Categories
অনুবাদ গল্প

এফুয়া ট্রাওরের গল্প

সত্যিকারের সুখ

ভাষান্তর: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

মাঝে মাঝেই আমার ব্যাপারে ছোট্টখাট্ট ঝামেলা পাকাতেই থাকেন মি. জাস্টিস, আমাদের পুরুতমশাই। আমি অবশ্য সেগুলো ক্ষমাঘেন্না করে দিই কেন-না তিনি যে সরাসরি ঈশ্বরের প্রতিনিধি।
যেমন ধরুন, গতকাল আমি বহুদিন পরে ফের একবার চার্চে গিয়েছিলাম কেন-না মা যে বলে ঈশ্বরই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার চার্চে যাওয়ার পেছনে সেটাই একমাত্র কারণ নয়। আসল ব্যাপারটা বরং মা আমার মাথায় এত জোর আঘাত করেছিল যে দু-চোখ যেন আলোয় ঝলমলিয়ে উঠেছিল যদিও গত আট মাস ধরে বিলের পয়সা না দেওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি নামক বস্তুটিই বিলকুল নিখোঁজ। মা আমাকে আগে থেকেই এই বলে শাসিয়ে রেখেছিল যে, যদি আমাকে চার্চের চৌহদ্দিতে না দেখতে পান তো কোবোকোর মতো শক্ত কিছু দিয়ে পাছায় এমন চাবকাতে থাকবেন যে শয়তান আমার শরীর থেকে বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ছাড়বেন না। মাকে তো আমি হাড়ে হাড়ে চিনি, তা প্রায় বছর তেরোই হল। শ্রীমুখ দিয়ে একবার যা বেরোবে তা করেই ছাড়বেন। তাই, জেনেশুনেই চার্চে গিয়েছিলাম।
উপোস! যা বলছিলাম— ‘ওই যাজক-ঠাকুরটি আমাকে মাঝেমাঝেই খুচরো ঝামেলায় বড্ড বিরক্ত করেন। প্রায়শই বলেন যে, সত্যিকারের সুখ আসলে মাংসপিণ্ডে নয়, চৈতন্যের ভিতরে থাকে। একমাত্র ভালো কোনো কাজ করলেই সত্যিকারের সুখ পাওয়া যায়। নিজেও বুঝতে পারবে যে, এই সু-কর্মফলের দৌলতেই তুমি স্বর্গে যেতে পারবে।’
ওঁর কথা আমার মোট্টে বিশ্বাস হয় না। আমার আত্মা কী করে সুখী হতে পারে যদি আমার রক্তমাংস ক্ষুধার্ত থাকে? শরীরই যদি অসুখী থেকে যায়!
পুরুত-ঠাকুরকে তাই আমার ‘সত্যিকারের সুখ’-এর ব্যাপারে বলার জন্য মুখিয়ে উঠলাম, হাত তুলে দাঁড়ালাম। গত সপ্তাহে বাসস্টপের পাশে নোংরা এক দুর্গন্ধযুক্ত নালিতে ৫০০ টাকার একটা নোট পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। এমনি পড়ে আছে। যে কেউ তুলে নিতে পারে। একবার যদি দেখতে নোটটা কীভাবে ওই নর্দমায় ভাসছিল, যেন পুরো এলাকাটাই ওর নিজের দখলে।
যাই হোক, আমার ‘সত্যিকারের সুখ’-এর ব্যাপারে যাজকমশাইকে বলব বলে তো হাত তুললাম। কিন্তু যাজক-ঠাকুর তা লক্ষ করার আগেই মা আমার মাথার পিছন দিকে এত্ত জোর দড়াম বাড়ি মারল যে, চার্চের ভিতরেই আমি বেথলহেমের তারাটা দেখতে পেলাম।
আহা! যাজককে যদি বলতে পারতাম কীভাবে আমি ওই সবুজ হয়ে আসা জলে ঝাঁপ দিয়েছিলাম আর বেরিয়ে আসার পর আমার গা থেকে একশোটা ইঁদুর মরে পড়ে থাকার মতন দুর্গন্ধ বার হচ্ছিল কিন্তু ঝকমক করছিল আমার মুখমণ্ডল; ‘সত্যিকারের সুখ’-এর কারণে উজ্জ্বল। সেদিন আমার রক্তমাংসে সুখের উৎসব আর বেজায় খুশি ছিল আমার আত্মা।
আরে, না রে বাবা! আমি অত্ত বোকাসোকা নই। খুবই ওয়াকিবহাল আমি যে যাজক-ঠাকুরের সুখের সংজ্ঞায় যে-চিরকালীনতা রয়েছে, তার ধারে কাছেও নেই আমার সুখ। হুটহাট করে খরচ হয়ে গেল ওই পাঁচশত। দু-খানা অ্যাগেগে পাউরুটি আর রোস্টেড চিকেন। কিসসু পড়ে নেই, নিমিষে ফুড়ুৎ। কিন্তু আমরা সবাই ভারী আনন্দের সঙ্গে সেদিন সন্ধেবেলায় চপ-চপ খেয়েছিলাম আর মায়ের মুখ কেমন আমারই মতন হাসিতে ভরা ছিল। আমি যেন তার প্রথম পুত্রসন্তান, যার জন্য তিনি গর্বিত। দ্যাখো, গর্বে আমার ছাতি কেমন ফুলতেছে! যাইহোক, চার্চ থেকে ফিরে আসার পর এই সুখ-সুখ অনুভূতিটাই সারাদিন মাথাটা চেবাচ্ছিল।
রাতের খাবারের জন্য মা যখন আকারা বীন ভাজছিল, তখন মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা তোমার কি মনে হয় জাস্টিসমশাই যা বলছিল সেটাই সত্যি? আত্মাই কি একমাত্র ‘সত্যিকারের সুখ’ অনুভব করতে পারে? ‘সত্যিকারের সুখ’ কি কেবলমাত্র ভালো কাজ করলেই পাওয়া যায়?’
মা ডাকল— ‘এদিকে আয়।’ তারপর আমার কাঁধের ওপর ঘামে ভেজা কবোষ্ণ হাত রাখল। মায়ের হাত থেকে কেরোসিন আর পাম তেলের গন্ধ ভেসে আসছে। আসুক, ওটা কোনো ব্যাপার না।
প্রায় জাস্টিস-যাজকের সুরেই মা বলল, ‘ভগবানের সন্তান হতে পারাই হল সমস্ত সুখের মধ্যে সেরা।’
আরিব্বাস, আম্মা।
‘পেটের খিদে আর পকেটের পয়সা কোনোদিনই আত্মাকে সত্যিকারের সুখ পেতে দেবে না।’
‘কিন্তু, মা’—! আমি তর্ক জুড়ে দেবার চেষ্টা করতেই মা আমাকে থামিয়ে দিল। আর গালে একটা টুসকি মেরে বলল— ‘নিজের দিকে তাকিয়ে বল তো বাছা শেষ কবে তুই আমার জন্য হেসেছিলি? শেষ কবে তোর নিজেকে সুখী–খুশি মনে হয়েছিল? মায়ের জন্য একবার হাসি ফুটিয়ে তুলতে বাধ্য হলাম।’
মা বলল— ‘সারাদিন হতচ্ছাড়াগুলোর সঙ্গে ঘুরে বেড়াস, আর আজে বাজে কাজ করে বেড়াস।’
আমি বলে ফেললাম— ‘না না, মা!’ এই রান্নাঘর থেকে এখনই ছুট্টে বেরিয়ে যেতে চাই। মায়ের কথাবার্তা শুনে মেজাজ খাপ্পা হয়ে উঠছে।
কিন্তু মা থামল না। বলল— ‘ভাবিস না যে আমি কিচ্ছুটি জানি না তোরা কী করে বেড়াস। কিন্তু তুই তো আদতে ভালো ছেলে। আমার বুকের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল— তোর ভেতরে এক ভালো ছেলে বাস করে। সেই জন্যেই বনবন করে দিনরাত ঘুরতে থাকিস, সারা পৃথিবীর বোঝা যেন ঘাড়ে তুলে নিয়েছিস আর মুখ দেখলে মনে হয় ঈগুঙ্গুন দানো ভর করেছে তোর ওপর।’ নিজের মুখ ভেংচিয়ে, কুঁচকিয়ে মা আমাকে নকল করল।
আমরা একচোট হাসলাম আর মায়ের সঙ্গে মিলেমিশে প্লাস্টিকের প্লেটগুলো টেবিলে রাখতে থাকি। আমরা সবাই একসাথে জড়ো হয়ে বসি যাতে মাঝখানে রাখা কেরোসিনের ল্যাম্প থেকে আলো যাতে আমাদের প্লেটের ওপর পড়ে। রাতের খাবার হিসেবে বানানো বীনের কেক খেতে শুরু করলাম। মুখে হাসি টাঙিয়ে রাখলাম আর ঠিক করে ফেললাম যে, এখন থেকে আমার আত্মাকেও সুখী-খুশি রেখে দেব। মনস্থির করে ফেললাম যে, অন্তত আজ থেকে ভালো কাজকর্মেই শুধু মন দেব যাতে ঈশ্বরের সন্তান হয়ে উঠতে পারি।
দরজার পাশে, বাবা হঠাৎ ঠিক তখনই হাজির হলেন। তিনমাস বাবার মুখ দেখতে পাইনি। সাথে-সাথেই আমার সুখ যে কোথায় উধাও হয়ে গেল। নিজের রংচটা, পামতেলের ছোপ লাগা ব্লাউজটাকে টানটুন করে নিতে নিতেই একগাল হেসে মা বাবার দিকে তাকালো।
খুব বিরক্ত লাগছিল। আমি ওঁকে স্বাগত জানাইনি। কেবল আমার প্লেটটা হাতে তুলে নিলাম।
জাস্টিস-ঠাকুরের আরও একটা কথায় খুব বিরক্ত লাগে যখন বলেন যে, বাবা-মার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। মাকে শ্রদ্ধা করো।’ হ্যাঁ, জাস্টিস-ঠাকুরের এই কথাটা আমি একশোভাগ মানি। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে যখন ভাবি যে, ভোর থেকে উঠে মা লোকজনের বাড়ি গিয়ে সারাদিন-রাত ধরে তাদের ঘরদোর পরিষ্কার করে আর সারা শরীরে ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফেরে। কীভাবে পাঁচ-পাঁচটা বাচ্চার দেখাশোনা করে, পেট ভরা না হলেও নিজের হাতে খাবার বানিয়ে খাওয়ায়।
কিন্তু, ‘বাবাকে শ্রদ্ধা কর’। না, আমি পুরুত-ঠাকুরের সঙ্গে একমত নই। সত্যি বলতে কী যাজক-মশায়ের কথায় শরীরে কীরকম জ্বলুনি ধরে, কেন-না, তিনি হয়তো আমার বাবার সম্বন্ধে কিছু না জেনেই অমন কথা বলেছেন। যখন মন চায় বাবা বাড়ি ফেরেন। যেহেতু বেশিরভাগ সময়েই তার বাড়ি ফেরার কোনো টান থাকে না, তাই বাড়িতেই ফেরেন না। আর যদি কখনো আসেন তো শরীরময় এত চড়া বিয়ারের গন্ধ থাকে যে, শরীর ঘুলিয়ে ওঠে, কেমন বমি-বমি ভাব হয়, যেন উগরে দেব সবকিছু। কেঁদেকেটে শিশুদের চোখ যেরকম লাল হয়ে যায়, ঠিক সেই রকমই তাঁর চোখ যেন রক্তবর্ণ। বাড়ি ঢোকার সময়ে পকেটে কানাকড়িও থাক না আর হাত দুটো দু-পাশে ছড়ানো থাকে। কিন্তু, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ে পকেটভরতি, হাত দুটো মুঠি পাকানো। প্রত্যেকবারই ভেড়ার মতন নরম হেসে মা ওঁকে স্বাগত জানাবে যেন ঈশ্বরের উড়নচণ্ডী ভেড়াটি ফিরে এসেছে। ফিরে যাবার সময়ে ফের একবার মা ঠোঁট-নাক ফুলিয়ে কাঁদতে থাকবে।
বাবার গা থেকে বেরুনো বিয়ারের গন্ধ আর মায়ের ওইরকম অভ্যর্থনাময় হাসি আমার সহ্য হয় না। উঠে চলে যাই। বীন কেকের পুরোটা খাওয়াই হয় না। ছোটো বোন আডা জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর অন্য চোখটা আমার আকারা বীনকেকের দিকে নিবদ্ধ। আমি ইশারা করতেই অন্য কেউ কিছু বলার আগেই সে এক গরাসে পুরো বীনকেকটা গপাত করে গিলে ফেলল।
সবসময় যেমন হয়, তেমনই বাবা আমাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিতে চান না আর মা ভান করে যেন আমাকে উঠে যেতেই দেখেনি। এতে আমার বিরক্তিটার মাত্রা আরও চড়ে গিয়ে সুখ যে কোথায় লুকোয় ঝটপট ঠিক যেরকম পুলিশের দেখা পেলেই চোরেরা গা ঢাকা দেয়। আমার ভিতরে অনেক রকমের বিরক্তির বসবাস। সত্যি বলতে কি এই বিরক্তিগুলো পেটের মধ্যে এমন গুলোতে থাকে যে, মাঝেমাঝে ঠাওর করে উঠতে পারি না যে এই গা গুলিয়ে ওঠা ভাবটার কারণ কী আমার খিদেবোধ নাকি অসন্তুষ্টির অস্বাচ্ছন্দ্য!
শহরতলিতে বন্ধু ওলুর কাছে চলে যাই। আমরা গিয়ে একটা ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত বাসের মধ্যে বসে সান্ধ্য হকারদের সিগারেট বা বিয়ার বিক্রি করা দেখি। নয়তো-বা ধোপদুরস্ত আগবাডা শার্ট পরা চকচকে ইম্পোর্টেড গাড়িতে বসা পুরুষদের জন্য কোমর দোলাতে থাকা সুন্দরী আশাবাও মেয়েদের লক্ষ করি। ওলু-র কাছে ভালো জাতের ইগবো সিগারেট আছে। মেঘের চূড়ায় না পৌঁছোনো পর্যন্ত দু-জনে ধূমপান করতেই থাকি।
ওলুকে জিজ্ঞাসা করি— ‘হ্যাঁ রে ওলু, ‘সত্যিকারের সুখ’ কী জিনিস রে?’
ওলু এমনভাবে তাকায় যেন আমি এক আস্ত গাধা। জিজ্ঞাসা করে— ‘ইগবোটা খুব কড়া লাগছে নাকি?’
হেসে ফেলি। না রে, সত্যি সত্যিই জিজ্ঞেস করেছি।
মিনিট পাঁচেক মাথা ঘামানোর পর চোখ পিটপিট করে বলল— ‘‘সত্যিকারের সুখ’ জোড়ায় জোড়ায় আসে।             দুইখান বড়ো মাই আর দুটি পেল্লাই সাইজের পাছা।’
মুঠি পাকিয়ে সে আমার দিকে এগোলো; আমিও মুঠো পাকিয়ে ওর মুঠিতে ঠেকালাম। বেশ অনেকক্ষণ ধরে খিলখিল করে হাসলামও। ওলু— আমারই মতন, স্তনে হাত দেয়নি কখনো। কিন্তু ইগবো খেতে খেতে আমাদের জটলায় সেটাই তো আলোচনার মুখ্য বিষয়। কেউ যদি আমাদের কথায় কান পাতে, তো নিশ্চিত ধরে নেবে যে, মেয়েদের বুকে হাত দিলেই হয়তো পুরুষের মোক্ষলাভ ঘটে।
সেদিন রাতে বাড়ি পৌঁছোবার পরে দেখি মি. ডন, মানে আমার বাবা, ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গেছেন; মা ঘরের মধ্যে একা। কাঁদছে। এ-সব আমার কাছে কোনো নতুন ব্যাপার নয়। বারান্দায় পাতা বিছানায় শুয়ে থাকা ভাইবোনেদের পাশে শুয়ে পড়লাম। চোখ দুটোকে ঢেকে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কমবক্ত ঘুম আসতেই চায় না!
ভোর হল। সকাল হলেই মেজাজটা কেমন চিড়চিড়িয়ে যায়। বাসস্টপে গেলাম, বাসগুলো ধোয়াধুয়ির কাজে ড্রাইভারদের সাহায্য করা ছাড়াও কন্ডাক্টরদের সাথে গলা মিলিয়ে যাত্রীদের ডাকতে শুরু করলাম। সাতসকালেই যা আমার সবচেয়ে খারাপ লাগে তা হল আমারই বয়সী অন্য বাচ্চারা ইউনিফর্মের সঙ্গে ঝাঁ চকচকে বাটার জুতো আর ধবধবে সাদা মোজা পরে স্কুলে যায়; হাবভাব এমন যেন তারা কোনো বিশেষ কেউকেটা। এত্ত নাক উঁচু— জাস্ট ভাবাই যায় না। বাসে ওঠার সময় বোধহয় দরজার মাথায় গোত্তা খাবে। সিটটাকে ঝেড়েপুঁছে তারপর বসে ওরা যেন ওদের ইউনিফর্ম মেড-ইন-চায়না নয়, খুব দামি অশোক কাপড়ে বোনা। ওদের যেন তখনই বই বার করে পড়া শুরু করতে হবে। দেখাতে চায় বোধহয় যে সবাই জানুক যে ওরা পড়াশুনা জানা।
আরে, আমিও তো— পড়তে জানি। চটাপট পারি না হয়তো। কিন্তু ধীরে ধীরে, একটু একটু তো পারি। ছাঁটাইয়ের জন্য কাজ হারিয়ে বাবা বিয়ার খাওয়া ধরার আগে আমিও স্কুলে যেতাম। আমি অবশ্য লোক দেখানোর অছিলায় বাসে উঠেই বই খুলে বসে পড়তাম না। সে যাকগে, যথেষ্ট বড়ো হয়েছি। তেরো বছর বয়স হল। স্কুলে যাই না এখন। দরকারই নেই। চাকরির প্রয়োজন।
মাথা ব্যথা করে। বেশ ভালো মতোই। দুচ্ছাই! আজ তো ওই ‘সত্যিকারের সুখ’— সুখ করেই সারাটা রাত মাথাটা বিগড়ে ছিল।
সুখের এমন হড়বড়ানি ভাবটা আমার মোট্টে ভালো লাগে না। সবসময় টগবগাচ্ছে, যেন ঘোড়ায় জিন দিয়ে এয়েচে। আমি তো বরং সেরকম সুখ চাই, কক্ষনো যা ফুরোবে না। যাজক-ঠাকুর যদি বলেন যে, ‘সত্যিকারেরর সুখ’-এর সঙ্গে রক্তমাংসের কোনো সম্পর্ক নেই বা খিদে-টাকাপয়সার সঙ্গে য়ুক্ত নয়, তাহলে সেরকম সুখের জন্য চেষ্টা চালাব না কেন? তাহলে হয়তো আমার এই পেটব্যথা, মাথার চিড়বিড়ানি সব উধাও হয়ে যেত, চোর যেভাবে রাতের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায়।
সুতরাং আজ যাঁরাই বাসে উঠেছেন— বুড়ো, অল্পবয়সী, মোটা, রোগাপাতলা, ঘেমো, সুন্দরী কিংবা কুচ্ছিত— সবাইকে সাহায্য করেছি। মাল তুলে ধরেছি। সবার দিকে তাকিয়ে হেসেছি। স্বাগত জানিয়েছি। কাউকে গালমন্দ করিনি। শাপশাপান্ত বা চিৎকারও না। এমনকী, এক মহিলাকে তার ঘ্যানঘেনে বাচ্চার স্কার্ট থেকে গু পরিষ্কার করতেও সাহায্য করেছি।
আজ যে কেউ আমাকে দেখলেই বলবে ওই তো হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য ‘ভগবানের সন্তান’ হাজির। সবাই আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে, আর্শীবাদ করছে। একজন মহিলা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছিল যেহেতু আমি একটু সাহায্য করেছিলাম।এখন আমার নিজেকে বেশ সুখী-সুখী লাগছে। আর এই ভালো লাগাটা সারাটা সকাল পেরিয়ে বিকেল অবধি সঙ্গে ছিল।
কিন্তু বিকেল হতেই, কাজটাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, আমার ভেতর থেকে শয়তানটা বেরিয়ে আসে আর আমার ভালোলাগার বারোটা বাজিয়ে দেয়। একদিন একজন মহিলা বাস থেকে নাবার সময় নিজেকে ঠিক সামলাতে পারছিল না। ব্যাগের ভিতর থেকে উঁকি দেওয়া পার্সটা আমাকে চুম্বকের মতো টানছিল। কী হতে চলেছে বোঝার আগেই বন্দুক থেকে গুলি ছুটে যাওয়ার মতন আমার হাতটা বেরিয়ে এল আর পার্সটা বার করে নিল।
ছ্যা! পুরোনো অভ্যাস কীভাবে এসে সবকিছুকে গ্রাস করে আর নিজের সংযম খোয়া যায়। এমনকী, মহিলাটিকে খুব ভালো করেই চিনতাম; রোজই তিনি আমাদের বাসেই চড়েন।
বাড়ি ফিরে আসার সময় পার্সটা আমার শার্টের ভিতরে ভারী হয়ে রয়েছে। পার্সটার ওজনের ভারে আমি যেন ঝুঁকে পড়ছি। পার্সটা খুলে দেখলাম। মুণ্ডু থেকে চোখটা খসে পড়বে বোধহয়। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লোকজন ডাকা, গাড়ি ধোলাই করার জন্য খালাসির সারা হপ্তার বেতন! আরে, ভেতরে কী আছে, তার অর্ধেক তো এখনও দেখাই হয়নি! মহিলার পার্সে থাকা আই.ডি কার্ডটা নজরে পড়ল। তাঁর নাম তায়ো অগুনয়েমি। ১৯৬২-তে জন্ম। আই.ডি কার্ডটার ভিতর থেকে তাঁর চোখ যেন আমাকে লক্ষ করছে। লজ্জা পেল খুব, আত্মা যেন বিষিয়ে উঠল। তখনই ঠিক করলাম শ্রীমতী অগুনয়েমিকে পার্সটা ফেরত দিয়ে আসব। ফের যেন নিজেকে সুখী-খুশি মনে হল।
কিন্তু বাড়ির কাছে পৌঁছোতেই বিরাট হল্লাগুল্লা কানে এল। ভাঙাচোরা ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়েই দেখলাম মা যেন বাড়িওয়ালাকে ভিতরে ঢোকার জন্য অনুরোধ–উপরোধ করছেন। ‘প্লিজ স্যর! এক হপ্তা পিছিয়ে দিন স্যর। পায়ে পড়ছি, স্যর, মাত্র একটা সপ্তাহ। মায়ের গলার স্বর কীরকম কেঁপে কেঁপে উঠছে। বুঝতে পারছি মা কান্নায় ভেঙে পড়ছে! বাবা গতকালই মায়ের সব টাকা হড়প করে ভেগে পড়েছেন। এই দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি। মাথার ভিতরটা খান খান হয়ে যাচ্ছে; কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। মোটেই সোজা ব্যাপার নয়। পরীক্ষার শক্ত প্রশ্নপত্রের মতো।
ঘরে ঢুকে যদি মায়ের হাতে পার্সের টাকাটা তুলে দিই, তাহলে বাড়িওয়ালা খুশি হবে, মা তো হবেই। কিন্তু এর অর্থ তো আমি একটি চোর এবং মিসেস অগুনয়েমি খুশি হবে না।
তায়ো অগুনয়েমিকে যদি কালকে টাকাটা ফেরত দিই, তাহলে শুধুমাত্র অগুনয়েমি খুশি হবেন। কিন্তু যত চেষ্টাই করি না কেন, পার্সটা ফেরত দিলে আমি খুশি হতে পারব না। কী করে হব, বাড়ি ভাড়াই যদি বাকি থেকে যায়?
পেটের ভিতরে ছুঁচোরা আগের থেকেও বেশি দাপাদাপি জুড়ে দিয়েছে। এই সত্যিকারের সুখ ব্যাপারটা বড্ড বেশি ভারী হয়ে যাচ্ছে। শ্রীমান ডন, এই আমি, মাত্র একদিনের সুখের ধাক্কাতেই কাবু, কুপোকাত। বাড়িওয়ালা মাকে অপমান করছে, জিনিসপত্র গুটোতে বলছে।
আমাকে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মিসেস তায়ো অগুনয়েমির টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দিই। মনে হল— “সত্যিকারের সুখ’-এর জন্য এখনও আমি প্রস্তুত নই।’

চিত্রঋণ: জর্জিয়ো দি চিরিকো

লেখক পরিচিতি:

এফুয়া ট্রাওরে একজন নাইজেরিয়ান-জার্মান লেখক। ছোটোবেলা থেকে বসবাস করেন দক্ষিণ নাইজেরিয়ার একটি ছোটো শহরে। ছোটোবেলা থেকে নাইজেরিয়ার মিথের প্রতি আগ্রহ। সাম্প্রতিক লিখেছেন কিশোরদের জন্য য়োরুবার মিথকে কেন্দ্র করে একটি বই যেটা সুদূর ভবিষ্যতে প্রকাশের অপেক্ষায়। তাঁর ‘সত্যিকারের সুখ’ বা ‘ট্রু হ্যাপিনেস’ গল্পটি ২০১৮ সালের সেরা কমনওয়েলথ ছোটোগল্প (আফ্রিকা) হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। এই গল্পটি ১৩ই জুলাই ‘গ্র্যান্টা (GRANTA)’ ম্যাগাজিনে (অনলাইন) প্রকাশিত হয়েছিল।

One reply on “এফুয়া ট্রাওরের গল্প”

একটানা পড়ে গেলাম। মনেই হলো না যে অনুবাদ। বেশ ভালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *