়া দিয়ে যায়।

ওগুলো কি শিবের চেলা ভৃঙ্গি আর নন্দী? কী জানি! সিমি বলছিল, মন্দির থিকা ওম্মুক গেলে না আঙ্কেল একটো পুকুর। মে…লা বড়ো পুকুর কাইটতেছে। য্যাবান ওম্মুক?

*
বিকেলে একা একাই হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। একটা চড়ুই দেখলাম আরেকটা চড়ুইয়ের জন্য বসে আছে। একটা কাঁঠাল পাতা অবসন্ন পড়ে আছে পথে। বটগাছ থেকে নেমে আসা থোকা থোকা জট ছুঁয়ে আসা হল। মন খারাপ হল। বাস টেম্পু ট্রাকের হর্ন, রিক্সার বেল, মানুষের কোলাহল এসব এখন বেশ ভালো লাগে। হারিয়ে যাওয়া যায়। ভিড়ের ভেতর তুমি যত একা হতে পারবে একা একাও ততটা পারা যায় না। আমি ভিড় খুঁজি ইদানীং। হ্যাঁ, ওই বিকেলটুকুই আমার। বা, ওই যতটুকু সময় হেঁটে হেঁটে ফিরি। পিছুটান নেই আর। ফলে অনিয়ম বেড়েছে। ও! এ মাসের শেষ দিকে পদ্মায় যাওয়া প্রায় ঠিক, যত্রতত্র এখন আর থুতু ফেলি না, ফুল হাতা শার্ট পড়ি, সিঁথি বদলে ফেলেছি, এরকম একগাদা গল্প জমে আছে। একটা মোরগের লাল টায়রা ফোকাস করে ছবি তুলতে গিয়ে কীভাবে ব্যর্থ হলাম সেই রহস্যবেদনার গল্প তো তোমাকে বলাই হয়নি!
ঘর আমাকে টানে না আর। আমি আবার বেরিয়ে পড়ব। পথ যেদিকে নেয়, চলে যাব। এই শরৎ আমার অসহ্য লাগে। আমার পাগল পাগল লাগে! কাশফুল, নীল আকাশ, তুলোর মতো মেঘ, হলুদ রোদ… এইসব সহ্য হয় বলো?
আজ এক ভয়াবহ চাঁদ উঠেছে, সোনাই। দেখিস।

*
প্রচণ্ড শীত আর গরম একইসাথে টের পাচ্ছি। ফেরার পথে আলতো বৃষ্টি ধরেছিল; ভিজেছি সামান্যই। বৃষ্টির জল শুকিয়ে যাবার আগেই আবার ঘামে ভিজে গেছি। জীবনটাকে তোমার মতো ছক কষে কষে কাটানো আমার সাধ্যের বাইরে। অন্যদের মতো গতানুগতিক জীবন আমাকে কখনই টানেনি। এখনও টানে না। ফলে রোদ-বৃষ্টির সামান্য এই ভিন্নতা আমার ভালো লাগছিল। ভেবেছিলাম কিছুই হবে না। কিন্তু এখন জ্বর আসছে। যে জীবনে আমাদের আনন্দের ঘটনাগুলো হাতে গুনে বলে দেয়া যায়, সেখানে তুমি বলো, জ্বরের চাইতেও সেই মুহূর্তের আনন্দটা কি মূল্যবান নয়? যদিও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। নাক বন্ধ হয়ে আছে। চোখও জ্বালাপোড়া করছে। কিন্তু এর চেয়েও বড়ো ব্যথা তো তোমার অনুপস্থিতি!
কে বলো পোড়ায় কারে, কে জ্বালায় আপন শরীর!

*
আকাশ চিরকালই অংশত মেঘলা থাকবে— এই সত্য মেনে নিয়েও আমরা জেনেছি পৃথিবীতে ফুল ফোটে রোজ। জেনেছি, মানুষ এখনও গান গায়। আর ক্ষেপে গিয়ে ঘুমের ভেতরও দাড়িওয়ালা দাড়িওয়ালা বলে বকে ওঠে কেউ। আমি জানি বকুল গন্ধপ্রবণ। আমি জানি জারুল কিংবা কৃষ্ণচূড়া চিরকাল মৃত্যুর উষ্কানী। তবু কোথাও কোনো গরিবের বাসি কথা ফলে গেলে মনে হয়— দিন আসন্ন। মনে হয়, বাতাসে উড়বে গীতবিতানের অজস্র কৃষ্ণ অক্ষর। গোলাপফুল প্রিয় ছিল বলে, আমি কোনোদিনও গোলাপ বাগানের দিকে যাইনি। তার বদলে নিজের ভেতরেই গোলাপের ঘ্রাণ জন্ম দেবো ভেবেছি। আকাশের তারা প্রিয় ছিল বলে আমি কোনোদিন তারা গুনিনি। বরং নিজেকেই আকাশ বানাব ভেবেছি। আমাদের স্বপ্নগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি এভাবেই বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আমি জানি, একদিন আমাদের সম্মিলিত বাসনার রঙিন পোস্টার আমাদের সামনেই উন্মোচিত হবে। গান হবে খুব। বৃষ্টি হবে…

তোর মন রাঙাব…

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *