অনির্বাণ বসুর গল্প

শ্মশানসম্ভব

কিংবদন্তী ভেসে বেড়ায় হাওয়ায়-হাওয়ায়: এই শ্মশানে চিতার আগুন কখনো নেভে না। এই ঘাট মণিকর্ণিকার। এই জনপদ বহু প্রাচীন বললে আদতে কিছুই বলা হয় না; বস্তুত, এখানে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস, প্রথমাবধি, বিচ্ছেদবিহীন। সতীর মৃতদেহের একান্ন খণ্ডের শেষে, বেঁচে থাকা অবশিষ্টাংশ, এখানেই দাহ করেছিল মহাদেব, তাই এই মহাশ্মশানের আগুন জ্বলে চলে অনির্বাণ— এমন কত-না গল্প এখনও ভেসে বেড়ায় এখানকার বায়ুমণ্ডলে।

আমরা, অগস্ত্য কুণ্ডু লেনের উলটোদিকের গলি দিয়ে গলে, পুরোনো ধাঁচার বাড়িগুলোকে দু-পাশে রেখে, এগোতে থাকি। দিনের বেলা বলেই হোক, কিংবা এত মানুষজনের উপস্থিতির কারণেই কিনা কে জানে, পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে-থাকা একটা গোরুকে দেখে খুব-একটা ঘাবড়ায় না সুদর্শনা, শুধু মুখে বিরক্তি ঝুলিয়ে, কিঞ্চিৎ জবুথবু, পার হয়ে যায়। আরও কিছুটা হাঁটতেই ওই গলিপথের শেষ প্রান্তে আমাদের নজরে পড়ে আলোর আভাস; এমনিতেও এইসব গলিঘুঁজিতে সূর্যের আলো আসে না সেভাবে, তাই হতে পারে সামান্য, তবু ওই আলোতেই— গাঢ় অন্ধকারে সামান্য আলোতেই─ চোখ ধাঁধিয়ে যায়: হঠাৎ-আলোর ঝলকানি। সেই আলোর সামনে বেশ কিছু শরীরী অবয়ব ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে; বুঝি-বা প্রেতের দল, স্থাণুবৎ, নিজেদের মধ্যে কোনো সাজশে ব্যস্ত। দূর থেকে আসা ওই আলোর উদ্ভাস হাতছানি দেয় আমাদের। আমরা এগোতে থাকি সেই আলোকরেখা লক্ষ করে।

যেখানে আলো আর অন্ধকার পরস্পর মাখামাখি হয়ে আছে, দূর থেকে যেখানটা ঈষৎ ঝাপসা দেখাচ্ছিল এতক্ষণ, সেখানে পৌঁছোতেই শরীরী আবছায়ারা দৃশ্যমান হয়; আমরা দেখি, সুরক্ষারক্ষীরা জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে সামনের দু-খানা চায়ের দোকানে, উত্তরপ্রদেশ পুলিশ সংখ্যায় বেশি, তুলনায় কম কিন্তু সেটাও অনেক, সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের উর্দিধারী সেপাই-সান্ত্রী। চায়ের দোকান দুটি বাঁ-হাতে রেখে খাকি আর জলপাই রঙের পোশাকদের থেকে সামান্য এগোতেই, ওই বাঁ-দিকেই, দেখা যায় কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরের অন্য দিক, একেবারে কাছে; তার ঠিক পাশটায়, সাদা রঙের উঁচু-উঁচু গম্বুজাকৃতি মাথা, তার নীচে ওই রঙেরই খিলান— আপাতত যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুতেই প্রতীতি জন্মায়, বিশ্বনাথ মন্দিরের পাশের স্থাপত্যটি মসজিদ— জ্ঞানবাপী মসজিদ। নন্দিতা আর সুদর্শনা এদিকে চায়ের অর্ডার দিয়েছে, শুভ সিগারেট ধরিয়েছে একটা, ওর দেখাদেখি হয়তো জুংও। আমি সরে আসি জুংয়ের কাছে, ও ডানহিলের প্যাকেট আর লাইটার এগিয়ে দেয় আমার দিকে, প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করি, তারপর ওর সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার ওকে ফেরত দিয়ে, নীচু গলায়, জ্ঞানবাপী মসজিদের কথা জানাই; প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই, ইতিহাসের ছাত্রী জুং, উত্তেজিতভাবে ওর মোবাইল ফোনখানা আমার মুখের সামনে তুলে ধরে, দেখি, সেখানে গুগল্ খোলা, যেখানে জ্ঞানবাপী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে জ্বলজ্বল করছে মুঘলসম্রাট ঔরঙ্গজেবের নাম, তার ঠিক তলায় সালের উল্লেখ: ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ। জুংয়ের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে পড়তে শুরু করি আমি, সিগারেটে ঘন-ঘন টান পড়ার ফলে দ্রুত সেটা পুড়ে যেতে থাকে: বিশ্বনাথের মূল মন্দির ভেঙে ঔরঙ্গজেব নির্মাণ করেছিলেন এই মসজিদ— অনেকেই এমনটা মনে করে থাকেন। ১৮০৯ সালে বারাণসীর যে-দাঙ্গার উল্লেখ পাওয়া যায়, তাতে একদলের বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের একটা দল নাকি গোরুর মাথা কেটে তার রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছিল মসজিদের চারপাশে; অন্য দলের মত এই যে, হিন্দুরা একটা শুয়োর কেটে, তার রক্ত ঢেলে দিয়েছিল মসজিদের প্রবেশপথের সামনে।

বাবরি মসজিদ

চোখের সামনে ভেসে ওঠে সন ১৯৯২, বাবরি মসজিদের তিন-তিনটে গম্বুজ, ভেঙে পড়ল একে-একে। প্রথম গম্বুজখানা নড়ে ওঠবার সঙ্গে-সঙ্গে উল্লাস আরও তীব্র, সর্বশক্তি এক করে নেমে এল পরবর্তী আঘাত, চিড় ধরা জায়গায় দেখা গেল ফাটল, ক্রমাগত আঘাতে যেইমাত্র ধসে পড়ল সেটি, চারপাশ—যতদূর চোখ যায়— ধুলোর চাদরে ধূসর, শ্লোগান উঠল:
‘জয় শ্রীরাম! জয় জয় শ্রীরাম!’
‘এক ধাক্কা অউর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো!’
‘ইয়ে তো প্যাহ্লা ঝাঁকি হ্যায়, কাশী-মথুরা বাকি হ্যায়!’

ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলী মনোহর যোশী, উমা ভারতী, প্রমোদ মহাজন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অশোক সিঙ্ঘল, ফৈজাবাদের বিজেপি সাংসদ বিনয় কাটিয়ার, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং— আপাত পরিচিত এইসব মুখগুলোতে লেগে ছিল উল্লাস। মানসিক পরিতৃপ্তির ভার এতই বেশি ছিল তাদের, চিবুক ঝুলে প্রায় বুক পর্যন্ত এসে ঠেকেছিল। সঙ্গে যোগ হয়েছিল একের-পর-এক গরমাগরম বক্তৃতা, বিবৃতি। এক সিআরপিএফ জওয়ান, মুখ দেখা যাচ্ছিল না, তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই নিশ্চিত তাকে আড়ালে রেখেছিল সংবাদমাধ্যম, হরিয়ানা অঞ্চলের হিন্দিতে বলছিল, সবরকম ব্যবস্থা মজুত ছিল তাদের তরফে, কিন্তু সরকারের থেকে কোনো নির্দেশ আসেনি; সেই জওয়ান বলেই যাচ্ছিল, সরকার যদি চাইত, তবে মসজিদ ভাঙত না।

মোবাইলটা লক্ করে জুংয়ের হাতে ফিরিয়ে দিই। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করি, কাগজের কাপে চা দিয়ে গেছে দোকানের বাচ্চা ছেলেটা। আমি সিগারেট ধরাই, চায়ে চুমুক দিই, পাশে দাঁড়ানো জুংকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে যাই যে, ও আদৌ সিগারেট খেতো কিনা।

চা-সিগারেট খেয়ে এগিয়ে যাই মন্দিরের দিকে। ওরা ঢুকছে মন্দিরের ভিতর, আমি কোনোকালেই ঈশ্বরবিশ্বাসী নই, মন্দিরের ভিতরের বিগ্রহের থেকে বাইরের কারুকাজ বেশি ভালো লাগে আমার, তাই ওদের ঢুকে যেতে বলি। মন্দিরের সামনেটায় দাঁড়িয়ে, যেদিকে গঙ্গা বয়ে চলেছে নিজের খেয়ালে, পূর্বদিকে, ঘুরি। আমার আর গঙ্গার মাঝে কোনো প্রতিবন্ধক নেই; আমি সরাসরি গঙ্গা দেখতে পাই। ওই পথে হেঁটে আসতে দেখি এক পূজারী ব্রাহ্মণকে; পরনের ধুতি ভিজে জবজবে, গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে, হাতে ছোটো মাপের একটা কমণ্ডলু, খালি পা। ওই ধূ-ধূ প্রান্তরে পা ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে পায়ে লেগে যাচ্ছে ধুলোবালি, সূর্যকে পিছনে রেখে সে এগিয়ে আসে। আমি আর-একটা সিগারেট ধরাই। আমার সিগারেট ধরানো দেখেই কিনা কে জানে, মনে হল, হাঁটার গতি বেড়ে গেল সেই পূজারীর, সত্বর আমার কাছাকাছি এসে পড়ল সে: ‘এ লড়কা, মন্দিরকে সামনে সিগ্রেট পিনা মানা হ্যায়।’

আমি এদিক-ওদিক তাকাই, কোথাও কোনো নির্দেশিকা নজরে পড়ে না, তবু সিগারেটটা হাতের তালুর আড়ালে লুকিয়ে ফেলি: ‘ম্যায় তো মন্দিরকে বাহার পি রহি হুঁ, মন্দিরকে অন্দর তো নেহি!’

কথা শেষ হল কি হল না, ঘাড়ের কাছে একটা চাপা অথচ গম্ভীর গলা শুনতে পেলাম: ‘বাত বাড়ানে সে কুছ নেহি হোগা, স্বামীজী বোল্ রহে হ্যায় না! উস্ তরফ সাইড হোকে পিও।’ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, গাট্টাগোট্টা চেহারার এক খাকি উর্দি আমার ঠিক পিছনটায় দাঁড়িয়ে।
কথা না-বাড়িয়ে আমি সরে যাই একপাশে। কমণ্ডলুর জল দিয়ে পা ধুয়ে, আঙুলের কয়েক ফোঁটা মুখে আর মাথায় ছিটিয়ে, মন্দিরের ভিতরে ঢুকে যায় পূজারী।

দুই

ওরা মন্দির থেকে বেরিয়ে এলে, সবাই মিলে, এগিয়ে যাই মসজিদের দিকে। জ্ঞানবাপী মসজিদ। গোটা মসজিদ চত্বরের চারপাশে বাঁশের ব্যারিকেড। টপকানো দুঃসাধ্য নয়, কিন্তু মসজিদ ঘিরে অতন্দ্র প্রহরা। বন্দুক হাতে সিআরপিএফ জওয়ানদের সচেতন পদচারণা। নিশ্ছিদ্র টহলদারি। ঠিক যেমনটা ছিল অযোধ্যায়। ঠিক যেমনটা ছিল বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার আগেও। বাঁশের ব্যারিকেড আর মূল মসজিদের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় কাঁটাতারের ঘেরাটোপ। গোল করে পাকানো কাঁটাতার সরাসরি এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেছে। বাঁশের ব্যারিকেডের সামনে এসে দাঁড়াই আমরা। এদিক থেকে, বাইরে থেকে যতটা দেখা যায়, দেখতে চেষ্টা করি, কিন্তু বাইরের খিলান আর গাছের পাতায় ঢাকা পড়তে-থাকা গম্বুজ বাদে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা জওয়ানকে জিজ্ঞেস করি, কোনোভাবেই কি ভিতরে যাওয়া যায় না; জবাবে জলপাই পোশাকের বন্দুকধারী জানায়, কোর্টের নির্দেশে এখানে নমাজ পড়া বা ভিতরে ঢোকা নিষিদ্ধ। মামলার নিষ্পত্তি না-হওয়া অবধি কারো প্রবেশাধিকার নেই। দ্বাদশ জ্যোর্তিলিঙ্গের অন্যতম প্রধান একটি, অবিমুক্তেশ্বর, না মসজিদ ─ কোন পক্ষের দাবি ঠিক, তার নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত জমির এই অংশের উপর, মসজিদের উপর, স্টে-অর্ডার দিয়েছে। অতঃপর আমরা, ব্যর্থ মনোরথ, মসজিদে প্রবেশের আশা ছেড়ে, মণিকর্ণিকার দিকে এগোই।

মন্দির থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরত্বে গঙ্গার ঘাট, মণিকর্ণিকা, চিতার আগুন অস্পষ্ট দেখা যায়। মহাশ্মশানের আগুন তার লকলকে শিখার আন্দোলনে, মনে হয়, হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরা আটজন, নিজেদের মধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, হাঁটতে থাকি গঙ্গার দিকে; স্মৃতিতে থাকা মণিকর্ণিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না কোথাও। ঘরবাড়ির মাঝখান দিয়ে গলে-যাওয়া কত-না অলিগলি, ঘাট থেকে এঁকেবেঁকে, সরীসৃপের মতো, যা এনে ফেলত কাশী-বিশ্বনাথ বা জ্ঞানবাপীর ঠিক সামনে, সেসব আর নেই। ভস্ম শেষে অবশেষটুকু পড়ে আছে ইতিউতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আক্রান্ত কোনো জনপদ যেন, যেমন দেখা যায় কোনো-না-কোনো বিদেশি সিনেমায় কিংবা ডক্যুমেন্টারিতে, অবিকল তেমনই— ধূলিসাৎ। এই ধ্বংসস্তূপে কিছু আগেও মানুষজন ছিল। পুরোনো, হয়তো এক সম্ভ্রান্ত জনপদ ছিল এখানে। আজ আর তার নামমাত্র নেই। এত মানুষ সব কোথায় গেল? কর্পূরের মতো উবে গেল বেমালুম? জন্মভিটে ছেড়ে চলে গেল চিরকালের মতো? সবকিছু এত নীরবে ঘটে গেল?

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে এগোতে থাকি আমি। সুনন্দ বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে, জুং ওর থেকে খানিক তফাতে, তবু কাছাকাছি। সুনন্দ ঝুঁকে পড়ে ধ্বংসস্তূপের উপর, মন দিয়ে দেখে ক্যামেরা তাক করে; জুং এদিকে পটাপট ছবি তুলে নিচ্ছে চারপাশের— জাপানিরা বোধহয় ভালো করে কিছু দেখার আগে এভাবেই তুলে রাখে স্থিরচিত্র, পরে ধীরেসুস্থে দেখবে বলে— যেখানে যা পাচ্ছে একটু অন্যরকম, যা কাজে লাগলেও লাগতে পারে, সেই সবেরই। ছবি তুলে ক্যামেরার লেন্স-ক্যাপ লাগিয়ে আর-একটু ঝুঁকে যায় সুনন্দর শরীরখানা, নীচু হয়ে একটা ইট— ভাঙচুরের পরও গোটা রয়ে গেছে কোনো-এক আশ্চর্য উপায়ে— তুলে নেয় ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে, ভালো করে দেখে; ততক্ষণে আমরাও পৌঁছে গেছি ওর কাছে, ও ইটখানা দেখায় আমাদের। এখনকার তুলনায় আকারে অনেকটাই সরু, চ্যাপ্টা, পোড়ামাটির। বোঝা যায়, ইটখানা বেশ পুরোনো— বহু বছর, বহু-বহু বছর আগের। জুং ইটটা, হাতে নিয়ে দেখবে বলেই বোধহয়, হাত পাতে। সুনন্দর হাত থেকে ইটখানা জুংয়ের হাতে আসে, ও সেটা কখনো লম্বালম্বি, কখনো-বা পাশাপাশি ধরে দেখে, কী দেখে বা বোঝে, সে ও-ই জানে, তারপর আঙুল দিয়ে মেপে নেয় ইটের প্রস্থ। প্রস্থের মাপ নিয়ে ইটটা ফিরিয়ে দিলে, সুনন্দ, এই অবসরে পকেট থেকে বের করা রুমালে, সেটিকে জড়িয়ে ব্যাগের ভিতর একটা কোণ করে সামলে রাখে: প্রাচীনের সঙ্গে আজকের মণিকর্ণিকার মধ্যবর্তী সেতু; মিসিং লিঙ্ক।

জুং তার মোবাইল ফোনখানা নিয়ে কী-সব ঘাঁটাঘাঁটি করে, কপালের চামড়ায় ভাঁজ না-পড়লেও ভ্রূ কুঞ্চিত, বোঝা যায়, অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কিছু-একটা বোঝবার বা জানবার চেষ্টা করছে সে। শুভ সিগারেট খাচ্ছিল, হাত বাড়িয়ে কাউন্টার নিলাম। দক্ষিণ দিকে, মনে হয়, কারো শ্রাদ্ধের আচারাদি পালিত হচ্ছিল, পুরুতের সঙ্গে কর্তব্যকর্ম করা ওই পুরুষ এবং মহিলাটি গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে যেতে, পর্ণা, ওদের কাছাকাছিই ছিল, দেখলাম, ইট-পাথরের আড়ালে তখনও জ্বলতে-থাকা প্রদীপের উপর কর্পূর আর সেটিকে ঘিরে আগুনের শিখার ছবি তুলে নিচ্ছে, বলা ভালো, তোলার চেষ্টা করছে মোবাইল ক্যামেরায়।

জুং আমাদের দিকে ফিরল, মোবাইল ফোনটা এখনও ওর হাতে ধরা, ডিসপ্লে দেখে বোঝা যায়, যেটার মধ্যে এতক্ষণ ছিল ও, তার থেকে সম্পূর্ণ বেরোতে পারেনি এখনও, জানাল, ইটখানা, আপাতভাবে দেখে যা মনে হচ্ছে, তাতে ওর বয়স কিছু না-হলেও, পাঁচ-ছ-শো বছর তো হবেই। জুংয়ের কথা শুনে সুনন্দ ব্যাগের উপর আলতো করে হাত রাখে, বলে: ‘পাঁচশো বছরেরও বেশি! মানে, চৈতন্যদেবের কন্টেম্পোরারি! হ্যাঁ, তাই তো!’
‘তার মানে তো হেরিটেজ! হেরিটেজ প্রপার্টি এইভাবে ভেঙে ফেলা যায়?’ দেবাশিস স্বগতোক্তির ঢঙে কথাগুলো বলে।

চোখের সামনে এসে-পড়া চুল সরিয়ে সুদর্শনা কথা বলে এবার: ‘এরা আবার ওসব মানে নাকি! লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই তো মোদির ইলেকশন ক্যাম্পেন ছিল এখানে। আবারও ক্ষমতায় এলে এই মণিকর্ণিকা ঘাট থেকে কাশী-বিশ্বনাথ অবধি করিডর বানাবে। আর সেটা নাকি ওর ড্রিম প্রোজেক্ট!’

‘মাথামোটা কী আর গাছে ফলে! সবাই এখানকার, বেনারসের এই পাথুরে অলিগলি, পুরোনো স্ট্রাকচার— এই সবই দেখতে আসে এখানে। ঝাঁ-চকচকে ব্যাপারস্যাপার তো বিদেশিরা দেখে-দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, ওসব দেখতে কেউ আর এখানে আসবে! যত উৎপটাং চিন্তাভাবনা!’ সিগারেটের প্যাকেট থেকে নিজের জন্য একটা বের করে, আর-একটা শুভকে দিতে-দিতে আমি বলি।

বারাণসী, দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ক্ষেত্র, সেখানেই এইসব হেরিটেজ প্রপার্টি গুঁড়িয়ে দিয়ে, দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর লীলাখেলা চলেছে। বেশিদিন হয়নি নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করেছে, তার মধ্যেই মণিকর্ণিকা শ্মশান লাগোয়া অঞ্চল সম্পূর্ণ মহাশ্মশানে বদলে গেল! ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে, গঙ্গার দিকে চোখ তুলে তাকালাম; চোখের দৃষ্টি তখন ঈষৎ ঝাপসা ছিল কিনা জানি না, মনে হল, চারপাশের আলো মরে এল, সূর্য ডুবতে চলেছে, সেই কমলা রঙের আলোর ভিতর দিয়ে বিষণ্ণ এক পথিক, পরনের ওভারকোট আর গাত্রবর্ণে বেশ একটা সাহেবি ব্যাপার, একটা বই বগলদাবা করে হেঁটে যাচ্ছে গঙ্গার দিকে। বাকিদের ডাকব বলে চারপাশে তাকিয়ে কাউকেই চোখে পড়ে না আমার, এদিকে ওই সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন নদীতে, বন্যার জলের কোনো আর অস্তিত্ব নেই, ঘাট তার দীর্ঘতায় জেগে উঠেছে আবার। ঘাটের শেষ সিঁড়িতে এসে সাহেব ফিরে তাকায়; বাঁ-দিকে সিঁথি কেটে পেতে-আঁচড়ানো চুল, মোটা গোঁফের শেষ প্রান্ত ছুঁচালো, চামড়ার সঙ্গে সংযোগহীন— আমি স্পষ্ট দেখি, কখনো দেখেছি বলে মনেও পড়ে না। সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে সাহেব একবারের জন্য ঘাড় ঘোরায়, মুখে বেদনার ম্লান হাসি, পরক্ষণেই ওই ওভারকোট পরা অবস্থাতেই নেমে যায় জলে, গলাজলে নেমে দু-হাতে ছিঁড়তে থাকে বইখানা, উন্মাদের মতো, ছেঁড়ে আর হাওয়ায় পৃষ্ঠাগুলো উড়ে পড়তে থাকে জলে, মলাটখানা জেগে থাকে, এদিকে সাহেব ডুবে যায় গঙ্গায়; আর একবারের জন্যও ওঠে না। আমি ছুটে যাই জলের কাছে, উপর থেকে দেখার চেষ্টা করি বইটার নামটুকু, অনেক কষ্টে বুঝতে পারি ইংরেজি হরফগুলো: ‘বেনারস: দ্য সেক্রেড্ সিটি’। তার ঠিক নীচে লেখা─ ই বি হ্যাভেল। বুঝি, হ্যাভেল আসলে লেখকের নাম; গঙ্গাবক্ষে তলিয়ে-যাওয়া সাহেবেরও।

আপনি নিষ্ক্রান্ত হন, হ্যাভেল সাহেব! আপনার দেখা বারাণসী আর আজকের এই জনপদ এক নয়; উভয়ের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক।

হাতের মধ্যে ঠান্ডা, সামান্য ভেজা, হাতের স্পর্শে ফিরে তাকাই। জুং। ওর পিছনে কাশী-বিশ্বনাথ আর জ্ঞানবাপী। ওর চোখ স্থির আমার চোখের উপর। জিজ্ঞাসা লেগে সেই দৃষ্টিতে। আমায় চুপ করে থাকতে দেখে এবার সরাসরিই জানতে চায় ও: ‘হোয়াট হ্যাপেন?’ আমি ‘নাথিং’ বলে সামান্য এগিয়ে যাই, জুংও আর বেশি ঘাঁটায় না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ চলে আসে পাশে; পাশাপাশি হাঁটে।

তিন

মণিকর্ণিকা শ্মশানঘাট আর কাশী-বিশ্বনাথের মধ্যে স্থানে-স্থানে ইটের পাঁজা, ভাঙা টুকরো-টাকরা ছড়িয়ে এদিক-ওদিক, রাস্তাঘাট এবড়ো-খেবড়ো— ঘন জনবসতির উপর দিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বুলডোজার চালিয়ে দিলে যেমনটা হতে পারে, ঠিক তেমনটাই— ফলত পা ফেলতে হয় সাবধানে। ওই ভাঙচুরের স্মৃতিচিহ্নের মাঝে ইতিউতি মাথা দেখা যায় ছোটোখাটো কয়েকটি মন্দিরের। ইট আর রাবিশের অন্য পার থেকে উঁকি দেয় সেইসব চুড়ো; কোনোটার মাথায় ত্রিশূল, কোনোটা-বা শঙ্খ আকৃতির। মন্দির বাঁচিয়ে, চিহ্নিত করে বেছে-বেছে শুধু মানুষের ঘরবাড়িই ভাঙা হয়েছে তবে? রক্ত-মাংসের জীয়ন্ত মানুষগুলোর তুলনায় মন্দিরের ভিতরের প্রস্তরমূর্তির মূল্য বেশি হয়ে গেল? মাথার ভিতরটা ভোঁ-ভোঁ করে, কারো সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না, সকল বাক্যব্যয় বৃথা অপচয় বলে মনে হয়। আমার মধ্যে কী চলছে, জুং বোঝে কি বোঝে না জানি না, কিন্তু সঙ্গ ছাড়ে না।

বিস্তীর্ণ সেই ভগ্নাবশেষের মধ্যে দিয়ে আমরা হাঁটি। আমরা হেঁটে যাই প্রকৃত মণিকর্ণিকার থেকে বানিয়ে-তোলা পর্যটন কেন্দ্রের দিকে, যা তখনও সম্পূর্ণ রূপ পায়নি, কিন্তু অচিরেই সমস্ত আরোপণ নিয়ে প্রবল হয়ে উঠবে ভারতবর্ষীয় মানচিত্রে। সেদিন আর এতসব ভাঙচুর, আজকের এত গা-জোয়ারির মানুষ তার জন্মভিটে ছাড়তে চায় না শেষতক, যতক্ষণ দাঁত থাকে, বিষদাঁত, মাটি কামড়ে পড়ে থাকে; বিরুদ্ধ শক্তি সেই দাঁত উপড়ে দেয় যে-কোনো উপায়ে, না-হলে কার্যসিদ্ধি হবে না─ বিন্দুমাত্র চিহ্ন থাকবে না। ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ নিশ্চিন্তে, নিজেকে প্রকাশের প্রগলভ উল্লাসে সেলফি তুলবে তখন। এখানকার উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর কান্না, বুকের গভীরে জমে-থাকা রাগ, ক্ষোভ কোনো কিছুই থাকবে না সেই অনাগত আগামীতে: ইতিহাস শুধুই বিজয়ীর আখ্যান; পরাজিতদের উল্লেখ সেখানে থাকে না। রাজতন্ত্রের এই বয়ান, এই উদ্দেশ্য যদি গণতন্ত্রেও কায়েম থাকে, সেখানে তখন আর দল-মত নির্বিশেষে রাজধর্ম পালনের ন্যূনতম সদিচ্ছাটুকুও বেঁচে থাকে না। ঠুনকো অহংকারে, শুষ্কং কাষ্ঠং কেদারার মোহে অন্ধ সে-জন তখন যে-কোনো কুস্তিগিরের চাইতেও নিজের ছাতির মাপ বেশি দেখে। হাঁটতে-হাঁটতে আপনমনে বিড়বিড় করি: ‘বেঁটে মানুষের ছায়া যখন দীর্ঘ, তখন সূর্যাস্ত আসন্ন।’

হাঁটতে-হাঁটতে আমরা পার হয়ে যেতে থাকি দু-পাশে থরে-বিথরে ছড়িয়ে-থাকা ভাঙাচোরা ইটের টুকরো-টাকরা, কোথাও-বা আস্ত ইটের দেহাবশেষ, প্ল্যাস্টারের চাঙড়, বাঁশ, ভাঙা জানলার টুটাফাটা পাল্লা, ছিটকিনি, দরজার কড়া, ভাঙা লেটারবক্স, কোনো-এক বাড়ির গৃহকর্তার নামফলক, এমনভাবে ভেঙেছে যে পুরোটা পড়া যায় না, নামের আদ্যক্ষর আর পদবির শেষ অক্ষরটুকু বুলডোজারের ধ্বস্তাধস্তি এড়িয়ে টিকে গেছে কোনোরকমে, যদিও ওইটুকু থেকে কিছুই আন্দাজ করা যায় না। এক শ্মশান পার হয়ে, পায়ে-পায়ে, আমরা এসে পৌঁছাই আর-এক শ্মশানের সামনে: মণিকর্ণিকা।

পর্ণাকে নিয়ে নন্দিতা আর সুদর্শনা উঠে যায় শ্মশানের উপরতলায় বন্যার কারণে আপাতত শুধু ওই একটা অংশেই চলছে যাবতীয় দাহকার্য─ যেখানে চিতাকাঠে পুড়ে যাচ্ছিল নিথর কোনো শরীর, শবদেহ; আমি এবং জুং তখনও নীচে, ঘাটের সামনেটায় দাঁড়িয়েছিলাম, দেখছিলাম, শ্মশানের চার দেওয়াল লাগোয়া খিড়কি দিয়ে, গঙ্গার উপর নৌকা থেকে দেখলে যেগুলোকে পুরোনো দিনের কুলুঙ্গির মতো ঠেকে, কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছিল গলগল করে। শুভ আর দেবাশিস তখনও ওই ভাঙচুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে, গভীর নিবিষ্টতায় হয়তো দেখে নিচ্ছিল টিকে-থাকা কোনো মন্দিরের কারুকাজ কিংবা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে ফুটে-ওঠা ফাটলরেখা। সুনন্দ বেশ খানিকটা পিছনে, ছবি তুলে যাচ্ছে একমনে।

মণিকর্ণিকা ঘাট

গঙ্গার জল বেড়ে গিয়ে ঘাটের সাত-আটটা সিঁড়ি দৃশ্যমান। সবে দাহ সম্পন্ন করে কয়েকজন এসে দাঁড়ায় ঘাটে। আমরা সরে দাঁড়ালে ওরা নামতে থাকে সিঁড়ি দিয়ে। ছাই ঘেঁটে ডোমেদের তুলে-দেওয়া মৃত মানুষের নাভিকুণ্ডল, গঙ্গার কাদামাটি লেপা মালসায় করে, গঙ্গার পশ্চিম থেকে, পূর্বদিকে পিছন ঘুরে, ভাসিয়ে দেয় একজন। আমরা দেখি, জলের ধাক্কায় মালসা ভেসে যায়, কিন্তু লোকটি একবারের জন্যও ফিরে দেখে না তার পরিজনের চিরকালীন চলে-যাওয়া। ভবসংসার ছেড়ে বরাবরের মতো নির্বাসিত সেই মানুষটিকে উদ্ধার করে, পুন্নাম নরকের দ্বার তার জন্য রুদ্ধ করে এরপর গঙ্গায় ডুব দেয় লোকটি ─পরপর তিনবার। জুং এইসময় সিগারেট ধরালে আমার মনটাও আনচান করে ওঠে, আমি হাত বাড়িয়ে দিই; সবে দু-টানও দেয়নি সেভাবে, জুং সিগারেট এগিয়ে দেয়। সিগারেটে টান দিয়ে ঘাড় ঘোরাই। ঘাটের সামনে দুটো চায়ের দোকান, হাত কয়েকের ব্যবধানে। একটা দোকানে চায়ের অর্ডার দিই। দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চিটায় বসি। পাশাপাশি বেঞ্চিগুলোয় লোকজন, গুলতানি-মশকরা চলছে, যেমন চলে চায়ের দোকানে। বেঞ্চিতে বসে জলের দিকে তাকাই। ঘাটের সিঁড়ি আর নদীর জল যেখানটায় পরস্পরকে ছুঁয়েছে, সেখানটায়, একটা কোণ করে, রজনীগন্ধার সঙ্গে গাঁদাফুল ডাঁই হয়ে আছে। রজনীগন্ধার মালা বা স্টিক থাকার কারণ মৃতদেহ বুঝি, কিন্তু গাঁদাফুলের অস্তিত্বের পিছনের কারণ বুঝি না। বুঝতে চাইও না বোধহয়। অন্য দিকটায়, জলের মধ্যে, নেমে গেছে একটা কুকুর, সাদার মধ্যে মেটে-হলুদ ছোপ, জলের ভিতর কী খুঁজছে তা নিজেও জানে কিনা সন্দেহ।

অর্ডার করার পর চা আসে। মাটির ভাঁড়ে চা; বড়ো ভাঁড়। ভাঁড়ে ঠোঁট রাখি, গরম চায়ের উপর সর পড়েনি তখনও, ধীরে-সুস্থে খাই। চোখ, চায়ে চুমুক দেওয়ার সময়টুকু ছাড়া, নদীর উপর স্থির৷ চায়ের দোকানে একটা খবরের কাগজ ভাগাভাগি করে ঘুরছে এর-ওর হাতে। হিন্দি কাগজ। হিন্দি বলেই খুব-একটা আগ্রহ জন্মায় না আমার। চায়ের ভাঁড়, তখনও পুরো শেষ হয়নি, বেঞ্চিতে রেখে, জুং, ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো দেখে। পাশ থেকে ভেসে আসে খাদে-নামা কণ্ঠস্বর: ‘ইয়ে ছুট্টি খতম হোনে কে বাদ শায়েদ কোর্ট ফ্যায়সলা শুনায়ে গা।’
‘নেহি হোগা। মিলালে না মেরি বাত। ইয়ে সব ইলেকশন কে মাফিক হো রহা হ্যায়। আভি-আভি ইলেকশন গ্যায়া, অ্যায়সে মে ডিসিশন নেহি আয়ে গা, দেখ লে না।’ দ্বিতীয়জনের গলার আওয়াজ প্রথমজনের তুলনায় কিছুটা চড়ার দিকে।

চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, ফাঁকা ভাঁড়টা ফেলবার অছিলায় জটলাটার দিকে ফিরলাম। চোখাচোখি হল কয়েকজনের সঙ্গে। চোখে চোখ পড়া মাত্রই কথা থেমে গেল ওদের। জুংকে হয়তো খেয়াল করেছিল ওরা, আমাকে সেভাবে লক্ষ করেনি, এখন আমার দিকে নজর পড়তে, বোধহয় সন্দেহেই, নিজেদের মধ্যেকার কথাবার্তা আচমকা থামিয়ে দিল। আমার উপস্থিতি মণিকর্ণিকার ঘাটের কাছের ওই চায়ের দোকানের ছোট্ট জমায়েতের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে বুঝতে পেরে ভাঁড়টা এক কোণে জমা হওয়া ভাঁড়ের স্তূপে ফেলে উঠে দাঁড়াই আমি। আমার দেখাদেখি, জুংও। ততক্ষণে সুনন্দ এসে পড়েছে, ও শ্মশানের উপরটায় যাবে, জুংকেও সঙ্গে যাওয়ার জন্য ডাকল; এর মধ্যে ক্যামেরা গলা থেকে নেমে, ঢুকে গেছে ব্যাগে: শ্মশানে ছবি তোলা নিষেধ। সুনন্দ জুংকে এই কথা বলতেই ও ক্যামেরা ব্যাগে ঢোকাতে যাবে, আমি আটকাই, চেয়ে নিই ক্যামেরাটা; ওরা শ্মশানে ঢুকুক, আমি তো আর শ্মশানে ঢুকব না। আসলে ততক্ষণে আমার চোখ পড়ে গেছে উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে, সব হারিয়ে একলা হয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা মন্দিরের উপর।

সুনন্দ আর জুং শ্মশানের উপরটায় উঠে যায়, শুভ আর দেবাশিসকে আপাতত দেখতে পাচ্ছি না কাছাকাছি, আমি জুংয়ের ডিজিটাল ক্যামেরাটা নিয়ে এগিয়ে যাই উত্তরমুখে। এবড়ো-খেবড়ো পথঘাট, ধুতি সামলে পা ফেলতে হয়। কখনো-সখনো, চটি-পরা পা, মচকাতে-মচকাতে বেঁচে যায়, সতর্কতাবশত।

মন্দিরের ঠিক পিছনটায়, গা ঘেঁষে, অ্যাসবেসটসের ঢাল, বেড়ার মতো করে ঘিরে রেখেছে ধ্বংসস্তূপ। অ্যাসবেসটসের ওপার থেকে মুহুর্মুহু ‘রামনাম সত্ হ্যায়’ ধ্বনি ভেসে আসে সমবেত স্বরে, আরও-একটি মৃতদেহ চিতাকাঠ খুঁজে নেবে বলে এগিয়ে আসছে মণিকর্ণিকার দিকে। মন্দিরের সামনের চাতালে চারজন বসে; দূর থেকে দেখে মনে হয়, নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করছে কোনো, কিংবা হতে পারে নিছকই আড্ডা; কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছোলে দেখি, গোল হয়ে-বসা চারজনের মাঝে ছড়ানো তাস, একটা সাদা পৃষ্ঠা আর খাপখোলা ডটপেন। তাসের ব্যাপারে আমার যেটুকু দৌড়, হস্টেলের বন্ধুদের সৌজন্যে, তা ওই টোয়েন্টি-নাইন পর্যন্ত, ফলে এইটুকু অন্তত বুঝি যে, আমার জানা খেলাটা বাদে তাসের অন্য কোনো খেলা চলছে মন্দিরে। ওদের একেবারে কাছে পৌঁছোতে আমার নাকে, অন্যরকম একটা গন্ধ এসে, ধাক্কা মারে। তামাক পোড়ার গন্ধ; কিন্তু শুধু তামাকই নয়, সঙ্গে আরও-কিছু পুড়ছে বলে মালুম হয়। যদিও বিদেশ-বিভুঁইয়ে বেশি কৌতূহল দেখানো ভালো না, আমিও তাই ওইসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে, ক্যামেরাটা তুলে, ওদেরকে দেখিয়ে বলি: ‘ভাইয়া, ইস্ মন্দির কা ফোটো খিচ্ সাকতে হ্যায় ক্যায়া?’
‘হাঁ-হাঁ, বিলকুল লিজিয়ে। লেকিন হম লোগো কা তসবির মত উঠানা।’

মুখে হাসি ঝুলিয়ে, ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাই। যে-লোকটা উত্তর দিল, পা ভাঁজ করে বসে, আমার ঘাড়নাড়া দেখে ঊরুর ওই দিক থেকে লুকিয়ে-রাখা হাতখানা সামনে আনে। হাতের মুঠোয় কলকে। গন্ধের মূল উৎস সম্পর্কে বুঝতে আমার আর কোনোই সমস্যা হয় না, আমি ক্যামেরা নিয়ে চলে আসি মন্দিরের অন্য দিকটায়।

এই দিকটায়, মন্দিরের থামগুলোর— সাধারণের চোখে যতটা বোঝা যায়— তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। আমি থামের ছবি তুলে যাই। চোখে ক্যামেরা দিয়ে সামনে পা ফেলতে গিয়ে টলে যাই, দেখি, মন্দিরের নীচের একটা অংশ, চাতালের ঠিক নীচের অংশে, একটা বড়োসড়ো ফাটল; মন্দিরের তলা থেকে, কোণ করে, খাবলে নেওয়া হয়েছে বেশ অনেকখানি মাটি। এবার ভালো করে তাকাই মন্দিরের চুড়োর দিকে। বুঝি, যে-কোনোদিন, যে-কোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে মন্দিরটি; ভিত নড়ে গেছে তার।

সাবধানে, ধীরে-ধীরে, পরের থামটার কাছে যাই। থামের গায়ে, মাথায় উষ্ণীষ, এক বাহুবলীর মূর্তি, পাথর কুঁদে গড়ে-তোলা। এক ঝলক দেখে মনে হয়, পৌরানিক হনুমান। ঝটপট ছবি তুলে নিই, তারপর ক্যামেরাটা পাঞ্জাবির সাইডপকেটে পুরে, মন্দিরের চাতালে ভর দিয়ে, ঝুঁকে পড়ি মূর্তিটার সামনে। কোনো-এক সময় মূর্তিটার কাঁধে গদা ছিল বোধহয়, এখন আর পুরোটা নেই, হাতের মুঠিতে ধরা দণ্ডটার আদলে অন্তত তেমনই মনে হয়; নাকের কাছটা চটে গেলেও বাকি মুখটা অবিকল আছে, সেখানে কোথাও হনুমানের ন্যূনতম অনুষঙ্গেরও দেখা মেলে না।

মন্দির থেকে সরে আসি। পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করি। খানিক তফাতে এসে সিগারেট ধরাই একটা। শ্মশানের দিকে তাকাতে ভালো লাগে না। এদিকে অ্যাসবেসটসের ধাতব সীমান্ত, তাতে সূর্যের আলো পড়ে বেজায় চমকাচ্ছে, তার সামনে বাঁশের ব্যারিকেডগুলোকে শুধু নিরীহ, নখদন্তহীন নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্ভাগা পদাতিক সৈন্যদের মতো দেখায়।

‘ক্যামেরা দেখকে তো লাগতা নেহি কে আপ আকবর মে কাম করতে হো!’ অপরিচিত গলার আওয়াজে পিছন ঘুরি, দেখি, স্থানীয় একজন, কাপড় কেটে বানানো প্যান্ট আর শার্ট, মোবাইল রাখবার কারণেই হয়তো-বা, শার্টের বুকপকেট ঝুলে গেছে নীচের দিকে, মুখে দিন কয়েকের না-কামানো খোঁচা দাড়ি-গোঁফ; খেয়াল হল, লোকটাকে এর আগে চায়ের দোকানে দেখেছি, আপনমনে খবরের কাগজ পড়ছিল, চারপাশের আলোচনায় একবারের জন্যও ঢুকতে দেখিনি। লোকটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি, নিজের পরিচয় দিই, সঙ্গে এগিয়ে দিই সিগারেটের প্যাকেট। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নেয়, নিজের বুকপকেট থেকে দেশলাইয়ের বাক্স। সিগারেট ধরিয়ে প্রথম টানটা দিয়ে ধোঁয়া ছাড়া মাত্র আমার মনে হয়, এই সুযোগ, কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত না লোকটাকে, আশপাশও ফাঁকা, কাছাকাছি লোকজন নেই সেভাবে, ফলত আমি জিজ্ঞাসা করে বসি: ‘ইতনে সব কুছ হো গ্যায়া হিঁয়া পর, অ্যাজিটেশন বগেরা কুছ ভি নেহি হুয়া?’
‘হুয়া থা, থোড়া-বহুত হুয়া থা।’ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে, দায়সারাভাবেই, জবাব দেয় লোকটা।
‘ফির?’
‘ক্যায়া ফির?’ ঈষৎ হাসে লোকটা। হাসিতে কি বেদনাও মিশে ছিল খানিক, অন্তত পলকের জন্য তেমনটাই মনে হল আমার। লোকটা কিন্তু কথা থামায় না, বলে যায়: ‘ও সরকারলোগ হ্যায়! সরকার চাহে তো ক্যায়া নেহি হো সকতা! সরকার চাহে তো আপকে পেট মে ভুখ নেহি রহেগা, সরকার চাহে তো মসজিদ গিরা কে মন্দির বনা দেগা।’

বাকি সিগারেটটা, দু-আঙুলের ফাঁকে আলতো করে ধরে, টানতে-টানতে, লোকটা হেঁটে যায় চায়ের দোকানের দিকে। গঙ্গার দিক থেকে তখন, শ্মশানের সামনে, ঘাটের অন্য কোণে, দেখে মনে হয় ধ্যানমগ্ন, নীমিলিত নেত্র, বসে-থাকা ছাইমাখা, জটাধারী এক সাধুর দিকে চেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে শুভ আর দেবাশিস। সুনন্দরা নেমে আসছে শ্মশান থেকে। তার পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা গলি, ওই গলি দিয়েই মিছিল করে আসছে মৃতদেহ; যেখানে এসে শেষ হচ্ছে গলিটা, শ্মশানের মুখটায়, সেখানে পরপর কাঠের আড়ত। আড়তগুলো পেরিয়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে গেলে, অন্য সময়, চোখে পড়বে সারিবদ্ধ চিতা। ফুল ডাঁই করে রাখা আছে এক পাশে। আধপোড়া কাঠ ভেসে যাচ্ছে গঙ্গার স্রোতে। চিতার আগুন, পোড়া গন্ধ, অবিরত রামনাম— সবটা মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। বাতাসে উড়ে-আসা ছাই জামাকাপড়ে লেগে পালটে ফেলে রং। আমরাও ফিরতিপথ ধরি।

চার

‘আসলে এটা এখানকার পরম্পরা’— বলছিল সর্বমঙ্গল পাণ্ডে। তুলসীদাস ঘাটে গঙ্গার জল পরীক্ষার অফিস। সর্বমঙ্গল সেই অফিসেই কাজ করে। ওই অফিসে রোজ গঙ্গার জলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গঙ্গার জল ক্রমাগত দূষিত হচ্ছে। কোনোবারই রিপোর্টে অন্যরকম, আশাপ্রদ কিছু মেলে না। সর্বমঙ্গল বলছিল : ‘কলিফর্ম, বিওডি তো পরিসংখ্যান মাত্র। আসল কথা হল, ঘাটের পঞ্চাশ থেকে দুশো মিটারের মধ্যে গঙ্গার জল খাওয়া তো দূরের কথা, স্নানেরও যোগ্য নয়।’ অথচ পুরো শহরটাই উপচে পড়েছে একের-পর-এক ঘাটে। সর্বমঙ্গলের কাছে তথ্য আছে, কাজের কারণেই তাকে সে-সব সংগ্রহে রাখতে হয়, ও-ই আমাদের বলেছিল: অসি ঘাট থেকে শুরু করে অনায়াসে তিন-চার কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায়। ঘাট সংলগ্ন ঐতিহাসিক, পুরোনো স্থাপত্য সব। শহরের চুরাশিটার মতো ঘাটে পঞ্চাশ-ষাট হাজার লোক গঙ্গাস্নান করে রোজ। এদিকে রাস্তায় যেমন ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই সেভাবে নেই, তেমন নিকাশি-নালাগুলিও যেন আপন বেগে পাগলপারা; তাদের গন্তব্য সোজা গঙ্গা। রবি দাস ঘাটে এখানকার অন্যতম বড়ো নিকাশি-নালা, সবেগে গিয়ে মিশছে গঙ্গায়। নালার জলের শব্দ দূর থেকে শুনলে প্রথমে মনে হবে, বুঝি-বা ঝরনার আওয়াজ। কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে আলকাতরার মতো কালো কুচকুচে জলের স্রোত। নাকে অবধারিত এসে লাগবে আবর্জনার পূতিগন্ধ। ঘাটের পাশেই পাম্পিং স্টেশন, সারাক্ষণই তালাবন্ধ, পরম নিশ্চিন্তে সেখানে ঘুরে বেড়ায় গোরু আর শুয়োরের পাল। ‘অথচ দেখবেন বড়ো-বড়ো সব হোর্ডিং! নমামি গঙ্গে!’ এই কথা বলার সময় ব্যঙ্গ ছিল না সর্বমঙ্গলের গলায়, বরং ক্ষোভ ছিল বেশি।

অ্যাসবেসটসের ওপারে যে-গলি, যেখান থেকে শবদেহ আসছিল মানুষের কাঁধে চড়ে, খোলা আকাশের নীচে দিয়ে একদল জীবন্ত মানুষ যথা পূর্বং সম্মানে নিয়ে আসছিল ব্যক্তিগত দুঃখে কিংবা সমবেত উল্লাসে, সেই গলিতে আতরের দোকানে দাঁড়িয়ে দেবাশিস আর জুংয়ের সঙ্গে আতর দেখছিলাম আমি। এক-একটা পাত্রে আলাদা-আলাদা রঙের তরল। পুরু কাচের বোতল, ফলে বাইরে থেকে বোঝা যায় রং। দোকানদার বিভিন্ন বোতল খুলে ওই ঢাকনার সঙ্গে লেগে-থাকা আতর ঘষে দিচ্ছিল ওদের হাতের, পাতায়, চেটোয়, কব্জিতে। বাকিরা এগিয়ে গিয়েছিল; কথা ছিল, মোনালিসা ক্যাফেতে দেখা হবে। ওরা আগে গিয়ে খাবারের অর্ডার দিক।

আতরের দোকান থেকে ধূপ কিনছিল সর্বমঙ্গল পাণ্ডে, আফশোস করছিল গঙ্গার এইভাবে দূষিত হয়ে-চলা নিয়ে; দোকানি কত বুঝছিল, সে অবশ্য সেই বলতে পারবে কিন্তু আমি আর দেবাশিস দ্রুত চোখে-চোখে কথা বলে নিয়েছিলাম নিজেদের মধ্যে। একটু যেচে পড়ে আলাপ জমাতেই বলতে শুরু করেছিল সর্বমঙ্গল। প্রতিবেশী একজনকে দাহ করতে এসেছিল সে, স্ত্রী পইপই করে বলে দিয়েছে, ফেরার সময় ধূপকাঠি কিনে আনতে। সর্বমঙ্গল আমাদের বলে, মণিকর্ণিকায় দাহ করতে আসার ব্যাপারে তার একদমই মত ছিল না, এখানে দূষণের পরিমাণ বেশি। তার চেয়ে অন্য কোথাও যাওয়া যেত, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনও মনে করে যে, মণিকর্ণিকায় দাহ করা হলে মৃত ব্যক্তির স্বর্গলাভ ঘটে: সংস্কার বড়ো বালাই!

আমরা তিনজনই, পছন্দসই, আতর কিনলাম। চন্দন আর কস্তুরী— আমার প্রিয় দুই গন্ধ, আর তাই ছোটো দুটো শিশি, সাধ্যমতো, কিনেই নিলাম। দোকানদার লাল রঙের ছোটো একটা বটুয়ায় ভরে দিল শিশি দুটো। জুং নিল রিঠার আতর। দেবাশিস শৌখিন মানুষ, চন্দনের আতর নিল শুধু, তাই নয়, একটা বেশ প্রমাণ সাইজের আতরদানও কিনল সেই সঙ্গে। সর্বমঙ্গল আগেই চলে গিয়েছিল, কেনাকাটা সেরে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম।

গলি দিয়ে বেরিয়ে বড়োরাস্তায় পড়তে, অজান্তেই, চোখ চলে গেল উপর দিকে। যেদিক থেকে এসেছি, সেদিকে, বড়োরাস্তার সংযোগে, পুরোনো ধাঁচের তোরণটা, যেখানে দেবনাগরী হরফে লেখা ‘মণিকর্ণিকা দ্বার’, সেটা এখনও অবিকল। উলটো দিকে কোনো-একটা গলিতে লস্যির দোকান— বাবা ঠান্ডাই— আছে একটা, সেখানে ভাঙ পাওয়া যায়, শুনেছি। রাস্তা জুড়ে গাদাগুচ্ছের রিকশা, তৎসহ তাদের অবিচ্ছিন্ন প্যাঁ-পোঁ, ফুটপাথের দোকানিদের বিজ্ঞাপনী ডাক, তার মাঝে পরম স্থিতিশীল গোরুদের নিশ্চল নিশ্চিন্তি, দুটো খাবারের আশায় বলিরেখা ফুটে-ওঠা ভিখারিদের আর্ত মুখ, ছোটো-ছোটো দলে ভাগ হয়ে সাধু-সন্তদের থেকে-থেকে ইষ্টনাম উচ্চারণ— এইসব বিবিধ ধাক্কাধাক্কি পার হয়ে আমরা তিনজন এসে পৌঁছাই গোধূলিয়া মোড়ে। দেবাশিস ঘাটের দিকে নির্দেশ করে: ‘বাঁ-দিকে, ওই যে মানমন্দিরের দিকটায়, ওই বড়ো বাড়ির ঠিক পাশের বিল্ডিংটা দেখছিস? নামটা চোখে পড়ছে?’

দূরত্ব খুব বেশি নয়, দেবাশিস যে-বাড়িটা দেখায়, সেই বাড়িটাও বেশ উঁচু, কোনোরকমে কষ্টেসৃষ্টে পড়তে পারি ঝুলতে-থাকা হোর্ডিংখানা: ‘দশাশ্বমেধ বোর্ডিং হাউস।’
‘সত্যজিৎ ওটাকেই ক্যালকাটা লজ বলে সিনেমায় দেখিয়েছিল। সৌমিত্র-সন্তোষ দত্তরা ওখানেই শ্যুটিং করেছিল। সিনেমায় সৌমিত্র খেতে-খেতে ফোন ধরেছিল, মনে আছে?’ আমি সম্মতি জানাই। ‘অত সুস্বাদু কিছু নয়। বরং উলটোটাই। এখানকার খাবার অত্যন্ত জঘন্য।’

জুং, স্বভাবতই, এতক্ষণ কিছু বুঝতে পারছিল না, শুনে যাচ্ছিল হাঁ করে; এবার জানতে চাইল আমরা কী নিয়ে কথা বলছি। ওকে বোঝানোর দায়িত্ব দেবাশিসকে দিয়ে আমি পকেট থেকে বের করে আনি সিগারেটের প্যাকেট। সিগারেট ধরাই। এখানে আসার আগেই ঠান্ডা লেগেছিল দেবাশিসের, কাফ-সিরাপ খাচ্ছে এখনও, গলায় সামান্য একটা সংক্রমণও আছে, তাই এই ক-দিন ও সিগারেট থেকে দূরে, পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে জুংকে বোঝাতে থাকে। সিগারেট খেতে-খেতে এদিক-ওদিক তাকাই আমি। চারপাশ জুড়ে চিল-চিৎকার, ক্যাওস, মোটরগাড়ির হর্নের প্রবল উল্লাস, ছাতা মাথায় খাকি পোশাকের পুলিশের চোখ মোবাইল ফোনের পর্দায় স্থির, অথচ রাস্তা জুড়ে নির্বিকার যানজট। ওরই মধ্যে একটা বাড়ি, মাথার দিকটায় ইংরেজি ‘এল্’ অক্ষরের আদল, একটু যেন অন্যরকম। দেবাশিস আর জুং কথা বলছে; জুংয়ের তরফে শুধুই প্রশ্ন, দেবাশিস উত্তর দিচ্ছে সে-সবের। আমি সিগারেটটা ফেলে, ওদেরকে হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বলে, চলে আসি পুলিশটার কাছে। মোবাইল ফোনখানা ছাতার আড়ালে থাকায় রোদ পড়ছে না স্ক্রিনে, দেখতে পাই, পুলিশটি, মনোযোগী, টেম্পল রান খেলছে। আমি বার দুয়েক ‘স্যার’ বলে ডাকতেই পুলিশটি আমার দিকে ঘোরে আর অমনি মোবাইলের পর্দা জুড়ে সোনালি চুলের যে-ছেলেটি মোহর সংগ্রহ করতে-করতে চলেছিল, খাদে পড়ে যায়। মৌতাত কেটে গেলে যেমন বিরক্তি ঘিরে ধরে, সেভাবেই পুলিশটি জিজ্ঞেস করে: ‘ক্যায়া হুয়া?’
‘স্যার, ও যো মকান দেখ রহে হ্যায় না আপ, ও কিসকা হ্যায়?’
‘মকান কাহাঁ! ও তো চার্চ হ্যায়, সেন্ট থমাস চার্চ! উপর ও ক্রশ নেহি দিখতা!’ এই পর্যন্ত বেশ জোরেই বলে পুলিশটি, তার পরের অংশটা বিড়বিড় করে কী যে বলে, বুঝতে পারা যায় না।

সূর্য গির্জার পিছনে থাকার ফলে ওই ক্রশ কেন, গির্জার রংটাও ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না; যদিও সেটা আর বলতে পারি না পুলিশটাকে। ওকে খেলায় মনোনিবেশ করতে দেখে আমিও, অগত্যা, সরে আসি।

দেবাশিস হাত দেখিয়ে একটা চলন্ত টোটো থামায়, আমাদের গন্তব্য জানায়, বাঙালিটোলা প্রাইমারি স্কুল; টোটোচালক সম্মতি জানালে উঠে বসি আমরা। গোধূলিয়া চকের ওই ঘিঞ্জি পরিবেশের ভিতর দিয়ে, বিচ্ছিরি ঘ্যারঘ্যারে শব্দের হর্ন বাজিয়ে, পথ করে নিতে-নিতে আমাদের নিয়ে টোটো এগোয়। ডান হাতে, সেন্ট থমাস চার্চ, পিছনে পড়ে থাকে। গোধূলিয়া চকের গির্জা, সেন্ট থমাস চার্চ, বিনা কাঁটাতারে, দাঁড়িয়ে থাকে কৌলীন্য নিয়ে। মন্দির আর মসজিদে এত মারামারি, কিন্তু গির্জার সঙ্গে কোনো সমস্যা নেই কারো৷ জুংয়ের মতো ইতিহাসের ছাত্র বা গবেষক না-হলেও এটুকু অন্তত আমি জানি: পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রথমবার দাঙ্গা হয়েছিল লন্ডনের রাজপথে। রানি প্রথম এলিজাবেথ তখন সিংহাসনে, ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যেকার খেয়োখেয়ি বদলে গিয়েছিল মারামারিতে। ওরা বুঝে গিয়েছিল, ধর্ম দিয়ে মানুষকে আলাদা করে দেওয়া সম্ভব; পরিশ্রমের খুব-একটা প্রয়োজন পড়ে না তাতে।

ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের এই নীল নকশা ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশে বুঝতে পারেনি মুসলিম লিগ আর কংগ্রেস, ওদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে চরম ভুল করেছিল। লঙ্কায় লাগানো হনুমানের লেজের আগুন আজও নেভেনি! অযোধ্যায় কি কোনো গির্জা নেই? বিরানব্বই সালেও কি ছিল না? মথুরায়? কাশীতে তো আছে! এখানে অযোধ্যার মতো কিছু হলে এরা কী করবে তখন? হানাহানি আটকাবে, না নিরাপদ দূরত্বে বসে ওম পোহাবে?

দেবাশিস আর জুং নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আমার কানে ঢুকছিল না কিছুই৷ বাঙালিটোলা প্রাইমারি স্কুল আসতে, দেবাশিস আমায় ভাড়া মেটাতে বললে, সম্বিৎ ফেরে আমার।

দুপুরের খাওয়া সেরে হোটেলে ফিরে যাবে ওরা, শুভ আর দেবাশিস বোধহয় পান কিনে ফিরবে। আমার তখনই ঘরে ঢুকে-যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই, কিন্তু কোথায় যাব, কী-ই-বা করব, বুঝতে পারছি না, হাতড়ানোর চেষ্টা করছি হাওয়ায়, তারপর ‘হেঁটে আসি একটু’ বলে সিগারেটের প্যাকেট বের করি। ভরপেট খাবার খেয়ে একটা সিগারেট, অমৃত যেন। আমার হাতে প্যাকেট দেখেই কিনা কে জানে, শুভ হাত বাড়িয়ে দিল, আর সুনন্দ পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে আনল নেভি কাটের প্যাকেট। এই ঘুরতে আসার কয়েক দিন আগেই বাজে একটা অ্যাক্সিডেন্টে ওর পাঁজরের হাড়ে চিড় ধরেছে। এমন জায়গায় যে, কোনো ব্যান্ডেজও করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই সুনন্দ ওর নিজস্ব চলন ধরে রাখতে পারছে না, হাঁটছে একটু ধীরেই, সচেতনে; খুব বড়ো করে শ্বাস নিতে গেলেও ব্যথা লাগছে। সিগারেটও পারতপক্ষে কমই খাচ্ছে; ধোঁয়ার দমকে কাশি উঠে এলে যন্ত্রণায় চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে-আসার জোগাড়। মণিকর্ণিকার ওই ভাঙাচোরা, খন্দে ভরা উঁচু-নীচু রাস্তায় হাঁটতে আজ বেশ কষ্টই হয়েছে ওর। তবু নেশা দুর্নিবার; ভালো খাওয়াদাওয়ার পর চোখের সামনে আমাদের দু-জনকে সিগারেট ধরাতে দেখে কতক্ষণ আর আটকে রাখতে পারে নিজেকে!

ওরা হোটেলের গলি ধরলে আমরা চারজন— শুভ দেবাশিস জুং আর আমি— দক্ষিণ দিক বরাবর হাঁটতে থাকি। খানিক এগিয়ে আর-একটা মোড়। সেই মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, দুর্গাবাড়ির কাছে, বড়োসড়ো একটা পানের দোকান। আমরা তিনজন পানের অর্ডার দিই, জুং কিছুতেই পান খাবে না; কিন্তু পানওয়ালা যখন আমাদের জন্য পান সাজছিল, জলে ভেজানো তিনটে মিষ্টি পাতা সুতরাং চিহ্নের মতো সাজিয়ে, চুন আর খয়ের লাগানোর পর ভেজা সুপুরি দিল, কৌটো খুলে গুলকন্দ দিচ্ছে, অমনি জুং হাত বাড়াল; সে পান খাবে না, গুলকন্দ খাবে। পানওয়ালা কিছুটা গুলকন্দ ওর হাতে দিতেই সেটা মুখের ভিতর চালান করে দিল ও। দোকানদার এর পরে তিনটি পানকে দু-হাতে— দুই-দুই চার আঙুলের শিল্পে— মুড়ে, ক্যাওড়ার সুগন্ধি আতরজলে অল্প ডুবিয়ে তুলে দিল আমাদের হাতে, বলে দিল যে, পানটা একেবারে কচরমচর করে চিবিয়ে না-খেয়ে বরং মুখের ভিতর, গালের দিক করে, রাখতে হবে। ওইটুকু একটা পান খেতে যেন এক ঘণ্টা সময় লাগে! মাথা নেড়ে মুখে পান ভরলাম, কামড় দিলাম, কিন্তু এক ঘণ্টা তো দূর কি বাত, কামড় দিতেই মুখের ভিতর পানটা যেন গলে যেতে শুরু করল; বুঝলাম, বেনারসি পান খাওয়া ঠিকমতো রপ্ত করতে এখনও যথেষ্ট অনুশীলনের প্রয়োজন।

পান খেতে-খেতে আমি আর শুভ, দু-জনে, আর-একটা করে সিগারেট ধরালাম।
সিগারেট শেষ হওয়ার আগেই, দেবাশিস আর শুভ, আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে, যে-রাস্তা ধরে আমরা এসেছিলাম পানের দোকানে, সেদিকে এগিয়ে গেল। ওরা আপাতত হোটেলে ফিরবে; ফিরে হয় বিশ্রাম নেবে, নয় আড্ডা।

আমি আর জুং হাঁটতে শুরু করলাম দক্ষিণ অভিমুখে। গন্তব্য অসি ঘাট।
মিনিট ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাঁটার পর অসি ঘাটের সামনে এসে পৌঁছোলাম আমরা৷ যদিও বাঙালিটোলা থেকে এখানে আসতে সাধারণত মিনিট কুড়ি মতোই লাগে, দেবাশিস আর শুভ এর মাঝে একবার এসেছে, ওদের থেকেই শোনা, তবু হয়তো দুপুরের ওই পাহাড়প্রমাণ আহারাদির পর কিংবা সকাল থেকে অতখানি হাঁটার ক্লান্তিতে, এই সামান্য পথ অতিক্রমণে, কিছুটা হলেও, শ্লথ হয়ে পড়েছিল আমাদের চলন।

অসি ঘাট। বারাণসীর দক্ষিণ প্রান্তের শেষ ঘাট। কথিত আছে, শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়, দুই ভাইকে হত্যার সময়, দুর্গার তরবারির আঘাতে মাটি বিদীর্ণ হয়, সেই স্থলে জন্ম নেয় অসি নদী: তলোয়ারের আঘাতে জন্ম বলে নদীর নাম অসি। বরুণা আর অসি— দুই নদীর নামের মিলনেই প্রাচীন এই জনপদের নাম বারাণসী। ঘাটের একপাশে একটা পিপুল গাছ, তার তলায় শিবলিঙ্গ: আদি সঙ্গমেশ্বর। ওই দুপুরে ঘাট প্রায় শুনশান, ভোরের দিকে এলে অবশ্য অন্য ছবি, অগণিত ভক্তের দল গঙ্গাস্নান সেরে জল ঢালে শিবের মাথায়। তা বাদে বাকি সময় এই ঘাট বারাণসীর অন্য ঘাটগুলির মতো জমজমাট নয়, তুলনায় অনেক বেশি নির্জন, শান্ত। অন্যান্য ঘাটগুলির চিৎকৃত কলরব যেন এই ঘাট একাই স্তিমিত করে দেয়। এখানে আসে না অশ্বারোহী, পদাতিকবীর, সৈন্যদল; অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই, যানযন্ত্র মুখরিত নাগরিক জনতার কোলাহল নেই— এই ঘাট সন্ধ্যার। এই ঘাট নির্জনতাপ্রিয় মানুষদের। এই ঘাট প্রেমিক আর প্রেমিকার। এই ঘাট তুলসীদাসের। এখানে, এই ঘাটে, গঙ্গার পাশে বসে, তুলসীদাস লিখেছিলেন ‘রামচরিতমানস’।

সূর্য ঢলতে শুরু করে পশ্চিমে পৌঁছেছে। জুং আর আমি, ঘাটের সিঁড়ির যে-অংশে ছায়া পড়েছে, সেখানটায় গিয়ে বসি। আমাদের পিছনে নির্বিকার, বন্ধ, দাঁড়িয়ে থাকে ফাস্ট ফুড সেন্টার, ক্যাফেটেরিয়া, আইসক্রিম পার্লার। চতুর্দিকে এত পুরোনো সব স্পর্শ, তার মাঝে এমন নতুনের ছোঁয়াচ, ভালো লাগে না। যদিও কিছু পরে, সূর্য যখন ঘোষণা করবে দিবাবসান, বিপরীত আকাশে দেখা দেবে চাঁদ, এই ঘাট ভরে উঠবে তখন। নারী আর পুরুষেরা, যুগলে, এসে বসবে ঘাটে। কোনো সম্পর্ক ক্রমে দৈনন্দিন হয়ে উঠতে থাকবে, কোনো সম্পর্ক জন্ম নেবে আজ, কোনো সম্পর্ক বুঝি-বা মরে যাবে একেবারে। মণিকর্ণিকা বা হরিশচন্দ্র ঘাটের মতো শুধু মৃত্যুই নয়, অসি ঘাট লিখে রাখে কত-না জন্মের, এমন-কি পুনর্জীবনেরও, সুরম্যকথা।

চাঁদ আর সূর্যের যৌথ উপস্থিতির মুহূর্তে, ওই সন্ধিলগ্নে, এই ঘাট ভরিয়ে দেবে যারা, তারা অধিকাংশই পড়ুয়া। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এখান থেকে হাঁটাপথ। ওদের জন্যই এইসব দোকানপাট চলে। গরম পপকর্নের মতোই মুচমুচে হয়ে ওঠে প্রেম।

জুং ক্যামেরার পর্দায় আজকের ছবিগুলো দেখছিল। বিশেষ করে আমার তোলা ছবিগুলো। মন্দিরের গায়ের কারুকাজগুলো দেখে, বোঝা গেল, মনে-মনে বেশ খুশিই হয়েছে। ও ছবি দেখে যাচ্ছে, আমি আর কী করি, সিগারেট ধরাই একটা। গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ি। এই ঘাট অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন। আদি সঙ্গমেশ্বরের মাথায় যেহেতু শুধুই গঙ্গাজল ঢালা হয়, তাই সিঁড়িতে এসে ধাক্কা মারা জলের কাছে, ঘাটের কোণে, ফুল-মালার ভাসমান উপস্থিতি নজরে পড়ে না।

হাত বাড়িয়ে সিগারেটের কাউন্টার চায় জুং। শেষ দুটো টান দিয়ে জ্বলন্ত ফিলটারের কাছের অংশটা সিঁড়ির পাথরে চেপে ধরে। মুচড়ে গিয়ে নিভে যায় সিগারেটের অবশিষ্ট। ও মাথা এলিয়ে দেয় আমার কাঁধে। হাওয়ায় ওর চুলগুলো এসে লাগে আমার ঘাড়ে, মন্দ লাগে না খুব-একটা। ও টেনে নেয় আমার হাত, ভরে নেয় নিজের হাতের মুঠোয়: ‘আমাদের দু-দুটো শহর পুরো ধ্বংস করে দিয়েছিল অ্যামেরিকানরা। নাইন্টিন ফরটি ফাইভে। সেই থেকে আগস্ট আমাদের কাছে অভিশপ্ত। আমরা, জাপানিরা, ওই ভয় থেকে বেরোতে চেয়েছি। তার জন্য ওর চেয়েও বড়ো কোনো ভয়ের দরকার ছিল আমাদের। আর তাই আমরা গডজিলা বানিয়েছি। হয়তো সেই ভয় থেকে বেরোতে পেরেছি, কিংবা কে জানে, হয়তো পারিনি! তবু ধীরে হলেও যখন সব স্বাভাবিক হচ্ছিল, তখন ওই ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ছোটোখাটো যেটুকু-যা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা ইটের টুকরো থেকে শুরু করে কোনো মহিলার ব্যবহার করা চুলের কাঁটা পর্যন্ত, আমরা যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছি মিউজিয়ামে। কখনো যদি জাপান যাও, দেখবে, হিরোশিমা আর নাগাসাকি— দুই শহরেই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়্যারের মিউজিয়াম আছে। যেভাবে যতটুকু সম্ভব, আমরা আমাদের ইতিহাসকে ধরে রাখবার চেষ্টা করি। আর তোমাদের দেখো, তোমাদের তো সব ছিল, কী সুন্দর। সাজানো-গোছানো। অথচ তোমরাই সেই ইতিহাসটাকে নিজের হাতে খুন করছ। একদিন যখন এই পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না, তুমি থাকবে না, আমিও থাকব না, তখন কিন্তু আমার ইতিহাস থাকবে, তোমার থাকবে না। তোমাদের সব ছিল, তোমরা নিজেরা সব নষ্ট করছ।’

জুংয়ের হাতের মধ্যে আমার হাত, আমি চুপ করে থাকি। চুপ করে থাকা ছাড়া তখন আর কী-ই-বা করার ছিল আমার? জুং ভারতীয় নয়, বর্তমান ভারতের রাজনীতি, তার দলাদলি থেকে উপদলীয় কোন্দল, একনায়কের রক্তচক্ষু, বিচারব্যবস্থার অসাড়তা, নির্বাচনী রাজনীতিতে টাকা-পয়সার হরির লুঠ, প্রচারসর্বস্ব গিমিক, ধর্ম দিয়ে ভাঙাচোরা একটা দেশের অন্দর-বাহির এবং আরও কত কিছু— এতসব সে জানতে যাবে কেন? কী দায় পড়েছে তার? সে তো ততটুকুই দেখবে, যতটুকু তার চোখের সামনে থাকবে। জুংয়ের হাতের মধ্যে থাকা হাতখানা দিয়ে আমি চাপ দিই তার হাতে, অন্য হাত দিয়ে ওর মাথাটা চেপে ধরি আমার কাঁধে। ঠিক ওই মুহূর্তে, আমার চাপা একটা কষ্ট হচ্ছিল, নাকি অক্ষম অথচ তীব্র রাগ, বুঝিনি ঠিক; তবে আঁকড়ে ধরেছিলাম জুংকে। কিংবা যে-কোনো খড়কুটো।

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট

অনির্বাণ বসুর গল্প

আমাদের নতুন বই