অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (পঞ্চম পর্ব)

পিউ কাহাঁ পিউ কাহাঁ পিউউউ কাহাঁ

নিজেকে আজকাল একটা ঘোটকীর মতো লাগে রোশন আরার। খাদের কিনার ঘেঁষে ঘাস খেতে খেতে পাহাড়ের চূড়া ছুঁতে চাওয়া ঘোটকী। পিঠে তার আট হাতপাওয়ালা রশিদা বেগম, করিমন বিবি আর করিমন বিবির তেত্রিশ হপ্তা বয়সী পেট। জমানো সব সঞ্চয় শেষ হয়ে আসছে তার। একইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করিমন বিবির জঠর। ওই পেটের দিকে তাকালেই দম বন্ধ হয়ে আসে রোশন আরার। এর আগে কোনো পোয়াতি মেয়েমানুষের এমন তুমুল পেট হতে কেউ দেখেনি। শুয়ে থাকলে মনে হয়, করিমন বিবি ওই পেটের নীচে চাপা পড়ে আছে। উঠে বসলে তাকে হাতিমির মতো লাগে। বাতাবি লেবুর মতো দুটো টসটসে বুক সারাদিন ঝুলে থাকে করিমন গাছে। বুকের নীচে তার টোপা পেটের মধ্যে সুলেইমান রেজা পাশ ফিরে শোয়, লাথ কষায়, অবুঝ নখে আঁচড়েও দেয়। দিন নেই রাত নেই করিমন বিবির পেটের কেউ নেই আর, শুধু আছে খিদে। ভাত, মাছ, ডিম, দুধ, সুখ, অসুখ, শোক, বিষাদ, কান্না— সব কিছু খেয়ে ফেলার পরেও সে-খিদে জেগে থাকে। ক্ষুধাতুর চোখে করিমন বিবি আর করিমন বিবির পেট ঘরের আসবাবপত্রের দিকে তাকায়। সম্ভব হলে সেগুলোও যেন খেয়ে ফেলত তারা দু-জন মিলে।

জাহান আরা আকাশের চান তারা হয়ে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে ফোন দেয়। আর সুখের কিসসা শোনায়। গত মাসে ভুটভুট বাইকে করে এসে এক হাঁড়ি মিষ্টি দিয়ে দায়িত্ব সেরেছে মেয়েজামাই। জামাই আড়াল হতেই, লোলুপ চোখে মিষ্টির হাঁড়ির দিকে চেয়ে থেকে করিমন বিবি শুনেছে কীভাবে সারারাত ধরে জাহান আরার বুকে পেটে কোমরে দাগ করে দেয় খোন্দকার হোসেন লুবো। গর্বের সাথে জাহান আরা সালোয়ারের প্যান্ট খুলে ঊরুর লম্বা আঁচড়ের দাগ দেখিয়ে দিয়েছে করিমন বিবিকে। আর করিমন বিবি জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। জ্বলন্ত করিমন জোনাকি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে জাহান আরা আর লুবোকে। পারেনি। ঝিকিঝিকি জ্বলতে জ্বলতে করিমন জোনাকি নিজের পেটে হাত রাখতেই পেটের ভিতর থেকে তার হাতে লাথ মেরেছে সুলেইমান রেজা। ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে করিমন তারা মনে মনে বলেছে, “বেইমান! সব হালায় বেইমান!”

সকাল সকাল অটোভাড়া বাঁচাতে পায়ে হেঁটে অফিসে চলেছে বড়োমেয়ে। খুব দ্রুত হাঁটলে দুশ্চিন্তারা হঠে গিয়ে রাস্তা করে দেয়, তাই যে প্রাণপনে হেঁটে চলেছে রাস্তা দিয়ে। ওড়নাবিহীন তার স্বাধীনচেতা বুকদুটো হাওয়ার ছোঁয়ায় হেসে-খেলে উঠছে। তেজী ঘোড়ার মতো টানটান হয়ে উঠেছে তার ভ্রূযুগল, যেন একটু টান পড়লেই তীক্ষ্ণ তিরের মতো ধেয়ে যাবে পৃথিবীর সমস্ত চোখের দিকে। একতাল গোবরকে পাশ কাটিয়েই রাস্তায় দুম করে থেমে যায় রোশন আরা। তার হৃদয় স্তব্ধ হয়ে যায়। তার পলক পড়ে না। তার দু-চোখ দেখে একটু দূর থেকে আসা একটা সাইকেলকে। সাইকেলের হাতল থেকে ঝুলছে এক দানবাকার ইলিশ মাছ। সাইকেলে সাদা পাঞ্জাবি কুর্তা পরা ফয়জুল রহমান হাসিমুখে এগিয়ে আসছে তারই দিকে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে বড়োমেয়ের। যেন পৃথিবীটা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে এমন— প্রমাদ গোনে সে। সাইকেল তার সামনে এসে পৌঁছোয়, কিন্তু থামে না। তাকে ঘিরে একপাক গোল করে ঘুরে ফয়জুল রহমান সাইকেলের ঘণ্টি বাজাতে থাকেন। এক পাক ঘোরা হলে রোশন আরাকে পিছে রেখে দূরে চলে যেতে থাকেন ফয়জুল রহমান। রোশন আরার পায়ের পাতা থেকে শিকড় গজিয়ে মাটির বুক ফুঁড়ে গহিনে চলে যায়। রোশন আরা স্থবির গাছ হয়ে রাস্তার মাঝখানে ছায়া অপাত্রে বিলোতে থাকে।

বড়োমেয়ে বেরিয়ে গেলে একতাল পেট নিয়ে নাজেহাল করিমন বিবি রশিদা বেগমের ঘরে আসে। অল্প অল্প করে সরিষার তেল নিয়ে ডলে দিতে থাকে রশিদা বেগমের আট হাত পায়। আরামে চক্ষু মুদে পড়ে আছেন রশিদা বেগম। মনে মনে, না চেয়েও, হাজার দোয়া পাড়ছেন করিমন বিবির তরে। হঠাৎ তাঁর বুক ধড়ফড় করে উঠল। চোখ খুলে ফেললেন রশিদা বেগম আর সাথে সাথে ফটকের কাছ থেকে সাইকেলের ঘণ্টি শোনা গেল। অধৈর্যভাবে সাইকেলের ঘণ্টিটা বেজেই চলেছে। তার সাথে জোরদার হচ্ছে টমির চিৎকার। করিমন বিবি হেঁকে উঠল, “কোন ঘাটের মরারে, আইবার সময়টুকুও তর সয় না! আর এই কুত্তাডারে আইজ আমি কতল করুম!” রশিদা বেগম বলে উঠলেন, “হা খোদা!” রশিদা বেগমের বিহ্বল মুখ দেখে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বাইরের ঘরে নিয়ে আসল করিমন বিবি। সাইকেলের ঘণ্টির নাভিশ্বাস উঠেছে যেন! পেটের উপর ওড়নাটা ফেলে ধীরে ধীরে দুয়ার দিয়ে মুখ বাড়াতেই করিমন বিবির চক্ষু কপালে ছাড়িয়ে গগনে উঠে গেল।

ফটকে সাইকেল হাতে দরাজ একটা হাসি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফয়জুল রহমান। সাইকেলের হাতল থেকে দুলছে বিশালাকৃতির এক চকচকে ইলিশ মাছ। ইলিশটার কাছে নাক নিয়ে গিয়ে ছোঁকছোঁক করছে বেয়াদব টমি। করিমন বিবিকে দেখেই হাসিমুখে ফয়জুল রহমান বলে উঠলেন,
“সুন্দরী রে সুন্দরী,
কোন মুখে তোর গুণ ধরি।
দিব্যি সোনা মুখ করে তুই
দুই বেলা যা খাস—
ঘাস-বিচালি-ঘাস।
ঘাস-বিচালি-ঘাস।…”

এইবার করিমন বিবির মনে পড়ে গেল, বাসর রাতে এই পদ্য শুনিয়েই শ্যালক শালিকাদের জয় করেছিলেন ফয়জুল রহমান, করিমন বিবিকেও জয় করতে তাঁর মুহূর্তই লেগেছিল। আজ বছর সাতাশ পর, পেটে হাত রেখে দুয়ার আগলে ফয়জুল রহমানের দিকে নিজেকে তাক করে দাঁড়াল করিমন সেনা। একটু নড়নচড়ন হলেই যেন সে ছুটে গিয়ে ফালাফালা করে দেবে ফয়জুল রহমানের সাদা কুর্তা পাঞ্জাবি পরা বুক। ফয়জুল রহমানকে পার করে তার নজর গিয়ে পড়ল দূর হতে বাসার পানে ছুটে আসা বড়োমেয়ের ওপর। করিমন ডংকা দ্রিম দ্রিম করে বাজতে বাজতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। ফয়জুল রহমান সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে উঠোনে ঢুকে এলেন। তাঁর দিকে কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যাচ্ছে করিমন সেনানি। বড়োমেয়ে প্রায় এসেই পড়েছে এমন সময় করিমন কামান এসে থামল ফয়জুল রহমানের ঠিক নাকের গোঁড়ায়।

ফয়জুল রহমান হাসিমুখে জিগালেন, “কেমন আছো করিমন জান?”

ফয়জুল রহমানের ফরসা গালে সপাটে একটা চড় কষাল করিমন সঙ্কাশ।

সেই আওয়াজে ফটকের কাছাকাছি এসে রোশন আরা আর টমি থমকে দাঁড়াল।

ঘরের ভিতরে রশিদা বেগম চমকে উঠলেন।

আঘাতে লাল হয়ে যাওয়া গাল নিয়ে কাঁচাপাকা চুলভরতি মাথা নীচু করে উঠোনে দাঁড়িয়ে রইলেন ফয়জুল রহমান।

রশিদা বেগম হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছেন। তাঁর পা ধরে বসে আছেন ফয়জুল রহমান। বিকৃত স্বরে রশিদা বেগম খাবি খেতে খেতে বলে উঠলেন, “আমি কইছিলাম, আমার ফইজা একদিন ফিরবোই। ফইজা মরে নাই!”

ফয়জুল রহমান দুই হাতে রশিদা বেগমের অসাড় অবশ পা আরও চেপে ধরেন।

রশিদা বেগম বলে চললেন, “কোনোখানেই না খুঁজি নাই আমরা তরে!
থানা-পুলিশ-হাসপাতাল-মর্গ
মসজিদ-মাজারে
গঞ্জে- বাজারে
স্টেশনে- অধিবেশনে
হারানোপ্রাপ্তি-টিভিবিজ্ঞপ্তি
সমাধিক্ষেত্র-সংবাদপত্র-সর্বত্র!

সারারাত জাইগা রইছি কখন ফটকে শুনুম তর সাইকেলের ঘণ্টি। আইজ সাতাইশ বৎসর বাদে শুনতে পাইলুম সেই আওয়াজ! আলহামদুলিল্লাহ!”

ফয়জুল রহমান বললেন, “আম্মি, আমি আইছি!”

রশিদা বেগম বললেন, “কই গেছিলি তুই আমাগো ছাইড়া! কেন গেছিলি! আর কেনই-বা আইলি ফিরে!”

ফয়জুল রহমান চুপ করে তাকিয়ে থাকেন রশিদা বেগমের দিকে, তারপর ধীরে ধীরে বলেন, “সেদিন কোরবানি ঈদে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, কুয়াডা শুকায় আইছে, অথচ বর্ষাকাল। বুকের ভিতরটা আমার খাঁ খাঁ করে উঠল। একটা কাগজ নিয়ে লিখলুম, চললাম। আমায় খুঁজো না। তারপর সাইকেল চালিয়ে যাইতে লাগলাম বাড়ি ছেড়ে দূরে বহুদূরে…”

গল্প শোনার মেজাজে রশিদা বেগম জিগাইলেন, “তারপর?”

“তারপর কয়েকদিন পর এক গঞ্জের কাছে আইসা টের পাইলাম আমি গৃহত্যাগী হইচি। আর পেটভরতি খিদা খচখচ খচখচ করতাছে। এক মাল্লারে কইয়া এক থাল ভাত খাইয়া তার নাওয়ে বাসা নিলাম। সেই নাও কইরা আমরা সাগর পাড়ি দিয়া মাছ ধরতে লাগলাম। এমন কইরা কয়েক মাস গেল।”

গল্প শোনার মেজাজে রশিদা বেগম জিগাইলেন, “তারপর?”

“তারপর একদিন আলাপ হইল এক জাহাজকাপ্তানের সহিত। তার জাহাজে খালাসির কাম পাইলাম। আর পাড়ি জমাইলাম সাত সমুদ্দুর তেরো নদীতে। হাজার বছর আমি পৃথিবীর পথ হাঁইটা ফিরা আইলাম আমার আম্মির কাছে, আম্মির প্রিয় মাছ সাইকেলে ঝুলাইয়া!”

“প্রিয় মাছ!”

উজ্জ্বল চোখে একরাশ আশা নিয়ে ফয়জুল রহমান বললেন, “হ! ইলিশ!”

রশিদা বেগম হঠাৎ করে ঝিম মেরে গেলেন। তাঁর চোখের মণি ছোটো হয়ে গেল নিমেষে। আফিমের ঘোরের মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে রশিদা বেগম নিজের মনেই বললেন, “আইলি? আইলি!— আইলিই যহন, যা, গোসল কইরা পাক হইয়া আয়। রোশনারা ভাত দিব।”

চিত্রঋণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

প্রথম পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম

দ্বিতীয় পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (দ্বিতীয় পর্ব)

তৃতীয় পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (তৃতীয় পর্ব)

চতুর্থ পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (চতুর্থ পর্ব)

ক্রমশ…

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (পঞ্চম পর্ব)

আমাদের নতুন বই