জব্বার আল নাঈমের গল্প

জীবনের ছুটি নেই

টানা দুই দিন দুই রাত ধরে হাঁটছি। শরীর এখন সামনের দিকে কিছুতেই এগুতে চাইছে না। তখনও সূর্যকে ক্লান্ত অবিশ্রান্ত লাগেনি। কিন্তু ক্লান্ত-অবিশ্রান্ত আমার চোখে রাজ্যের ঘুম। নিজেকে মাটিতে বিছিয়ে দিলাম। সূর্য বিশ্রাম শেষ করে কপালে আলোর স্ফুরণ ফেলে। আড়মোড় ভেঙে হাঁটতে শুরু করি আবার। পলক ঘুরতেই দেখি একটি বিড়াল আমার ছায়ায় হাঁটছে। বিষণ্নতা কাঁটিয়ে, কৌতূহল থমকে দেয়; দাঁড়াই। বিড়ালও দাঁড়ায়, করুণ দৃষ্টিতে তাকায়। নানান ভাবনা মাথায় কাজ করে তখন। হয়ত খারাপ কিছু হবে। আবার ভাবি, দৃষ্টিভ্রম হবে। মাঝে মাঝে এসব ভাবনা মিথ্যা প্রমাণিতও হয়। সে আমার মতো সংসার ত্যাগী। নিঃসঙ্গতার বন্ধু। আমার বন্ধু ভাগ্য বরাবরই ভালো। তবে দুর্দিনের নয়। সুদিনের।

চিত্র: রেমব্রান্ট

পুনরায় চলতে শুরু করি। বিড়াল আমার আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ছায়ায় হাঁটছে। তবে কিছুটা ক্লান্ত। মাঝে মাঝে পায়ের খুব কাছাকাছি চলে আসে। আমি বিরক্ত হই। যদিও সেই বিরক্তিভাব কেটেও যায়। আস্তে আস্তে মমতার জন্ম নেয়। সেটা প্রগাঢ় মমত্ববোধে রূপান্তরিত হয়। আবেগ হারানো আমি অচেনারে চিনি আত্ম-বিসর্জনে। বিড়ালের প্রতি অদ্ভুত রকমের মায়া অনুভব করি। আলো-আঁধারে তা টের পাই। তবে, এর উপযুক্ত কোনো কিছু জানি না। শরীর নিয়ে হাঁটতে পারছে না বলে ক্লান্ত বিড়ালটি ক্রমেই নিস্তেজতায় ভর করে। কিন্তু আমি দ্বিতীয় জীবন চাই না। তাহলে কেনো মায়া লাগে বারবার। দৃঢ় সংকল্প করি, হেঁটে যাব বহুদূর, যেখানে কেউ আমাকে পাবে না।

বিলের এপাশ থেকে ওপাশ নজর রাখলে দেখা যায় অদূরে আকাশ নেমেছে। দৌড়ে গেলে ছোঁয়া সম্ভব! ইচ্ছে হলে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ওঠাও যাবে। অথচ তা আর হয়ে ওঠে না। কখনোই আকাশের কাছে যেতে পারি না। কাছে গেলেই আকাশ দূরে সরে। বিলের অন্য মাথায় ছোটো গাছ ছাড়া কোথাও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব দেখা যায় না। তাহলে সেটা গাছ নাকি দ্বিধা! অথচ দিব্যদৃষ্টি দেখছে— রোদের প্রতাপকে প্রতিবাদ জানিয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে গাছ। শরীরে সমস্ত সূর্যের আলো মেখে নদীর জল ঢেলে, নিজের কাছে নিজেকে ছেড়ে, লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। মাথায় তখনও বারোয়ারি ভাবনারা কিলবিল করছে। পৃথিবীর বাইরে জীবন্ত মরুভূমির আকৃতি! পথে তৃষ্ণা পেলে পিপাসা মিটানোর জল থাকবে না। প্রেমের কলঙ্ক গায়ে লেপ্টে আছে। আমাকে বইতে হচ্ছে, মায়ের মুখের চির সত্য ভবিষ্যৎবাণী। মনের অলিগলিতে লুকানো সত্য কেউ টানতে পারছে না। অবাধ্যতা সহ্য করতে পারেননি প্রিয় বাবা। তাই অনেক আগেই পরপারের সওদাগর হয়েছেন। অসহায়গ্রস্থ জীবন সাজাতে জ্বলন্ত কয়লা হাতে হেঁটেছি হাজার হাজার মাইলের পথ! সেখানেও চরম রকমের ক্রোধ জমা। ক্রোধের গায়ে আগুনের নগ্ন নৃত্যের আসর রোজ রোজ বসে।

শুনেছি জলের হাত-পা, চোখ-মুখ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস আছে। দেখতে নারীর মতো সুশ্রী ও সুন্দর। তুলতুলে হাত, টলটলে দেহ, সুডৌল যুগলস্তন। আবেগপ্রবণ মায়া নিষ্কাম মস্তিষ্কে লোভের ব্যাকরণ মুখস্ত করায়। নিরূপায় আমি সূর্যের তাপে গলতে থাকি হাতের উপর হাত রেখে। চোখের ভেতর অপ্রকাশিত ভাষায়। কিছুটা আবেগ কিছুটা আবেশে। নিশ্চিত মূর্খতায় বোকাগলির অন্ধ পথে। হাঁটতে হাঁটতে চালাক হওয়ার সৌভাগ্য হল না আর!

ভালোবেসে গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায় ভুলে বসেছি। সে-সব কোনো কালে ব্লেইসি প্যাসকেলের ক্যালকুলেটরেও ধরবে না। একদা মাটিকে কাগজ বানিয়ে, মোহের ছলা কলায় নিঃস্বার্থ কলমে লিখে নিয়েছিলাম তোমার নাম। ফলস্বরূপ জিকির বনে বসে তসবীহ গুণি। ধ্বংসের দিকে গিয়েছে পিতামহের চেনা প্রাচীন শহর। বিত্ত বৈভবে মিথ্যা আশ্রয় ও আশায়। পিঁপড়াকে প্রণাম জানিয়ে সাম্রাজ্য জ্বালিয়ে দিয়েছে— দ্বিতীয় মোঘল। ভুলের খেসারত দিতে মোঘলরা প্রতাপ ও প্রভাব হারানোর সাথে হারিয়েছে ভারতবর্ষ। হায়, অধঃপতন! মানুষ যাকে অভিশাপ বলে বাতাসে ভাসিয়ে দিতে চায়, আসলে তা অসুস্থ চিন্তার প্রতিফসল। এমন চিন্তা সময়কে নিশ্চিত পরাজয়ের প্রান্তে পৌঁছাবে। যা রাজ্যের সর্ব শক্তি প্রয়োগেও উদ্ধার অসম্ভব!

দ্বিতীয় জীবনের কাছে ভালোবাসা দিতে বা নিতে যেতে চাই না। নিঃসঙ্গতায় মন খারাপ করে বসে থাকব। উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে থাকব। দ্রুত পায়ে বিড়াল সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হই। বিড়াল প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে অনেক পেছনে। ছায়ার সাথে হেঁটে কুলোয় না। তার অসহায় আর্জি আমার মায়ার দরজা দ্বিগুণ প্রস্বস্ত হতে থাকল। হাঁটু গেড়ে সামনে বসি। তাতে বিড়াল সামান্য ভয় পেয়েছে মনে হল না। চোখে মুখে অস্থিরতা নেই। একদম স্বাভাবিক। জানতে চাই, কোথায় যাবে? কথা শোনে মিটমিট সামনে তাকায়। বুঝতে পারি, আরও দূরেই তার গন্তব্য। জানতে চাই, ক্লান্ত কিনা? বিড়াল দু-চোখ বোজে। আমি বাম হাত সামনে রাখি। বিড়াল সাবলীল ভঙ্গিতে উঠে আসে। হাঁটতে থাকে ঘাড়ের উপর নিয়ে। ফ্লাশব্যাকের রাস্তায় অতীতকে সামনে দাঁড় করিয়ে ভিডিও অন করে দেখতে গেলে কেবল বিস্ময় জাগে!
দু-জনেই ক্লান্ত। ভাবলাম কিছুটা জিরিয়ে নেই। বিড়ালকে জিজ্ঞাসা করি, বাড়ি কোথায়? বাবা-মা কোথায়? উত্তর নেই। বোবার মতো ফ্যালফ্যাল তাকায়। এই মুহূর্তে বিড়ালই আমার কাছের স্বজন হারানো স্বজন। শুনো, তোমাকে বারবার বিড়াল ডাকতে ভালো লাগে না। একটা নাম দিলে, কেমন হয়? বিড়াল মাথায় সহমত প্রকাশ করে। মিতু। মিতু আমার খুব কাছের একজনের নাম। আজ থেকে ‘মিতু’ বলে ডাকব।

আমাদের দু-জনের ভবিষ্যৎ এক। অজানা। অজানা জায়গায় একা যেতে ভয় থাকলেও আনন্দ নেই। ক্লান্ত মনে মিতুকে পেয়ে হালকা অনুভব করছি। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য সে ক্রমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো উৎসাহ উদ্দীপনা নেই। দ্রুত সুস্থ করা দরকার। ডাক্তার পাব কোথায়! চিকিৎসা দেব কীভাবে? উদ্বিগ্নতা বাড়তে থাকে কয়েকগুণ। বুঝতে পারি বেশি দুর্বল। মিতু ঘাড়ে বসে ঝিমোয়। ঝিমোতে ঝিমোতে নীচে পড়ে যায়। আহত হয়। বিড়ালের কষ্টটা আমার হৃদয়ে ঝংকার তোলে। অথচ আমি চাই না ভেতরে বাজতে থাকুক বেসুরের ভায়োলিন। এমন মোহ মুগ্ধ করা সুর কোথায় থেকে আসে! সুরের ঠিকানা নেই। সীমানাও নেই। নির্জন পথে মাঝে মাঝে অনেক শব্দ হয়। শব্দের উৎপত্তিও খুঁজে পাওয়া না গেলেও সুর পাওয়া যায়। পরিচিত সুর। আগে অনেকবার শুনেছি। কষ্টকে দূরে সরিয়েও কষ্ট। প্রাণের সন্ধান পেলেই কষ্টরা মিছিল যোগে আসে। বাড়তে থাকে বেদনার কাব্য। কাব্যে কাব্যে ফুলের মালা বানানো হয়। গাঁথা হয় খোপায়। দেখতেও সুন্দর লাগে। সবশেষে দুঃখই তার অস্তিত্ব। আসলে দুঃখের সূত্রপাত সেদিনই হয়েছে, যেদিন গাছের ডাল কেটে বাঁশি বানানো হয়েছিল। এমন সাংঘাতিক উপলব্ধিটা জালালউদ্দিন রুমির। কেন তাঁর এমন উপলব্ধি ছিল? বসে বসে সেটিই ভাবছি।

মিতু সংকটমুহূর্তে আছে। পরম মমত্বে হাতে তুলি দুঃখের ক্যানভাস। পানি হলে এ-যাত্রায় বেঁচে থাকবে সে। এদিক-সেদিক কোথাও আশার অস্তিত্ব নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা দরকার। মুখে থুতু ছিটিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর মিটমিট করে চোখের পাতা। বুঝতে পারি কিছুটা স্বাভাবিক। কিছুটা স্বস্তিবোধ করছি দম ফেরাতে। আবারও থুতু ছিটিয়ে দিলে মিতু এদিক-সেদিকে তাকায়। বুঝতে কষ্ট হল না, পানির অভাবে দুর্বলতা প্রকট আকার ধারণ করছে। চোখ দুটি আবারও বন্ধ হয়ে আসছে। কোনো ক্রমে চোখ মেলে আমার দিকে তাকায়। তাকানোতে মায়ার পাহাড় পুরোটা ধ্বসে পড়ে। জানি ছোটো বাচ্চারা দেবতাতুল্য। নিষ্পাপ পলকে শত্রুরাও বিলীন হয়। বন্ধু হয়ে প্রেমে জড়ায়। এখন আমার অবস্থা অনেকটা এমন। আবারও থুতু ছিটিয়ে দেই। মিতু নড়ছে না। অর্ধেক মৃত। অর্ধেক জীবিত! সম্ভবত বাঁচার মোহ ত্যাগ করে অনন্তের দিকে ছুটছে। মায়া হয়। চোখের পানি বাধ মানছে না কিছুতেই।

মিতু নামের মানুষটি চলে যাওয়ার পর বহুদিন নিঃসঙ্গ ছিলাম। নিঃসঙ্গতা জমিয়ে বিরহের পুড়েছি। এখন কষ্ট দিয়ে মালা বানিয়ে, অনুভবের গলায় ঝুলিয়ে— অজানা-অচেনায় হাঁটছি। কোথায় হতে মিতু এসে ভালোবাসায় টোকা দিয়ে গেল! অজান্তেই কিছুটা আবেগ দ্বারা আক্রান্ত আমি। অজান্তেই চোখের কোণে পানি নেমে আসে। চিকচিক করা জলে সূর্যের বিকিরণে— মিতুকে গর্তে শুইয়ে রাখি। মায়া ও মোহকেও মাটি চাপা দিয়ে নিরন্তর হাঁটতে শুরু করি উদ্দেশ্যহীন পথে।

হাঁটতে থাকা মানুষের গান, বলতে থাকা মানুষের কথা শোনার কেউ নেই এই নির্জনে। দেয়া-নেয়ার পৃথিবীতে কেবল ভোগ-বিলাসের কাতরতা দেখেছি। উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো গম্ভীর হতে চেয়ে, মানুষ কত অজানারে জানার ও দেখার সাধনায় মগ্ন। জীবন দেখার চেষ্টায় একটা জীবন অতিবাহিত হয়। তবু অদেখাই থাকে সব। জীবিতরা সত্তর ভাগ জল পান করেও ক্ষুধা মিটাতে পারে না। কীভাবে মিটবে মনের ক্ষুধা; কথা? ভাবনার সামনে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে দীর্ঘদেহী সাপ। ভয় পেয়ে কয়েক কদম পেছনে আসি। সাহস সঞ্চয় করে আবার উঁকি দিয়ে দেখি, বেশ ক্লান্ত সাপটি। শরীরের কোনো অংশই নড়ছে না। কখনো কখনো লেজ সামান্য নড়ে। ভয়কে তাচ্ছিল্য ঠেলে সামনে গিয়ে বসি, চোখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসঘাতক প্রিয়তমার ছায়া দেখতে পাই! নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না কিছুতেই। গালাগাল করতে করতে ভাবি, এটা সাপ নয়, রূপান্তর মাত্র। নিজেকে বদলিয়ে এসেছে! মানসিকভাবে যেন স্বস্তিতে না থাকি। সাপের ওপর ভর দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চাইছে! বিভ্রান্ত সময়ে ভুল পথে পরিচালনা করা হলে, হেরে গেছি।

মৃত্যু পথে সাপ। জানি আমার পক্ষে বাঁচানো সম্ভব না। সম্ভব হলে কিয়ামতের জেরায় বলতে পারতাম প্রভু, তোমার একটি প্রাণিকে বাঁচিয়েছি। হাঁটতে চাইলেও বিবেক আমার পথ আগলে ধরে রাখে। কেউ যেন পেছন থেকে টেনে ধরছে। ওইদিকে বিবেক আমাকে বারবার দংশন করছে। সাপের সামনে ফিরে বসি। মায়ার দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদী প্রেমিকার চোখ তাকিয়ে আছে আমার দাক্ষিণার দিকে। পানির সন্ধানে ফেরারি আমি। যদিও জানি মরুভূমিতে পানি পাওয়া দুষ্কর। চারপাশে পানি নেই। ছায়া নেই। মায়াঘর এখানে অচ্ছুত। মাথা উঁচু করে আমার চোখের দিকে তাকায়। চোখ ভিজে আসে। মুহূর্তেই অতীত অধ্যায় ভুলে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করছি। সাপের মাথায় হাত রেখে তাকালাম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। এখন ইশারা ইঙ্গিতও করে না। বলতে পারছে না কোন জনমানবহীন এলাকা হতে এখানে আগমন। মিতুর মতো সাপটিও অনন্তের পথে হামাগুড়ি দেয়!

শরীর আরও বেশি ক্লান্ত। কণ্ঠ ভাঙা। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তবুও প্রশ্ন করি, তুমি বিদায় নিচ্ছ? প্রতিউত্তর নেই। সে অভিমানে ঘুমিয়ে পড়ল! ঘুমানো দেহ নিথর। আর কোনোদিন ঘুম ভাঙবে না। পাশে চুপচাপ বসে থাকি। নিজেকে নিজেই অস্থির করে তুলছি। নাকি কেউ পরিকল্পনা করে আমাকে অস্থির করে চলেছে! সাপের সৎকার শেষে খারাপ মন নিয়ে বসে থাকি। তবুও যেন বিষাদের প্রহর যেন কাটছে না।

চার দিন হাঁটার পর বেশ ক্লান্ত। পথ ফুরোয় না। মানুষের ছুটি কত কিছু থেকে মিলে! স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের। অফিস থেকে কর্মকর্তা কর্মচারীর। প্রেম থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার। ফুলের বাগান থেকে মালির। গাছ থেকে ফুল ও ফলের। অথচ জীবন থেকে জীবনের ছুটি নেই! ছুটছি তো ছুটছি বিরামহীন। শেষ নেই। শুরু নেই। আজ এখানে। কাল ওখানে। এখন আর পারছি না। জানি, আত্মহত্যা মহাপাপ। জন্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যদিও এটা অনেক শক্তিশালী মানুষের কাজ। সেই শক্তি ও সাহস আমার তহবিলে আপাতত নেই। থাকলে সেই পথটা বেঁচে নিতাম।

ক-দিন ধরে চিড়া মুড়ি ছাড়া অন্য খাওয়া-দাওয়া নেই। পানিও নেই। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ক্লান্তি ছাড়া ক্ষুধাই আমাকে স্পর্শ করছে না।

একটি কুকুর জিহ্বা বের করে হাঁপায়। চিন্তায় পড়ে গেলাম, আবার নতুন কোন বিপদ খাম্বার মতো সামনে দাঁড়ায়। আবার কোনো সমস্যার সামনে হতে যাচ্ছি না তো! তারপরও ভয় কাটিয়ে অবচেতন মনে ইশারা করি, কাছে এসো। ডাক শুনে কুকুর কাছে আসে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। জানতে চাই, ওদের মতো তুমিও মরার জন্য এসেছ? কুকুরের গায়ে কুকুরের গন্ধ নেই। যে-গন্ধ বাতাসে ভাসছে তা আমার পূর্ব পরিচিত। পরিচিত শ্যাম্পুর গন্ধ। পারফিউমের ঘ্রাণ। বিভ্রান্ত গন্ধ ও ঘ্রাণে অতীতের পৃষ্ঠা আঁকি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম সংগ্রহের অহংকারের কথা মনে আসে। ম্লান মুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি, কেন আবার পুরোনো কথায় দোলা দিলে? পুরোনো দিন সামনে আনতে গেলে। কাঞ্চননগরের ছায়াবীথিপারের সুবাসফুলের স্কেল করা খাতা ছিড়ে বেরিয়ে এসেছি। আতর চন্দনের ঘ্রাণের কথা কেনো স্মরণ করালে? কথার অর্থ বুঝল কি বুঝল না, তা আমাকে বুঝতে না দিয়েই তিন পাকের মাথায় শুয়ে পড়ল কুকুরটি। কিছুটা অবাক হয়ে, গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। আমি তাকে চিনি। সে আদর পেয়ে চোখ বুজে। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জানতে চাই— তুমি কী করে জানো আমি এখানে? আর কীভাবে এখানে এসেছ? আমার পিছু ছেড়ে মুক্তি দিচ্ছ না কেন? জীবন থেকে মুক্তির জন্য সংসার বিচ্ছেদ করেছি। অথচ এখনও আমি বিচ্ছেদেও উলটা পাশে দাঁড়ানো!

কুকুরের মুখ থেকে লালা ঝরছে! সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসে একটি ডায়মন্ডের আংটি। হাতে নিয়ে দেখি আমার বিয়ের স্মারক। মা দিয়েছিলেন তাঁর পূত্রবধূকে। কুকুর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ওইদিকে ঝিলিক মারছে সূর্য। আলো অতিক্রম করে পৃথিবীর বাইরে নিঃশ্বাসও যেতে পারছে না। দূরে যেতেও পারছি না। মানুষের কাছ থেকে যতটা দূরে যায় মানুষ, মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ততই কাছে আসে। সব সময় এ-কথা সত্যি নয়। আমি কী মায়া পর্বের মায়াপীর! মুরিদরা যেতে পারছে না আমাকে ছেড়ে। ভক্তরা জড়ায় বিচ্ছেদের প্রেমে!

জীবন বাঁচাতে ও সাজাতে কতবার কত বাঁধনে আটকে গেছি। সুপার কম্পিউটারের ডাটায়ও ধরবে না সে হিসাব! এখনও বাঁধন ছিন্ন করে ছুটছি। অতীতের ঘরে আর ঘুরতে যাব না। কারণ, এ-পথ চলাটা নিদারুণ কষ্টের। কতবার কত সলতে আগুন জ্বালিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই আগুনে নিজেই জ্বলেছি দ্বিগুণ উত্তাপে। আত্মজিজ্ঞাসার জালে ভুলবালে ধরা পড়েছি সময়ের সংকীর্ণতায়। পরাধীন ভাবে। সংসার হচ্ছে, সুখ-দুঃখের ঠাকুর মহাশয়ের নাম। বিচ্ছেদ ও বিরহের জননী। আমি সংসার যাপন করব কীভাবে? এমন ব্যর্থতা বয়ে বেড়াতে হয় মাঝে মাঝে! পৃথিবীটা অবকাশ যাপনের জন্যও একদম অনুপযুক্ত। এটা লোভ, হিংসা-বিদ্বেষ ও বিরহ বিচ্ছেদের আখড়া। আংটি নিতে ইচ্ছে করে না। কবরের পাশে রেখে হাঁটতে থাকি।

কিছুতেই গাছের কাছাকাছি হতে পারছি না। এত দূরে কেনো গাছ? দূর কি কখনো কাছে আসবে না? নাকি বিভ্রমে বিভ্রান্তে আছি বসে? আসলে মানব জনমই বিভ্রান্ত? অকারণে বিভ্রান্ত। কারণ ছাড়া মায়া। কারণে-অকারণে অবহেলা। কারণে-অকারণে ভালোবাসাবাসি। কারণে-অকারণে বেঁচে থাকার ব্যর্থ চিন্তা। সংসার ও সন্তানের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলা। এই কী তবে মানব জনম! নাকি পৃথিবীর অন্যতম গোপন রহস্য।

গাছের কাছে পৌঁছোতে পারছি না, নাকি গাছ ধরা দিতে চাইছে না। দূরের ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য ভবিষ্যৎ প্রতারণা করছে চোখের সঙ্গে। বৃক্ষ সামনে এসে জড়িয়ে ধরবে না? ছায়া নেয়ার সুযোগ করে দিবে না? সূর্য নিয়মের জ্যামিতি মাপে পশ্চিমের খুপড়ি ঘরে ঢুকে পড়ছে। চাঁদ স্বমহিমায় জ্যোতি ঢালছে আর নৃত্য দেখছে তারকারাজির। এই মুহূর্তে ভীষণ ক্লান্ত শরীর। ফলে চাঁদের আলোয় ঘুমাতে গেলাম। আহা জীবন, জোছনামাখা রাতে চাঁদকে পরিপূর্ণ যুবতীর মতো লাগছে। জড়িয়ে ঘুমাতে পারলে মন্দ হত না। কিছু সময় ভুলে থাকা যেত বিচ্ছেদ ও বাতিল জীবন।

পথ শেষ হচ্ছে না। অথচ হাঁটছি আর হাঁটছি। অবসরেরও অবসর নেই। সামনে সাজানো গোরুর গাড়ি। আগের আমলের বরযাত্রীর জন্য যেমন সাজানো থাকে। খুশিতে রাতভর গোরুর গাড়িতে চরলাম। মধ্যরাতের তর্জমা না করেই গোরু দুটি ছাগলে পরিণত হল। ভয় পেয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিই। জানি বিভ্রান্ত হলেও মুক্তি নেই। বিষাদের ডালপালা জড়িয়ে ধরবে। অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সামনে আসে কাঙ্ক্ষিত গাছ। এমন মুহূর্তে কিছু উদভ্রান্ত ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না। গাছের ডালে প্রজাতির অসংখ্য পাখি। এদের আগে কখনো দেখা হয় না। তাই চিনতেও কষ্ট। গাছের অপর পাশে সাদা কাপড়ের ঝিলিক চোখে পড়ে। কেউ একজন নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেও পারছে না। শরীরের ঘ্রাণ আমার নাকে ভিড় করছে। চেনা গন্ধ। গত কয়েকদিনের কথা ভাবতে ভাবতে শরীরে জিম ধরে আসে।

গোরুর গাড়ি নেই! হঠাৎ উধাও! এটা কী করে সম্ভব? এ কোন আতংক! চারপাশ সুগন্ধি আর তবলার আওয়াজ। বিয়ে বাড়ির মতো লাগছে। আপাতত সব চিন্তা বাদ দিয়ে অচেনা ঘ্রাণে বুদ হতে থাকলাম। কিন্তু সেই ঘ্রাণ বেশিক্ষণ স্থির থাকেনি। মাথার উপরের গাছটি বৃদ্ধ মানুষের হাড় মটকানোর মতো কড়মড় কড়মড় করে ভেঙে পড়ছে। দূর্বল গঠনতন্ত্র। ভয়ে দূরে সরে দাঁড়ালাম। জানতে চাই, কে?

আমি তো তুমি!
মানে?
তোমার বাম পাঁজর।
এ-সব কী বলছ?
হ্যাঁ তোমার প্রতিবিম্ব।

এরপর মুখের পর্দা সরে গেলে এলোমেলো হতে থাকে পৃথিবী। চোখের সামনের চারপাশ কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার লাগছে। সমুদ্রের ঢেউয়ে আগুন জ্বালিয়ে ফিরে আসছে অতীত। পুরাতন সুর নিয়ে মরূদ্যানে ছুটতে থাকা মানুষের মতোই উলটো পথে দৌড়াতে থাকি। কিছুতেই সামনে যেতে পারছি না। উঁইপোকার মতো পৃথিবীর আগুনে আবার ঝাপিয়ে পড়ি!

Spread the love
By Editor Editor গল্প 0 Comments

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *