অরূপ চক্রবর্তীর প্রবন্ধ

বিস্মৃতির পথে নজরুলের গানের ভাণ্ডার

এক বিস্ময়প্রতিভা কাজী নজরুল। তাঁর সৃষ্টিতে এত বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে যার এক-একটা বিষয় নিয়েই অনেক কিছু আলোচনা বা লেখার অবকাশ রয়ে গেছে। আমি মুখ্যত তাঁর রচিত গান নিয়ে কিছু কথা আমার মতো করে উল্লেখ করছি।

কাজী নজরুলের রচিত কোনো কাব্যগ্রন্থ বা গান ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার প্রধান অন্তরায় হল কোথাও রচনাকাল উল্লিখিত নেই ফলে কোনটা আগে বা কোনটা পরে রচিত হয়েছে তা নিয়ে মনে একটা সংশয় দেখা দেয়।

তবে ওঁর সংগীত রচনার কাজের সূত্রপাত মাত্র ১২/১৩ বছর বয়সে লেটোর গানের মাধ্যমে। ঢোলক বাজনা ও গানে সুরারোপ করার ক্ষেত্রে পারদর্শিতার পরিচয়ও সেই সময় থেকেই পাওয়া যায়। এর পরেই কোনো অজ্ঞাত কারণে তিনি লেটোর দল ছেড়ে দেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত সেনাবিভাগে কাজ করেন। যুদ্ধ পরবর্তীকাল থেকেই কাজী নজরুলের নিয়মিতভাবে কাব্য ও সংগীত রচনা শুরু।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা এই দুই ঘটনা কবিমানসে যে-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার ফলস্বরূপ বেশ কিছু উদ্দীপনার গান কবি রচনা করেন। যার কয়েকটা এখানে উল্লেখ করছি—

১. দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে
২. জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াৎ খেলছো জুয়া
৩. মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
৪. কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল
৫. ওঠ রে চাষী, জগদ্বাসী, ধর কষে লাঙ্গল
৬. এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল

এই গানগুলি আপামর স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
আবার যুবসম্প্রদায়ের উদ্দেশে রচিত এই গানগুলি তাদের মনে দেশপ্রেম জাগাতে সক্ষম হয়েছিল।

১. আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল
২. ও ভাই মুক্তি সেবক দল
৩. জাগ রে তরুণ দল

আবার সেই বিদ্রোহী কবি দেশমাতৃকার বন্দনায় এই গানগুলিও লিখেছেন—

১. গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ওই
২. ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি
৩. এই ভারতে নাই যাহা তা ভূ-ভারতে নাই
৪. নমঃ নমঃ নমো বাংলাদেশ মম চির মনোরম

বিশ্বযুদ্ধের সময় ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে কর্মরত অবস্থায় কাজী নজরুল ফারসী ভাষা অধ্যয়ন শুরু করেন যার ফলশ্রুতি হল হাফিজের গজল ও রুবাইয়াতের অনুবাদ।

পারস্যের গজল ভাঙা সুর ও শায়রীর রস বাঙালি সংগীতরসিক মহল সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। বাংলা গানের মাঝে কিছু ফারসি শব্দের ব্যবহার একটা অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টি করেছিল যার দৃষ্টান্ত বাংলা গানে বিরল।
গজল ভাঙা কয়েকটি গান এখানে উল্লেখ করছি—

১. আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফ্যাঁস গয়ি
২. বিরহের গুলবাগে মোর ভুল করে আজ
৩. দিতে এলে ফুল হে প্রিয় কে আজি সমাধিতে মোর
৪. গুল বাগিচার বুলবুলি আমি রঙিন প্রেমের গাই গজল হায়

এছাড়াও লোকসংগীত, হাসির গান, বিদেশী সুর অবলম্বনে গান, নাটকের গান ইত্যাদি তাঁর লেখনি থেকে আমরা পেয়েছি।

প্রতিটি আঙ্গিকের গান একটা করে উল্লেখ করলাম।

১. পদ্মার ঢেউরে মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা (লোক সংগীত)
২. আমার খোকার মাসী শ্রী অমুকবালা দাসী (হাসির গান)
৩. রেশমী রুমালে কবরী বাঁধি (আরবী সুর)
৪. মাটির প্রতিমা পূজিস রে তোরা (বিজয়া নাটিকার গান)

কাজী নজরুল রাগ সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। বাল্যকালে নিজের কাকা-র কাছে সংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি খ্যাতনামা উস্তাদ কাদের বক্স ও জমিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে দীর্ঘদিন তালিম নিয়েছিলেন। যে-কারণে ওঁর অধিকাংশ গানই কোনো একটি রাগ অথবা দু-তিনটি ভিন্ন রাগের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা প্রভৃতি শাস্ত্রীয় বা উপশাস্ত্রীয় গানের প্রভাব এই ধরনের গানে পরিলক্ষিত হয়।

কাজী নজরুলের এক অসামান্য কীর্তি তাঁর নিজের সৃষ্টি করা কিছু রাগ, যেগুলি ‘নবরাগ’ নামে খ্যাত। কবি যাদের সম্বন্ধে বলেছেন “আমার স্বপ্নে পাওয়া রাগ”। রাগগুলি যথাক্রমে ১. দোলনচাঁপা ২. দেবযানী ৩. মীনাক্ষী ৪. অরুনরঞ্জনী ৫. রূপমঞ্জরী ৬. শঙ্করী ৭. যোগিনী ৮. শিব সরস্বতী ৯. নির্ঝরিণী ১০. বেণুকা ১১. উদাসী ভৈরব ১২. বনকুন্তলা ১৩. সন্ধ্যমালতী ১৪. রক্তহংস সারং ১৫. শিবানী ভৈরবী ১৬. অরুণ ভৈরব ১৬. আশা ভৈরবী ১৭. রুদ্র ভৈরব।

এই রাগগুলি ছাড়াও কবি কিছু বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রচলিত রাগ পুনরুদ্ধার করে সেই রাগে কিছু গান রচনা করেন। এই গানগুলিকে তিনি “হারামণি” পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যেমন—
১. আমি পথমঞ্জরী ফুটেছি আঁধার রাতে (পটমঞ্জরী)
২. দূর বেনুকুঞ্জে (নন্দ)
৩. পরদেশী মেঘ যাও রে ফিরে (বিহাগড়া)

শুধুমাত্র রাগসৃষ্টিতে তিনি ব্যাপৃত ছিলেন না। কিছু তাল/ছন্দও তাঁর সৃষ্টিকে আরও মহিমান্বিত করেছে। যেমন— প্রিয়া ছন্দ, মনিমালা ছন্দ, মঞ্জুভাসিনী ছন্দ, স্বাগতা ছন্দ, মন্দাকিনী ছন্দ, নবনন্দন ছন্দ।

চলমান জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাত, স্ত্রী প্রমীলা দেবীর অসুস্থতা, জ্যেষ্ঠ পুত্র বুলবুলের মৃত্যু কবিকে বিশেষভাবে বিচলিত করে এবং ঘটনাচক্রে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে লালগোলা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গৃহীযোগী বরদাচরণের সান্নিধ্যলাভ কবির জীবন এক নতুন অধ্যালয়ের সূচনা করে। মূলত তিরিশের দশক থেকে বেয়াল্লিশ অবধি এই গানগুলি সৃষ্টি হয়েছিল। নজরুল ছিলেন সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ধ্যান, মননশীলতা দিয়ে তিনি তা উপলব্ধি করেছিলেন। ভক্তমনের আকুতি, গভীরতা ও সৌকর্যগুণে রচিত এই গানগুলি বাংলা ভক্তিগীতির এক অন্যতম উদাহরণ। সাধক রামপ্রসাদের পরবর্তীকালে ভাবরসে সমৃদ্ধ এমন গান আজ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়নি। নিরাকার (ব্রহ্ম সংগীত), বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলী-র অন্তর্গত সব ধরনের গানই তিনি রচনা করেছেন। এ-ছাড়া ইসলামী গানেও (ইসলাম ধর্মের ক্রিয়াকলাপ, বিভিন্ন পালাপার্বন ও নবীর গান) নিজের অনুভূতিকে গভীর সত্যে উদ্দীপিত করে সহজ ভাষায় তিনি প্রকাশ করেছেন।

কিছু গানের প্রথম কলি এখানে দেওয়া হল—

১. আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে জপি আমি শ্যামের নাম
২. শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে
৩. পরমাত্মা নহ তুমি তুমি পরমাত্মীয় মোর
৪. জগতের নাথ করো পার হে
৫. জয় ব্রহ্মবিদ্যা শিবসরস্বতী
৬. ওমা চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়
৭. তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম
৮. ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
৯. আমি আল্লা নামের বীজ বুনেছি
১০. এ কোন মধুর শরাব দিলে আল আরাবী সাকী

এই ছিল সংক্ষিপ্ত পরিসরে কবিসৃষ্ট বিভিন্ন ধারার গান নিয়ে পর্যালোচনা।

কবি সাহিত্যসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেও সংগীত রচনা ও সুরারোপের ক্ষেত্রে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন। কবির নিজের ভাষায়: “কবিতার জগতে আমি কিছু দিতে পেরেছি কিনা জানিনা। কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস গানের জগতে আমি কিছু দিয়ে যেতে পেরেছি”।
এই প্রসঙ্গে একটা কথাই ভাবায়, যে গান এত বিষয়বৈচিত্রে ও সুরের মাধুর্যে সম্পন্ন সেই গানের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতা ও শিক্ষার্থীরা বিমুখ কেন?

এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার কিছু নিজস্ব ভাবনা এখানে আমি তুলে ধরছি।

১. কাজী নজরুলের গানের সঠিকভাবে কোনো documentation হয়নি। অন্যের রচিত ও সুরারোপিত গানকেও নজরুলগীতি বলে প্রচার করা হয়েছে।

২. এক গানের দুই বা ততোধিক সুর শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করেছে।

৩. নজরুলগীতি বিভিন্ন আঙ্গিকে রচিত হলেও এটি খেয়াল, রাগপ্রধান বা ঠুমরি নয়। এটি মূলত কাব্যগীতি। কবি নিজে তাঁর গানে শিল্পীর স্বকীয়তা ও শিল্পগুন বজায় রেখে পরিবেশনা স্বীকার করে নিলেও স্বাধীনতার নামে দীর্ঘায়িত আলাপ, বিস্তার, তান সাথে তবলার তাণ্ডবকে প্রশ্রয় দেননি।

কিন্তু অধিকাংশ শিল্পী তার পাণ্ডিত্য প্রকাশ করতে গিয়ে গানকে এমন রূপদান করেছেন যে সাধারণ মানুষ নজরুলগীতির বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

৪. সঠিক স্বরলিপির অভাবও এ-ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫. বর্তমানে নজরুলের গানের সেই পর্যায়ের গুরুর সংখ্যা খুব কম, যিনি দাবি করতে পারেন যে তাঁর শেখানো নজরুলগীতি সঠিক।

৬. নজরুলের রচিত প্রকৃত গানের সংখ্যা ৩০০০ না ৩৫০০, এই নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।

পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই, সঠিক কণ্ঠচর্চা না করে নজরুলের গানকে কণ্ঠে ধারণ সম্ভব নয়। এ-ক্ষেত্রে রাগসংগীতের চর্চা ও নজরুলের গানের গায়কী আয়ত্ত করতে হবে। এই ধরনের গানের ক্ষেত্রে ইউটিউব কখনো শিক্ষকের ভূমিকা নিতে পারে না। শিক্ষাবিমুখতা ও অতি সহজেই পারফর্মার হতে চাওয়া নবীন প্রজন্মের কাছে তাই নজরুলের গান অধরা রয়ে গেছে এবং একটা আশঙ্কা মনে জাগে যে অনাগত দিনে কাজী নজরুলের এই বিশাল ভাণ্ডার না অবলুপ্তির পথে চলে যায়! একটাই আশার কথা, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ তাঁদের জাতীয় কবির এই ভাণ্ডারকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।

গানের বুলবুলি যেন নীরব হয়ে নার্গিসবনে না থাকেন, ঝরা বন গোলাপের বিলাপ যেন তাঁকে আর না শুনতে হয় সেই বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

আশা রাখব অচিরেই নজরুলের গান স্বমহিমায় ফিরে আসবে এবং সবার হৃদয়ে সেই হারিয়ে যাওয়া গানের ধারা আবার তার নিজের স্হান ফিরে পাবে।

Spread the love

4 Comments

  • খুব সমৃদ্ধ প্রবন্ধ। অনেক অজানা তথ্য জানলাম। গানের জগতের এরকম আরও অনেক অজানা তথ্য ভবিষ্যতে তোমার কলমে পাব আশা করি

    জা তি স্ম র,
    • অনেক সমৃদ্ধ হলাম অরূপদা.. প্রণাম আর ভালোবাসা জেনো.. আরো আরো অনেক কিছু জানবো তোমার থেকে.. ❤️

      Suman Ruj,
  • বিদ্রোহী কবির আরো বিভিন্ন রকম তথ্য নিয়ে আরো কিছু লেখা হোক। সমৃদ্ধ হোলাম।

    সৈকত,
  • খুব সাবলীল লেখা , অনেক অজানা তথ্য খুঁজে পেলাম । এককথায় সমৃদ্ধ হলাম । ভবিষ্যৎে এরকম আরো লেখা পাওয়ার আশায় থাকবো । ভালো লেখো , ভালো গাও , ভালোবাসা জানাই ।

    Pranab Bandyopadhyay,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *