রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

মিথ ও ট্যাবুতে সাত সংখ্যা: আফ্রিকান মিথোলজি

সাত সংখ্যাটিকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে কখনো পবিত্র আবার কখনো অপবিত্র হিসাবে দেখা হয়েছে। আবার এটা বললে ভুল হবে না যে, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সাত সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এই কারণে প্যাট্রিসিয়া ফারা তাঁর ‘Science: Four Thousand Year History’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন—

“Seven has always been a very special number. Sanskrit’s most ancient holy book, the Rig Veda, describes seven stars, seven concentric continents, and seven streams of soma, the drink of the gods. According to the Jewish and Christian Old Testament, the world was created in seven days and Noah’s dove returned seven days after the Flood. Similarly, the Egyptians mapped seven paths to heaven, Allah created a seven-layered Islamic heaven and earth, and the new-born Buddha took seven strides. […] For numerologists, seven signifies creation, because it is the sum of the spiritual three and the material four; for alchemists, there are clear parallels between the seven steps leading up to King Solomon’s temple and the seven successive stages of chemical and spiritual purification. Iranian cats have seven lives, seven deities bring good luck in Japan, and a traditional Jewish cure for fever entailed taking seven prickles from seven palm trees and seven nails from seven doors.”

হিন্দু-ইসলাম-খ্রিস্টান-সহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে সাত সংখ্যার গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই। সাত সংখ্যাটি এমনভাবে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে যে, আমরা কথাতেও ‘সাত’ সংখ্যাটিকে ব্যবহার করি। যেমন— ‘সাত সতেরো’ ও ‘সাতে পাঁচে’— যার অর্থ হল বহুবিধ বা নানারকম। তবে আলোচ্য নিবন্ধে আমরা আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রাচীনকাল থেকে ‘সাত’ সংখ্যাটিকে ঘিরে যে-মিথ ও ট্যাবু গড়ে উঠেছে তা নিয়ে আলোচনা করব।

প্রাচীন সভ্যতা বললেই আমাদের সামনে মিশরীয়দের কথা ভেসে ওঠে। মিশরীয় ভাষায় সাতকে ‘Sephet’ বা ‘Seshat’ বলা হয়। আর সেশাত হল প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ‘Thoth’-এর সঙ্গিনী। সেশাত হলেন সময় ও উত্তরণের দেবী। সেশাতের মাথায় সাতটি ফুলের পাপড়ি দেওয়া একটি মুকুট থাকে এবং তার চামড়া চিতাবাঘের। সেশাত জনসাধারণ দ্বারা পূজিত হতেন না। ইনি মূলত মিশরের ফ্যারাওদের দ্বারা পূজিত হতেন।

মিশরীয় মিথে সাত অর্থাৎ সেশাত সংখ্যাটি মূলত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, সেশাতের আরেক নাম ছিল ‘প্রথম গ্রন্থাগারিক’ এবং তার ভূমিকা ছিল মূলত তার স্বামীর বই সংরক্ষণ করা। এখানে লক্ষ করার মতো যে, সেশাতের মাথায় কিন্তু সাতটি ফুলের পাপড়িযুক্ত মুকুট পরা থাকত। এই কারণেই সেশাত অর্থাৎ সাতকে মিশরের ফ্যারাওরা পূজা করত।

মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও মিথে সাত সংখ্যাটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। মিশরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী সাতটি প্রাথমিক শক্তির কথা বলা হয়েছে। এই প্রাথমিক শক্তিগুলি হল: অন্ধকার, আলো, বাতাস, পৃথিবী, জল, আগুন এবং রক্ত। মিশরীয় মিথ অনুযায়ী সাতটি হ্যাথোর (হ্যাথোর হলেন প্রাচীন মিশরীয় প্রেমের দেবী), সাতটি আত্মা, মিশরের সাতটি জেলা বা অংশ, সোলার বার্কের সাতটি স্তর। (সোলার বার্ক বলতে— the bark in which the sun is said to be carried across the sky-কে বোঝায়।), হ্যাথোরের সাতজন কর্মচারী, মেরুপ্রদেশে সাতজন আনুবিস, অটাম-রা-এর সাতটি আত্মা, মাত-এর সাতজন সহকারী কর্মচারী এমন অসংখ্য বিষয়ে সাত সংখ্যাটি মিশরীয় মিথে জড়িয়ে আছে। এমনকী মৃতদেহ সৎকারে সাতরকম তেল ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

পশ্চিম আফ্রিকার বামবারা ও ডোগোন জাতির মানুষদের মধ্যে ৭ সংখ্যা নিয়েও মিথ লক্ষ করা যায়। বামবারা ও ডোগোনদের মতে সাত হল ভারসাম্যের প্রতীক এবং এই ভারসাম্য হল নারী ও পুরুষের। ৩ সংখ্যাটিকে বামবারা ও ডোগান জাতিরা পুরুষত্ব ও ৪ সংখ্যাটিকে নারীত্বের প্রতীক হিসাবে তারা দেখে। আর দু-টি সংখ্যার মিলনে ৭ সংখ্যা সৃষ্টি হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পিরামিডকে ৭ সংখ্যার ভারসাম্যের নিদর্শন হিসাবে ধরা হয়। কারণ, পিরামিডের তলদেশ চতুর্ভুজ এবং তার উপরে ত্রিভুজ আকৃতির পিরামিড অবস্থিত। এই চতুর্ভুজ ও ত্রিভুজ মিলেই ৭ সংখ্যা নির্দেশ করছে।

আফ্রিকার আকান জাতিদের মধ্যে ৩ হল রানির সংখ্যা এবং ৪ হল রাজার সংখ্যা। এই দুইয়ে মিলিয়ে হল ৭ সংখ্যা। আকানদের ভবিষ্যৎ কথনের যে-প্রথা আছে সেখানেও ৭ সংখ্যা বিজোড় হিসাবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

ডোগোন সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে সাত সংখ্যাটির গুরুত্ব আছে। তাদের মতে পূর্বপুরুষদের সপ্তম আত্মা এই বিশ্বব্যবস্থার জন্য দায়ী। এই আত্মাটি একটি কাপড় বুনে মানবজাতিকে দেয় এবং এই কাপড়ে ‘soy’ নামের শব্দ লেখা ছিল। যার অর্থ হল— ‘এটি হল মৌখিক শব্দ’। এই ‘Soy’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হল সাত। এখানে আরও বলা যায় যে, ডোগানদের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হচ্ছিল তখন তাদের প্রধান দেবদেবী ‘আম্মা’ (Amma) এই বিশ্বকে সাত খণ্ড উপরে ও সাত খণ্ড নীচে কেটে ভাগ করেছিল। এখানে আরও বলা যায় যে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম বীজ ‘পো’-এর মধ্যে সাতবার কম্পন হয়েছিল। আর প্রতিটি কম্পন জীবনের এক-একটি স্তরকে নির্দেশ করে। ডোগোনদের এই সাত নারী ও পুরুষের মিলন হিসাবে দেখা হয়। সেখান থেকে নতুন প্রাণের জন্ম হয়।

সাত সংখ্যাটি মিশরীর গণিতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মিশরীয় মৌলিক সমীকরণ অনুযায়ী সাত হল— ১+২+৪=৭। এবং এই গণণার মূল ভিত্তি হল সংখ্যাকে দ্বিগুণ করা। আবার যখন সাতকে দ্বিগুণ করা হয় তখন প্রথম তিনটি সংখ্যা একই থাকে। এই সমীকরণটি মিশরের পিরামিড মাপার সময় ব্যবহার করা হত। এই হিসাব দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, সাত সংখ্যাটি মিশরীয় সভ্যতায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দক্ষিণ-মধ্য ও দক্ষিণ নাইজেরিয়া ও গুয়েনাতে বসবাসকারী ইবো (Igbo) উপজাতিদের মধ্যেও সাত সংখ্যাটিকে নিয়ে নানা ধরনের বিশ্বাস আছে। ইবো উপজাতিরা মনে করে যে, মানুষের মৃত্যু সাতটি কারণে হয়ে থাকে। আফ্রিকান আরেকটি উপজাতি বামবারারা মনে করে যে, আমাদের জীবন সাতটি স্তরে বিভক্ত। এছাড়াও সাতটি স্বর্গ, সাতটি পৃথিবী, সাতটি সমুদ্র ও বৃদ্ধির সাতটি স্তর থাকে।

আফ্রিকারই আরেকটি উপজাতি হল টেডা উপজাতি। টেডা উপজাতিরা সাধারণত পূর্ব ও মধ্য সাহারার চাদ, নাইজের ও লিবিয়াতে বসবাস করে। এই টেডা উপজাতিদের ভাষার নামও টেডা। টেডা উপজাতিদের সাত নিয়ে মিথ আছে। টেডা উপজাতির মানুষেরা মনে করে বিয়ের পর নতুন দম্পতিদের সাত দিন বাইরে না বেরোলে মঙ্গল হয়। তাই নতুন দম্পতির বিয়ের পরের সাতদিন বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ। আবার আফ্রিকার বুইগুয়িনি জাতির মানুষেরা প্রতি সাত বছর পর পর তাদের দীক্ষা নেবার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। আকান উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করে। আকান সাতটি বংশ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি গোষ্ঠী সাতটি গ্রহের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের সাত দিনে এক সপ্তাহ হয় এবং প্রতিটি দিন একজন করে দেবতা সামলায়।

তবে সাত যে শুধুমাত্র উন্নতি কিংবা সাতকে শুভ হিসাবেই ধরা হয় না। আফ্রিকার অনেক উপজাতি আছে যারা এই সাতকেই অশুভ মনে করে। ভুগুয়াস উপজাতির মানুষেরা সাতকে অশুভ ভাবে। জুলু উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে আবার দু-ভাবে দেখে। যদি পণ সংক্রান্ত কোনো বিষয় হয় তাহলে সাত সংখ্যাটিকে অশুভ ধরা হয় আর যদি মহিলা বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে সাত সংখ্যাটি আসে তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। কোলোকুমা জো জাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটিকে এড়িয়ে চলে। কারণ, তারা মনে করে সাত সংখ্যাটি দেবতাদের সঙ্গে জড়িত। তাই সাত সংখ্যাটি এড়িয়ে চলাই ভালো। মালিঙ্কে উপজাতির মধ্যেও সাত সংখ্যাটি একেবারে নিষিদ্ধ। এরা গণনার সময় সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ পর্যন্ত করে না। এরা সাত উচ্চারণ করার পরিবর্তে ‘ছয়-এক’ উচ্চারণ করে। মালিঙ্কা উপজাতিরা মনে করে যে, সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ করলে দুই কথকের মধ্যে বিবাদ হতে পারে। এই কারণেই এরা সাত সংখ্যাটি উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে। কিকুয়ি (kikuyu) উপজাতির মানুষেরা সাত সংখ্যাটির পরিবর্তে ‘Mugwanja’ ব্যবহার করে এবং কখনোই সাত সংখ্যা দিয়ে কোনো কিছু ভাগ করে না। এমনকী বাচ্চারা গ্রুপে কোথাও বেড়াতে গেলে এক-একটি দলে সাতজনের পরিবর্তে অন্য কোনো সংখ্যায় দল করা হয়। কারণ হিসেবে এই উপিজাতিদের মধ্যে বিশ্বাস যে, যদি সাতজন বাচ্চা একসাথে যায় তাহলে সাতটি অভিশাপকে আহ্বান করা হয়। এই সাতটি অভিশাপ সাতটি লাঠিকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং অভিশপ্ত মানুষটির দিকে নিক্ষেপ করে। যদি কখনো দৈবজ্ঞ কাজে সাতটি পদ পরিবেশন করা হয় তাহলে সেটা মৃত্যুর সংকেত হিসাবে এই উপজাতির মানুষেরা ধরে নেয়।

কেনিয়ার কাম্বা বা আকাম্বা উপজাতিদের মধ্যে সাত সংখ্যাটিকে নিয়েও ট্যাবু আছে। কাম্বা উপজাতির মানুষেরা মনে করে বিজোড় সংখ্যা হল সঙ্গীহীন সংখ্যা। তাই কখনোই তারা বিজোড় সংখ্যার গ্রুপের সঙ্গে নিজেদের সন্তানদের কোথাও যেতে দেয় না। গোরুর রাখালদের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম আছে। কোনো গোরুর রাখাল টানা ৬ দিনের বেশি গোরুকে দেখভাল করতে পারবে না। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে সাত সংখ্যাটিকে এখানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কাম্বা চাষীরা আঁখের গায়ে সাতটি শাজারুর কাঁটা জুলিয়ে রাখে যাতে চোরে ফসল না নিতে পারে। তবে কাম্বা জাতিদের মধ্যে সুন্নত-অনুষ্ঠান পর্বটি সাত দিন ধরে হয়। এছাড়া হাতি শিকারীরা চাবুককে সাতবার ভাঙে এতে না কি তাদের হাতি শিকারে সাফল্য এনে দেয়।

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে, সাত সংখ্যাটি আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কখনো শুভ বা কখনো অশুভ হিসেবে এসেছে। আমরা যদি প্রাচীনতার নিরিখে দেখি তাহলে দেখা যাবে আফ্রিকার এই জনগোষ্ঠীরা যে-ধর্ম পালন করে তা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে পালিত ধর্মগুলির চেয়েও প্রাচীন। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে আফ্রিকান মিথোলজির সংখ্যাতত্ত্বে কি অন্যান্য ধর্মে অনুসৃত হয়েছে না কি ‘সাত’ সংখ্যার মহত্ব অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে আছে? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে।

তথ্যসূত্র:
Fara Patricia, Science: Four Thousand Year History
Molefi Kete Asante (Ed), Ama Mazama, Encyclopaedia of African Religion
Encyclopaedia of Britannica (Online Edition)

Spread the love

1 Comment

  • তথ্যসমৃদ্ধ। একেবারে অজানা অনেককিছুই জানা গেল।

    জুবাইর আলম,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *