লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

মেমেR সাত ১৭

পুরো পৃথিবীর ৭.৭ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন (২০১৯) মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তারা ‘মিম’ বা ‘মেমে’ শব্দটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। অনেকে নাম না শুনলেও নিজের অজান্তে মিম শেয়ার করে বসেন বা হোয়াটস্‌অ্যাপে মেমে ফরওয়ার্ড করেন। আলোচ্য নিবন্ধে এই ‘মেমে’-এর এই বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করব। ইংরেজি Meme-কে বাংলায় মিম বলা হয়। তাই এই নিবন্ধে মিম এবং মেমে দুটি শব্দই আমরা ব্যবহার করব।

মেমে কী?

প্রথমে আসা যাক মিম বা ‘Meme’ শব্দটি প্রসঙ্গে। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক রিচার্ড ডাউকিন্স ‘The Selfish Gene’ গ্রন্থে একটি নতুন শব্দ ‘Meme’ ব্যবহার করেছিলেন। এই শব্দের দ্বারা তিনি ‘a unit of cultural transmission’-কে বুঝিয়েছেন। ‘Meme’ শব্দটিকে তিনি গ্রহণ করার পর তিনি গ্রিক শব্দ ‘Mimeme’ শব্দটিকে তিনি অস্বীকার করলেন। তিনি লিখলেন, “‘Mimeme’ comes from a suitable Greek root, but I want a monosyllable that sounds a bit like ‘gene.’ I hope my classicist friends will forgive me if I abbreviate ‘mimeme’ to ‘meme.’” (Merriam Webster Online Dictionary) অর্থাৎ রিচার্ড ডাউকিন্সের কথানুসারে ‘Meme’ শব্দের অর্থ হল, সাংস্কৃতিক সংক্রমণের একটি একক বা ইউনিট।

মেরিয়াম ওয়েবস্টারের অনলাইন ডিক্সনারিতে ‘Meme’-এর যে-সংজ্ঞা দেওয়া আছে সেটি হল— “an idea, behavior, style, or usage that spreads from person to person within a culture.” রিচার্ড ডাউকিন্স এবং মেরিয়ম ওয়েবস্টার অনুসারে যা আমরা পেলাম সেটি হল ‘Meme’ শব্দটির অর্থ। যে-শব্দের অর্থের সঙ্গে বর্তমানে ইন্টারনেটে যে-মেমে বা মিম শেয়ার করা হয় তার অর্থ একই। এই কারণে শব্দটির ইতিহাস আমাদের জানা প্রয়োজন ছিল। ওয়েবোপিডিয়াতে ভ্যাঙ্গি বেল ‘ইন্টারনেট মেমে’-এর যে-সংজ্ঞা দিয়েছেন সেটি হল— “An Internet meme is a concept or idea that spreads “virally” from one person to another via the Internet. An Internet meme could be anything from an image to an email or video file; however, the most common meme is an image of a person or animal with a funny or witty caption. The proliferation of social media has led to Internet memes spreading very quickly and reaching more people.

Many Internet memes use humor and appeal largely to the adolescent and post-adolescent demographic: this demographic is much more likely to discover Internet memes, understand the humor behind them and be willing to forward it on to friends.” (Webopedia)

সুতরাং, মেমে হল এমন একটি আইডিয়া যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে একে-অপরের কাছে পৌঁছে যায়। মেমে ছবি থেকে ভিডিয়ো বা ইমেলের মাধ্যমে ইউজারদের কাছে এসে পৌঁছাতে পারে। তবে ছবির সাহায্যে মেমে বেশি জনপ্রিয়। ‘মেমে’-তে ব্যঙ্গাত্মক কৌতুকরস সৃষ্টি করা হয়। তবে কিছু কিছু মেমেতে এমন কিছু ছবি ব্যবহার করে ক্যাপশন দেওয়া হয় তাতে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মেলে। মেমে সোশ্যাল মিডিয়াতে দ্রুত ভাইরাল হয়ে একে-অপরের কাছে পৌঁছে যায় এবং আমরা বন্ধুদের হাস্যরসের খোরাক জোগাতে হোয়াটস্‌অ্যাপে তা শেয়ার করে থাকি।

এবার আমরা দেখব একটি আইডিয়া মেমেতে কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে ভাইরাল বা সংক্রামিত হচ্ছে। যেমন ২০১৯ সালে সবচেয়ে যে-মেমেটি জনপ্রিয় হয়েছিল সেটি ছিল কানাডার একটি বিড়ালের। যার নাম ছিল স্মাজ (Smudge)। বেশিরভাগ মেমেতে আমরা স্মাজকে দেখি ডানদিকে রাগান্বিতভাবে সামনে কিছু স্যালাড বা সবজি জাতীয় কিছু নিয়ে আর বাঁ-দিকে দেখি একটি সোনালি চুলের মহিলা কেঁদে কিছু ইঙ্গিত করছে আর পাশে একটি মহিলা সোনালি চুলের মহিলাকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। নীচে ছবি দেওয়া হল—

চিত্র: ১

পরবর্তীতে দেখা যায় এই মেমেটির সঙ্গে নানা রকমের কথা যোগ করে ইন্টারনেটে টুইটার, ফেসবুক ও হোয়াটস্‌অ্যাপে ভাইরাল হয়েছে। যেমন একই আইডিয়াকে ঘিরে নীচের মেমেটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে কিছু শব্দ যোগ করা হয়েছে—

চিত্র: ২

এই মেমেটির অনেকরকম ভার্সন আমরা ইন্টারনেটে পেয়ে যাব। শুধু ভার্সন নয় বিভিন্ন ভাষায় এই মেমেটিকে এখনও পর্যন্ত শেয়ার করা হচ্ছে। যেমন একই ছবি ব্যবহার করে বাংলায় মেমে তৈরি করা হয়েছে—

চিত্র: ৩

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে একটি আইডিয়া যা কিনা প্রথমে শুধু ছবি ছিল, পরে সেটিতে ভাষা যোগ হল এবং তা বিভিন্ন ভাষায় ভাইরাল হয়ে কানাডা থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছাল। এটিই হল মেমে। তবে এটি শুধু আন্তর্জাতিক ভাইরাল নয় স্থানীয় স্তরেও ভাইরাল হতে পারে। যেমন আমরা এই বছর জোমাটোর কর্মচারী সোনু-র হাসি মুখ ভাইরাল হতে দেখেছি। সোনুর সেই হস্যোজ্বল মুখকে ব্যবহার করে ‘মেমে লাভার’-রা (যারা মেমে ভালোবাসে বা তৈরি করে) নানারকম মেমে তৈরি করেছে। নীচে কয়েকটি দেওয়া হল—

চিত্র: ৪

মেমে লাভারদের কাছে কোনো আইডিয়া এসে গেলেই তারা সেটিকে ঘিরে মেমে তৈরি করে ভাইরাল করতে শুরু করে। তারা রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সেলিব্রেটিদেরও ছাড়ে না। যেমন বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভটের ‘উড়তা পাঞ্জাব’ সিনেমার একটি দৃশ্য নিয়ে মেমে লাভাররা অনেকরকম মেমে বানিয়েছে—

এতক্ষণ মেমে সম্পর্কে যে-আলোচনা হল তাতে প্রশ্ন উঠতেই পারে মেমে কি কেবল ছবি আর শব্দের মেলবন্ধনে তৈরি হয়? এর উত্তর হল, না। মেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী মেমে ছবি ছাড়াও ভিডিয়ো ফর্মাটেও তৈরি হয়। যেমন কোভিড ১৯ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর ‘কফিন ড্যান্সে’-র ভিডিয়ো ভাইরাল হতে থাকে। মেমেররা (যারা মেমে তৈরি করে) ‘কফিন ড্যান্সে’-এর ভিডিয়োটিকে নানান রকমের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে ভাইরাল করতে শুরু করে। একটি আইডিয়া কীভাবে নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে ভাইরাল করা হয় এই ‘কফিন ড্যান্স’-টি তার একটি বড়ো উদাহরণ।

উপরের এটা হল আসল ছবি। এই ছবিটি আসলে একটি ভিডিয়ো থেকে নেওয়া হয়েছে যেটি ২০১৫ সালে ইউটিউবে ট্রাভেলিন সিস্টার নামে এক ইউজার আপলোড করেছিল। পরে ২০১৭ সালে বিবিসি একটি ডকুমেন্টারিতে একই ভিডিয়ো ব্যবহার করে। এই ৫ সেকেন্ডের ভিডিয়োটি আসলে আফ্রিকার ঘানার মৃত্যু পরবর্তী অন্তিমযাত্রার একটি দৃশ্য। যেখানে মৃত ব্যক্তিকে সুর ও নৃত্য সহযোগে বিদায় দেওয়া হয়। ২০১৭-এর পর ২০১৯-এ কিছু টিকটক ব্যবহারকারীরা আবার ভিডিয়োটিকে নতুনভাবে পোস্ট করতে শুরু করে। ২০২০-তে কোভিড ১৯ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর একই ‘কফিন ড্যান্স’ আবার নতুন রূপ নেয়। যেমন একটি অ্যানিমেটেড ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে যে, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুলে কীভাবে করোনা পালিয়ে যাচ্ছে (ভিডিয়ো লিঙ্ক: https://youtu.be/74pWVvIvVno) আবার কয়েকদিন আগে সাধারণ মানুষকে লকডাউনে ঘর থেকে না বেরোনোর জন্য সচেতন করতে ভারতীয় পুলিশ কফিন ড্যান্সের ধারণাটিকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছে। (ভিডিয়ো লিঙ্ক: https://www.youtube.com/watch?v=nFa5xfHPXxo) বর্তমানে আফ্রিকান এই ড্যান্সকে সচেতনতামূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এটি ভিডিয়ো থেকে ছবির মাধ্যমেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন—

এই ছবিতে প্রথমে দেখা যাচ্ছে একটি হাসপাতালে আমেরিকার রিপাব্লিকান পার্টির নেতা মাইকেল পেন্স একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করছে মুখে মাস্ক না দিয়েই এবং নীচে কফিন ড্যান্সের সদস্যেরা দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে। আসলে এই ছবিটিতে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, এই কোভিড ১৯-এ কোনোরকম অসাবধানতা আপনার শেষযাত্রা হতে পারে।

প্রথম মেমে:

প্রথম ইন্টারনেট মেমে কোনটি সে নিয়ে নানারকমের মতভেদ আছে। কেউ কেউ ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘গডউইনস ল’ নামে মেমেটিকে প্রথম মেমে বলেছেন।

আবার বিবিসি-সহ অন্যান্য ওয়েবসাইটগুলো ১৯২১ সালের একটি কমিককে প্রথম মেমে কিনা তা বিচার করেছে।

তবে বিবিসি উপরের মেমেটিকে মেমে না বলে “Pre-Internet Expectations Vs Reality meme” বলে বর্ণনা করেছে। কারণ হিসাবে বিবিসি লিখেছে—
“According to the definition, a single image cannot be a meme. It has to be copied and spread with variations to the original image.

So on its own, the 1921 comic is not a meme. But coupled with the comic from either 1919 or 1920, it begins to fit the definition, as the two comics are variations on the same style— using two panels and captions to set-up an expectation and contrast it with reality.” (https://www.bbc.com/news/blogs-trending-43783521) তবে আমরা গডউন্স ল-কে নিয়ে মেমে প্রথম মেমে বলব কারণ গডউইন ল-এর আইডিইয়াকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মেমে তৈরি করে ইন্টারনেটে ভাইরাল করা হয়েছিল এবং যা ইন্টারনেট মেমের সংজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে যায়। তাই আমরা বলতেই পারি সম্ভবত ‘Godwin’s Law’ মেমেই বিশ্বের প্রথম মেমে। তবে ভারতে কবে কোন মেমে প্রথম শেয়ার করা হয় সে-সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

মেমে ও সংস্কৃতি:

মেমে হল একটি অভিব্যক্তি। আমরা যেমন কথা বলার সময় শুধুমাত্র ধ্বনির সাহায্য না নিয়ে হাত নাড়ায়, চোখ ঘোরায়, মাথা নাড়ায় মিমেও তেমনি ছবি আর ভাষার সাহায্যে কোনো কিছু জ্ঞাপন করা হয়। মেমেও একধরনের জ্ঞাপন পদ্ধতি। এই জ্ঞাপন পদ্ধতিতে কোনো একটি আইডিয়াকে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইন্টারনেটে ‘Mass’ জনগণের মধ্যে ভাইরাল করা হয়। তাই মেমেকে গণমাধ্যমের অংশ বললে হয়তো ভুল হবে না। তবে এই গণমাধ্যমের আয়তন অন্যান্য গণমাধ্যমের থেকে খুবই কম কিন্তু সমাজে প্রভাব বেশি। এখন প্রশ্ন হল আমাদের বর্তমান সংস্কৃতিতে মেমে কীভাবে কাজ করে বা তার প্রভাবই কতটুকু? সংস্কৃতি বলতে আমরা সাধারণত মানুষের আচার-ব্যবহার থেকে ভাষা, বিনোদনের মাধ্যম, রীতিনীতি, ধর্ম, রাজনীতি শিক্ষা প্রভৃতি বুঝে থাকি। আমরা আলোচনার এই অংশে মেমে ও রাজনীতি এবং মেমে ও বর্তমান সময় এই দু-টি দিক নিয়ে আলোচনা করব।

প্রথমেই কথা বলা যাক মেমে ও রাজনীতি নিয়ে। বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া একটা অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোটের আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে সমীক্ষা হয়ে যায় কে জিতবে বা কে হারবে। সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য যার ক্ষমতা তার অনেকটা সেরকম। যার বড়ো উদাহরণ ভারতীয় জনতা পার্টির আইটি সেল। যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ভোটে জিততে অনেকটা ভূমিকা নিয়েছিল। (তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন)। রাজনৈতিক মেমে অনেকটা প্রোপাগান্ডা হিসাবে কাজ করে অন্য দলগুলির বিরুদ্ধে। যেমন ২০১৬ সালে হাফিংটন পোস্টে অনুরাগ ভার্মার একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। সেই আর্টিকেলে অনুরাগ ভার্মা ২০১৬ সালে ভাইরাল হওয়া যে-২০টি মেমের তালিকা দিয়েছেন সেই তালিকার প্রায় ৫-৬টি টপিক ছিল রাজনৈতিক। এর মধ্যে বাবা রামদেব, অরবিন্দ কেজরীওয়াল, মনমোহন সিং, নরেন্দ্র মোদী, ডিমনিটাইজেশন, পহলাজ নিহালানি প্রভৃতি টপিক উল্লেখযোগ্য। (https://www.huffingtonpost.in/2016/12/20/20-indian-memes-that-nearly-broke-the-internet-in-2016_a_21631450/)

২০১৭ সালে ৩৫টি মতো মেমে ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়াগুলিতে ভাইরাল হতে থাকে। সেই ৩৫টি টপিকের মধ্যে রাজনীতির সঙ্গে ‘Link Aadhar, Covfefe, Nagar Palikako Bulao’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এইভাবে প্রতি বছরে ভাইরাল হওয়া মেমের মধ্যে রাজনৈতিক মেমে থাকেই। যেমন ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে রাজনৈতিক মেমে সকলকে হাসিয়েছে। ভোটে কখন কার সঙ্গে জোট হবে সেটা কেউই অনুমান করতে পারে না। অনেক সময় একে-অপরের বিচারধারা আলাদা হলেও ক্ষমতা দখল করার জন্য একে-অপরের সঙ্গে জোট বাঁধে। এমনই এক অবস্থাকে মেমেররা ডোনাল্ড ডাকের টেমপ্লেট ব্যবহার করে মেমে তৈরি করেছিল—

আবার একটি মেমেতে জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখা যাচ্ছে—

আসলে রাজনৈতিক মেমে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। এই অস্ত্রের সাহায্যে একটি রাজনৈতিক দল অপর রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। যেমন লোকসভা ভোটের সময় রাহুল গান্ধীকে ‘পাপ্পু’ বলে বিজেপি প্রচারে নেমে পড়ে। এই সম্পর্কিত মেমে তৈরি হয়। বিজেপি এই প্রচারের মাধ্যমে এক প্রকার সাফল্য পায়। ২০১৯ সালে ‘দ্য প্রিন্ট’-কে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়াতে উত্তর প্রদেশের শিবানী জানান, “I do not have much interest in politics. However, I find memes featuring Rahul Gandhi as ‘Pappu’ quite funny.” Needless to say, she doesn’t think ‘Pappu’ can ever become a leader.” (https://theprint.in/politics/how-social-media-memes-became-a-political-weapon-to-woo-first-time-voters/241812/)

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি কীভাবে রাজনৈতিক মেমে একজন রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দেয়। তবে এখানে একটি কথা উল্লেখ করা ভালো রাজনৈতিক মেমেতে বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে ভুলভাল তথ্য পরিবেশন করে বদনাম করার চেষ্টা করা হয়।

এবার আসা যাক মেমে ও সমসাময়িক ইস্যু প্রসঙ্গে। মেমে যারা তৈরি করে তারা নতুন কোনো বিষয় পেলে তারা সেটা নিয়ে মেমে তৈরি করে ভাইরাল করতে শুরু করে এটা আমরা প্রথমেই বলেছি। মেমের এটা একটা বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। এই কারণেই মেমের জগৎ এত বৈচিত্র্যময়। এই বছরের জানুয়ারি থেকে কোভিড-১৯-এর জন্য পুরো বিশ্বে ধীরে ধীরে লকডাউন হতে শুরু করে। আমাদের দেশেও লকডাউন চলছে। কোভিড-১৯-কে ঘিরে দু-ধরনের মেমে দেখা যায়। প্রথমটি হল লকডাউন ও কোয়ারেন্টিন নিয়ে এবং দ্বিতীয়টি হল করোনা ভাইরাসকে নিয়ে। ভারতে ২১ দিনের জন্য লকডাউনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২৪শে মার্চ (২০২০) করেন। এরপরেই মেমেররা মেমে বানিয়ে ভাইরাল করতে শুরু করে। লকডাউনের প্রথমদিকে যে-মেমেগুলি দেখা যায় তার মধ্যে একটি অন্যতম মেমে হল আফ্রিকান বাচ্চাদের নাচতে থাকা একটি ছবি যা এর আগেও অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে ভাইরাল হয়েছিল। মেমেটি হল—

এরপর লকডাউনের মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের সমস্যা বাড়তে থাকল। সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীরা নির্দেশ পেল তারা বাড়ি বসেই আপাতত কাজ সামলাবে। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে নির্দেশ দেওয়া হল অনলাইনের মাধ্যমে পড়াশোনা চলবে। এই বিষয়গুলি নিয়েও মেমে তৈরি হতে থাকে। নীচে এই দুই রকম মেমের উদাহরণ দেওয়া হল—

লকডাউনে সেলুন থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুই বন্ধ। যে-সমস্ত মানুষ চুল দাড়ি সেলুনে কাটে তাদের জন্য লকডাউন যেন এক অভিশাপ। মেমেররা এই বিষয় নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়াতে মেমে তৈরি করে শেয়ার করেছে। এমনই একরকম মেমেতে বলিউড অভিনেতা নাওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকীর দু-টি ছবি ব্যবহার করে মানুষকে হাসানোর চেষ্টা করা হয়েছে—

লকডাউনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৩ই এপ্রিল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে জানান, ৫ই এপ্রিল রাত ৯টা থেকে ৯ মিনিটের জন্য ঘরের লাইট বন্ধ করে মোমবাতি, প্রদীপ, টর্চলাইট ও মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো জ্বালিয়ে নার্স ও ডাক্তারদের প্রতি যেন শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু ৫ই এপ্রিল রাতে কী হয়েছিল সেটা আমাদের সকলেরই জানা। এই বিষয়টাও মেমেতে উঠে এসেছে। নীচের মেমেটি দেখলেই আমাদের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে—

লকডাউন ও বাংলা মেমে প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা যাক। লকডাউনের শুরুর দিকে কলকাতার পল্লীশ্রী থেকে হঠাৎ করে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যায় পল্লীশ্রীর একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন চা খেতে ভিড় করেছে এবং এক তরুণী ভিডিয়ো করছে এবং লকডাউনে কেন বাইরে চা খেতে বেরিয়েছে সেটা প্রশ্ন করছে এবং একজন বয়স্ক লোক উত্তর দিচ্ছে “চা খাবো না আমরা, আমরা খাবো না চা”। এই বিষয়কে নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়াতে মেমে তৈরি শুরু হয়ে যায়। এই সময় একজন ঐ ভিডিওতে দেখা যায় বলছেন, “আমরা চা খেতে এসেছি আড্ডা মারতে নয়। চা খাওয়া হয়ে গিয়েছে এবার বাড়ি চলে যাচ্ছি।” এই কথাটি ও ছবির সাহায্যে অজস্র মেমে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হতে শুরু করে। যেমন—

১লা মে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক লকডাউন ৪ঠা মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত কিছু ছাড় দিয়ে বাড়িয়ে দেয়। কোভিড-১৯ প্রভাবিত অঞ্চলকে তিনটি জোন রেড, ওরেঞ্জ ও গ্রিন জোনে ভাগ করে কিছু কিছু দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে চা ও মদের দোকানও ছিল। মদের দোকান খোলার অনুমতি দিলে মদ্যপ্রেমীরা সামাজিক দূরত্বের নিয়ম অমান্য করে দোকানে ভিড় জমায়। এর ফলে মেমে লাভাররা আবার নতুন করে বিষয় পেয়ে যায়। একদিকে এই চা-প্রেমী কাকুদের আবার ব্যবহার করে অপরদিকে নতুন করে মদ্যপ্রেমীদের নিয়ে মেমে শুরু হয়। চা-প্রেমী কাকুদের নিয়ে মেমেটি হল—

উপরের মেমেতে কলকাতার পল্লীশ্রীর চায়ের দোকানের দৃশ্য ও অনুরাগ বসু পরিচালিত ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এর দৃশ্য মিলিয়ে মেমে বানানো হয়েছে। মদ্যপ্রেমীদের নিয়ে যে-সব মেমে তৈরি করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেমে হল—

এই মেমেতে হিন্দি মুভি ওয়েলকামের একটি দৃশ্যকে তুলে এনে মেমে তৈরি করা হয়েছে। লকডাউনে অর্থনীতি জোর ধাক্কা খেয়েছে। সরকারের কোষাগার শূন্য। এই অবস্থায় কিছু কিছু দোকান খুলে অর্থনীতির চাকাকে যতটুকু পারা যায় গতি দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মদের দোকান খোলার পর যে-পরিমাণ টাকার মদ বিক্রি হয়েছে এবং যে-পরিমাণ রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে তাতে যেন মনে হচ্ছে ভারতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হল মদ। এই বিষয়টিকেই ব্যঙ্গ করা হয়েছে এই মেমেটির মাধ্যমে।

এবার করোনা ও মেমে নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। করোনা ভাইরাস তার ভয়াবহ রূপ নিয়ে বর্তমানে পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মেমে লাভাররা এই ভাইরাসকে নিয়ে মেমে তৈরি ও শেয়ার করতে ভুলছে না। তারা এই ভয়াবহ অবস্থায় ভাইরাসকে নিয়েও ঠাট্টাতামাসা করছে।

উপরের মেমেতে দেখা যাচ্ছে পুরোনো মেমে আইডিয়াকে করোনাকে কেন্দ্র করে উপস্থাপন করা হয়েছে। যা মেমের একটি বৈশিষ্ট্য। করোনা ভাইরাসকে নিয়ে মেমেররা এতটাই উৎসাহ যে, কেউ কেউ ফেসবুকে করোনা নামে একাউন্ট খুলে বসেছে। মেমেররা এটা নিয়েও ব্যঙ্গ করতে ছাড়েনি—

আসলে এই মেমেতে সেইসব ইউজারদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে যারা নামের আগে এঞ্জেল, প্রিন্স বা প্রিন্সেস বসিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করে। করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার পর সোশ্যাল মিডিয়াতে মেমে শেয়ারের ফলে সবচেয়ে ক্ষতগ্রস্থ হয় মেক্সিকোর একটি কোম্পানি। কারণ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা-সহ পৃথিবীর বহু দেশে করোনা নামের বিয়ার আগেই থেকেই বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ইন্টারনেট জগতে করোনা বিয়ারকে নিয়ে মেমে ভাইরাল হতে শুরু করে। এর ফলে কোম্পানির বিক্রি কমে যায়। শেষ পর্যন্ত কোম্পানি অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে কোম্পানির প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়। নীচে কয়েকটি মেমে দেওয়া হল—

এবার উপসংহার টানা যাক। মেমের জগৎ এক অদ্ভুত জগৎ। এই জগৎ প্রতিদিনই বড়ো হচ্ছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন বিষয় মেমেতে উঠে আসছে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকার মেমে নিয়ে নানান ধরনের আইনকানুনও তৈরি করছে। এর মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্টিকেল ১৩ ও আমেরিকার ‘Anti Meme law’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মেমে নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববদ্যালয়ে গবেষণাও শুরু হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মেমে জ্ঞাপন পদ্ধতির কোনো পাঠ্যক্রমেও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কেন-না মেমেও এক প্রকারের জ্ঞাপন পদ্ধতি। যদিও এই জ্ঞাপন পদ্ধতি শুধুমাত্র ‘টেক স্যাভি’ মানুষের মধ্যেই আপাতত সীমাবদ্ধ। কারণ, প্রতিটি মাধ্যমের সীমাবদ্ধতা আছে।

আরও পড়ুন: রবিউল ইসলাম

রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই