Categories
প্রবন্ধ

কৌশিক জোয়ারদারের প্রবন্ধ

দার্শনিক মনন অথবা ভাবা প্র্যাকটিস

এই যে একটা কথা শুনেছি— সকলেরই নাকি একটা দর্শন আছে এবং সে-অর্থে সকলেই দার্শনিক, এর চেয়ে বাজে কথা আর কিছু হয় না। জীবনের যে-কোনো একটা উদ্দেশ্য থাকলেই সেটাকে জীবন-দর্শন বলে না। সংকীর্ণ অর্থে “দর্শন” কথাটির এই ব্যবহারের সাথে আমরা যেন দর্শন নামক শ্রমসাধ্য মানসিক ক্রিয়াটিকে গুলিয়ে না ফেলি। চিন্তাবিদ বিনয় সরকার (১৮৮৭—১৯৪৯) তো সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত বা রাধাকৃষ্ণনকেও ‘দার্শনিক’ আখ্যা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। তাঁর মতে, ওঁরা হলেন দর্শনের ইতিহাসের লেখক। সেটা কোনো অপরাধ নয়, যেমন অপরাধ নয় বিজ্ঞানী বা সাহিত্যিক না হওয়া। কেবল স্মরণে রাখা দরকার, প্রতিটি কাজেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, পদ্ধতি এবং দায়বদ্ধতা রয়েছে। দার্শনিক তবে কে? বিনয় বলছেন— পরকীয় মতের আলোচনা দর্শন নয়, দর্শন হল পরকীয় মতের সমালোচনার উপর প্রতিষ্ঠিত নিজের মত। যে-লোক নিজের কথা বলে না, সে দার্শনিক নয়। বিনয়ের স্বভাবসিদ্ধ ভাষায়, “নিজের মুড়োর ঘি” ঢালতে না পারলে দার্শনিক হওয়া যায় না। আমি এখানে একটা কথা যোগ করতে চাই, নিজের কথা বলা মানেই নতুন কথা বলা নয়। নতুন হলে তো ভালোই, কিন্তু কথাটাকে নিজস্ব বোধ থেকে উৎসারিত হতে হবে।

সমালোচনা বিদ্যা, দর্শন বলতে যেটাকে বোঝায়, কেমন সেটা? এ সম্পর্কে আরেক বাঙালি চিন্তাবিদ রাসবিহারি দাস (১৮৮৬—১৯৪৫)-এর বক্তব্য আমার মনঃপূত। যতদূর সম্ভব জটিলতা বর্জন করে বলার চেষ্টা করি। পাঠক ভাবুন এবং বুঝুন, এ আমার আন্তরিক চাহিদা। দর্শন একধরনের জ্ঞান, অন্য অনেক বিদ্যার মতোই। দার্শনিক প্রশ্ন করবেন (প্রশ্ন করাটা প্রায় তাঁর মুদ্রাদোষ), জ্ঞান কী? অনেকেই বলেন, জ্ঞানের সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সে-কথা না মেনেও বলতে পারি, জ্ঞানের একটি আবশ্যিক উপাদান সংজ্ঞাতীত। এবং সেটি হল চৈতন্য (আহা, “চৈতন্য” শব্দটি কী সুন্দর!)। চৈতন্য যে কি, তা ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো দুঃসাধ্য। চৈতন্য বা চেতনা বিষয়ে একটি ব্যাপার আবার নিশ্চিত করে বলা যায়, চেতনা আবশ্যিকভাবে বিষয়াশ্রিত। অর্থাৎ, চেতনা সবসময়েই কোনো-না-কোনো বিষয়ের চেতনা। টেবিল, কবিতা, বৃত্ত, ধারণা, ড্রাকুলা, যা খুশি হতে পারে, কিন্তু চেতনা নিরালম্ব নয়। বিষয়াশ্রিত চৈতন্যের তিন অবস্থা: অনুভব, ইচ্ছা এবং আবেগ। প্রতিটির বিষয় আলাদাও হতে পারে, আবার একও হতে পারে। ধরুন সাম্যবাদ। আপনি চান সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হোক, এ আপনার ইচ্ছে। আপনি ভাবতে ভালোবাসেন সব মানুষ খেতে পাক, অসম্মান যেন আহত না করে কাউকে, এবং ঘৃণা করেন বৈষম্যকামীদের— সাম্যবাদকে ঘিরে এ আপনার আবেগ। আর আপনি যখন জানতে চান সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি, তখন তা আপনার অনুভবের বিষয়। জ্ঞান একরকমের অনুভব বা অনুধাবন। এ বিষয়ে বলছি আরও কিছু।

জ্ঞান চৈতন্যের এমন এক অবস্থা যেখানে বস্তু চৈতন্য-নিরপেক্ষ হিসেবে জ্ঞাত হয় (ইচ্ছা ও আবেগের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না)। অর্থাৎ জ্ঞানের ক্ষেত্রে জ্ঞানের বিষয়টি যেন চেতনার সাথে সম্পর্কহীন। এই চেতনা-নিরপেক্ষ বস্তুর দুটি দিক: অস্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্য। জ্ঞান হচ্ছে বৈশিষ্ট্যযুক্ত অস্তিত্বের অনুধাবন/অনুভব। যেমন ধরুন, “কলমটি নীল”। আমরা জানলুম কলমের অস্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্য (নীল)। এবার জ্ঞাত বৈশিষ্ট্য যদি কলমে প্রকৃতই থাকে, তাহলে জ্ঞানটি সত্য, অন্যথায় মিথ্যা। এরপরে তো অনেক বিতর্ক, তার মধ্যে এখন আর যাচ্ছি না। দার্শনিকেরা মনে করেন, জ্ঞানকে বিশ্বাসের থেকে আলাদা করে বুঝতে হবে। যেমন, আপনি বিশ্বাস করেন ‘মোহনবাগান আজ জিতবে’। এখন বিশ্বাস সত্য বা মিথ্যা হতে পারে, নিশ্চিত করে তো কিছু বলা যাবে না। অন্য দিকে, দার্শনিকেরা অনেকেই বলেন, জ্ঞান মাত্রই সত্য। রাসবিহারি মনে করেন, জ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য করা খুবই মুস্কিল, এবং জ্ঞানও সত্য বা মিথ্যা, দুই-ই হতে পারে। তাঁর মতে, জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের মনোগত তফাৎ করার উপায় নেই। বস্তুত আমিও মনে করি, জ্ঞান সত্য কিনা, সেটা জানা যায় পরবর্তী জ্ঞানক্রিয়ায়। ফলে, জ্ঞানও বিশ্বাসের মতোই ভ্রান্তিযোগ্য।

দর্শন যে একরকমের জ্ঞান, এবং জ্ঞান বলতে কী বুঝব— সেই আলোচনা করা গেল। কিন্তু জ্ঞান মাত্রই তো আর দর্শন নয়। ইতিহাস বা বিজ্ঞানও জ্ঞানের কারবারি। দার্শনিক জ্ঞান কোথায় আলাদা হয়ে যাচ্ছে অন্য বিদ্যাগুলির থেকে, সেইটে এবার জানা দরকার। আমরা বিজ্ঞানের সঙ্গে পার্থক্য করে দার্শনিক জ্ঞানের স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করবো। তার আগে একটা কথা বলি— জ্ঞান প্রকাশ পায় বচনের মধ্যে দিয়ে। বচন হল সেই বাক্য, যার সত্য বা মিথ্যা হবার যোগ্যতা আছে। ধরুন আপনি বললেন, “আহা ছবিটি কী সুন্দর!” এই বাক্যটির সত্য-মূল্য নেই। কিন্তু যদি বলি “টেবিলটার রং বাদামি”, তাহলে বাক্যটির সত্যি বা মিথ্যে হবার যোগ্যতা আছে। টেবিলটা সাদা রঙের হলে আমি মিথ্যা বলেছিলাম। এখন বিজ্ঞানের প্রতিপাদ্যগুলি (অর্থাৎ জ্ঞান প্রকাশক বাক্যগুলি) এই ধরনের “ক হয় খ” জাতীয় বাক্য বা বচনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মনে রাখতে হবে, এই জাতীয় জ্ঞানে বিষয়কে (যেমন, টেবিলকে) মন বা চৈতন্য-নিরপেক্ষ হিসেবে জানা হয়। অন্তত, এটুকু বলতে পারি, বিজ্ঞানের চেষ্টাটাই হচ্ছে বস্তু থেকে জ্ঞাতার মনোভঙ্গিকে বাদ দেওয়ার। কিন্তু দার্শনিক জ্ঞান প্রকাশ পায় “আমি জানি ক হয় খ” এই জাতীয় বাক্যে। এখানে “ক হয় খ” এই তথ্যটিকে “আমি জানি”, অর্থাৎ জ্ঞাতার সঙ্গে যুক্ত করেই বিচার করা হচ্ছে। প্রথমটি তথ্যের জ্ঞান, দ্বিতীয়টি তথ্যটি যে-জ্ঞাত, সেই জ্ঞান। বলা যেতে পারে, দার্শনিক জ্ঞান হল জ্ঞানের জ্ঞান। দর্শন প্রাথমিক জ্ঞানকেই তার বিষয় করে। রাসবিহারি দার্শনিক জ্ঞানকে বলবেন আত্মসচেতন জ্ঞান। অন্যভাবে, দার্শনিক জ্ঞান সবসময়েই জ্ঞাতা-সাপেক্ষ। ব্যর্থতা, ভ্রম, সংশয়, এবং প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান (অর্থাৎ যা নিছক তথ্য) দার্শনিক জ্ঞানে উন্নীত হয়। পতাকার রং লাল। এইটি একটি তথ্য, সত্যি বা মিথ্যে হতে পারে। এবার আপনার সংশয়, আপনার প্রশ্ন: কীভাবে জানলাম পতাকার রং লাল? আমাদের জ্ঞান কি শুধু ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষেই হয়? আমরা সকলেই কি একই রং প্রত্যক্ষ করছি, নাকি একই নামে ডাকছি কেবল? রং, আকার, গন্ধ এইসব গুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করে কে? গুণাতীত কিছু আছে কি? দেখুন, একটি তথ্যকে কেমন আপনি আপনার জানার পদ্ধতির সাথে যুক্ত করে জানতে চাইছেন। এইভাবে জানাকে বলে সোপপত্তিক মনন, ইংরিজিতে যাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল রিফ্লেকশন। ফরাসি দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্র মনে করেন সব জ্ঞানই আত্মসচেতন, কিন্তু সোপপত্তিক মননই যে দার্শনিক জ্ঞানকে অন্য জ্ঞানের থেকে পৃথক করে, সেটা মেনেছেন।

আমরা যখন শ্রেণিকক্ষে দর্শন পড়াই, তখন আসলে সোপপত্তিক মননের কিছু উদাহরণ ব্যাখ্যা করি। দার্শনিকের মতটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে তিনি ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছোলেন। বিচারের নামই দর্শন। নিজেরা বিচারে প্রবৃত্ত হলেই আমরা ইতিহাসের প্রবক্তা থেকে দার্শনিক হয়ে উঠি। পদ্ধতি হিসেবে দর্শন-শাস্ত্রে একাধিক পথের উল্লেখ রয়েছে: অভিজ্ঞতাবাদ, বুদ্ধিবাদ, বিচারবাদ, ভাষা-বিশ্লেষণ, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি, প্রতিভাসবিদ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। এতসব পথের মধ্যে একটিই সাধারণ বৈশিষ্ট্য— সোপপত্তিক মনন, যা কিনা এক বিশেষ ধরনের চিন্তা। এই বিশেষ মননের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেক কথা বলতে পারি, কিন্তু তার খুব প্রয়োজন আছে কি? রাসবিহারি দাসের বক্তব্য, যে-ব্যক্তি সজ্ঞানে জিজ্ঞাসা করবেন দর্শনের কী প্রয়োজন, তার পক্ষে দর্শন সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন। কথাটা ভেবে দেখবেন। আমি শুধু বলি— যতোই মনে হোক না কেন যে সমাজটা চলছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ইত্যাদির ঠেলায়, আসলে কিন্তু তাকে চালাচ্ছে চিন্তা এবং চিন্তা-প্রসূত কিছু ধারণা। নৈতিকতা, গণতন্ত্র, সভ্যতা, প্রগতি— এই সবই সোপপত্তিক মনন প্রসূত ধারণা। মানুষ নিজেদের অজান্তেই এই ধারণাগুলিকে ব্যবহার করে, অথবা এই ধারণাগুলিই ব্যবহার করে মানুষকে। প্রযুক্তি মানুষকে ব্যস্ত রাখে, চিন্তা রাখে জাগ্রত। মিলান কুন্দেরার উপন্যাসে পড়েছিলাম, ব্যস্ততা বা গতির সাথে চিন্তার ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। সে যাই হোক, বেশিরভাগ সময়েই মানুষ অপরের চিন্তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় (হয়তো হতেও চায়)। মনে রাখবেন, আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল আপনার চিন্তাকেই কেড়ে নেওয়া। আপনি ভালোই জানেন, কারা সেটা চায়।

3 replies on “কৌশিক জোয়ারদারের প্রবন্ধ”

এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে খুবই সহজভাবে বোঝানোর জন্য স্যারকে ধন্যবাদ। ভালো লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *