শরীরে সংগীত রেখো: মনোজ দে— চিত্তরঞ্জন হীরা

বেজে ওঠার আগেই যে বাজলো: মনোজ দে’র কবিতা

নিঃশব্দ কবির সব সময় প্রিয়‌। প্রতিটি রচনাই নৈঃশব্দ্য থেকে সাদা পাতায় এসে বসে। কিন্তু সে যখন মাথুর হয়ে ওঠে! মূল প্রশ্নটা এখানেই। মনোজ, তোমার কবিতা শুধু বাজে। ভেতরে বাজে। কিন্তু যদি বলা হয় লিরিকাল! হয়তো ঠিক বলা হবে না। কিছুটা মিউজিক্যাল না শুধুই প্রেমের কবিতা! হয়তো তাও সব বলা হল না। একটা জীবন প্রেম ছাড়া কি বাঁচে! না বাঁচে না। তাহলে! ওই জীবন, যে এক নরম মনের হাত ধরে সমস্ত অমসৃণ পথ পেরোতে চায়। নিজের সঙ্গে যেমন কথা বলা আছে, আবার সব কিছুই যেন অদৃশ্য এক তুমির কাছে সমর্পণ।
কবিতার নাম কবিতাকে অনেকটাই রেফার করছে। এই প্রক্রিয়াটির মধ্যে কিছুটা বিষয়কেন্দ্রিকতা রয়েছে। যেন কিছুটা আবহমান কবিতার ধারার সঙ্গে যায়। কিন্তু পুরোটা সেই বিষয়কে ধরে এগোয় না। ছড়িয়ে পড়ে আরও আরও বিষয়ের অভিঘাত নিয়ে। তখন মূলকেন্দ্রটা ভেঙে যায়। ভাষায় একটা ক্লাসিক্যাল বিস্তারও রয়েছে। যেমন ‘শুচিবাই’ কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘উপত্যকা, ছড়িয়ে রেখেছ ওই পিয়ানোবাতাস’ (পৃ. ৮)। চমৎকার একটি পঙক্তি, আমাদের সামনে নতুন শব্দ, নতুন চলনের আভাস দিচ্ছে। পিয়ানোবাতাস একটি নির্মিত শব্দ, তার মধ্যে দিয়েই আবহটা তৈরি হচ্ছে। যেন সুরের হাত ধরে হাওয়া খেলছে। আমরা উপত্যকা ছাড়িয়ে হেঁটে এলাম অনেকটা পথ। কিন্তু ওই প্রথম পঙক্তির ধার ও ভার হালকা করে দিয়ে বাকি পথটা আসা।
আবার ‘বিয়োগ’ কবিতায় যেখানে বলা হচ্ছে, ‘যেহেতু শাশ্বত বলে কিছু নেই/মিথ এক উজ্জ্বল মিথ্যে’ (পৃ. ১০)। যেন এটাই সত্য। তারপরও কবিতাটি যেভাবে শেষ হচ্ছে অসাধারণ। মাত্র ছ-লাইনে কবিতাটি এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেল। অর্থাৎ ছোটো ছোটো কবিতাগুলি কখনো শুরুর চমকে উদ্ভাসিত, কখনো শেষ না হয়েও শেষের রেশ ধরে ভাবনার পথে ছড়িয়ে পড়া।
‘যৌনতা এবং সেমিনার’ কবিতাটিরও শেষ দুটি পঙক্তি ভোলা যায় না, যেমন— ‘গতকাল ঘুমের ভেতর হাততালির সাথে/মেয়েদের ব্যক্তিগত উড়ছিল’ (পৃ. ১২)। এভাবে না বলেও অনেক কথা বলার চলনটি সুন্দর। সেলাই মেশিন, বিরক্তির টানা ব্যবহার, নিজের ভেতরের দাগগুলো সেলাইয়ের মতো উঁচু হয়ে থাকা এক অমসৃণতা— এসব এক আলাদা অনুভূতির জায়গা দখল করে বসে। আবার ‘যেকোনো বৃষ্টির পর/অসম্ভব নির্জনতা আসে’ (বিবাহ পরবর্তী), এই শুরু, আর ‘একটা পিনড্রপ সাইলেন্স/কীভাবে নিঃশব্দে ভেঙে যায়’ (প্রেম ও নৈঃশব্দ্য) এই শেষ, কবিতাকে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো গড়ে তোলার খেলাটা অন্য মাধুর্যের সন্ধান দেয়।
‘কুয়ো এবং কুয়োতলা’ থেকে শুর হচ্ছে এমন একটা জার্নি যেখানে ভাষার চেয়ে উপলব্ধিই প্রধান হয়েছে, নিজেকে লেখা কবিতা শাশ্বত সুন্দর। যখন বলা হচ্ছে, ‘একটিমাত্র আস্ত কবিতা আজীবন কুরে কুরে খায়’ (পৃ. ২৫)। এটাই শাশ্বত। ফলে আগের বলা ‘যেহেতু শাশ্বত বলে কিছু নেই’ কথাটা দাঁড়ায় না। তবে নিজের পক্ষে যুক্তি নিয়ে দাঁড়ালে এটা বলা যেতে পারে দুটো দুই সময়ের ভাবনা বা অনুভূতি। তখন সেটা যুক্তি ও তর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আমরা কবিতার কাছে কবিতাই চাই, এবং নতুন শতকের কবিতা।
কুয়ো এবং কুয়োতলা থেকে যে-যাত্রাটা এখানে ধরা হয়েছে তারই আরেকটি ক্লাসিক ফর্ম ‘প্রবাহ’ থেকে ‘ট্রাফিক’ কবিতা পর্যন্ত। আমি একাডেমিক কোনো ব্যাখ্যার দিকে না গিয়েও এটুকু বলতে পারি কবিতায় মাত্রা গুণে যখনই শব্দ বসানোর টেকনিক প্রয়োগ করা হয় তখনই অনেক অপ্রয়োজনীয় শব্দ, প্রাচীন, তৎসম, তৎভব শব্দ এসে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, সে-সব বাঁচিয়ে যদি নতুন ভাষার প্রয়োগে সচেতন হওয়া যায় তাহলে লা-জবাব। যেমন কয়েকটা পঙক্তি যদি আমরা লক্ষ করি দেখব মূল কবিতার বয়ন থেকে তাদের নির্মাণ আলাদা, যেমন—
১. শহর ফুরিয়ে এলে মেয়েরা গ্রামীণ তোলে (এপ্রিল, পৃ. ২৯)
বা
২. ডুব থেকে উঠে আসা। শরীরে নূপুর রং (ঐ)
আবার,
৩. মুঠো রোদ অহেতুক মিছিলের দোস্ত (উত্তর বসন্ত, পৃ. ৩২)
৪. পিরিয়ড আদতে তো কিশোরীর নাম (উত্তর কিশোর, পৃ. ৩৩)

এরকম পঙক্তি খুব বেশি না হলেও এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে কবিই নির্ধারণ করবেন কোন পথটি আজকের কবিতা বেশি বেশি দাবি করছে! এই পথে অজস্র দুপুর নির্জনতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্নায়ুর দেওয়াল তুলে। আমাদেরই ভাবতে হবে স্নায়ুর মধ্যে কী কী ক্রিয়া করছে, দেওয়ালটা ভাঙা জরুরি কি না! যদি ক্লাসিক কবিতা লিখতে মন চায় তাহলে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তাকে হতে হবে নিও-ক্লাসিক। এক্ষেত্রেও ভাষাই প্রথম অবলম্বন। ধরা যাক আমি চোদ্দমাত্রায় সনেট লিখতে চাইছি, হতেই পারে। তাহলে একটা এক্সপেরিমেন্ট হোক যে, আঙ্গিকটা পুরোনোই থাকবে কিন্তু ভাষা হবে একেবারে নতুন। চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে।
‘শরীরে সংগীত রেখো’ সিরিজে ভালো লেগেছে এই লাইন দুটি— ‘খানিক লিরিক শুয়ে আছে/কিছু সাদা পাতা’ (পৃ. ৩৫)। তবে ‘মেঘপারা মেয়ে’ সিরিজে ‘ও মেঘপারা মেয়ে’ পঙক্তিটি বারবার আসায় নতুন কোনো দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং এটি বাদ দিলে কবিতাগুলো একটা ভিন্ন মাত্রা পেতো। আমার তো এরকমই মনে হচ্ছে।
‘আরবপরগনা’-য় ছ-টি অংশ, মনে হল ভেতরে ভেতরে একটা মিথিকাল জার্নি আছে, কিন্তু কোথাও একেবারে ডুবে যাওয়া নেই। ডোবার আগেই ভেসে ওঠা, তারপর ভেঙে ভেঙে নতুন চালে পল্লবিত করা। একটা পাঠ থেকে বিনির্মাণের পথে হেঁটে যাওয়া। ভালো লেগেছে। তবে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ ছিল। যেমন, সুরভিত, বিজেতা, হিরন্ময়, আঁধার ইত্যাদি শব্দের বদলে মুখের ভাষায় ব্যবহৃত প্রতিশব্দ এলে বোধহয় আরও ভালো হত।
‘সংগীত মিডিয়াম’ সিরিজে রেওয়াজ হল প্রধান উপপাদ্য। তাকে আরও রেওয়াজি করে তোলার জায়গাগুলো বেশি নজর দেওয়া হয়নি। এই রোমান্টিকতা যতটা পরাবাস্তবতায় মোড়া তা থেকে একটু বেরিয়ে এসে একটা চেতনার ঝাকুনি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তাহলে হয়তো আরও জমাট বেঁধে উঠতো। যেমন ধরা যাক, ১২ নং কবিতাটি যা আছে তাকে একটু আমার মতো করে যদি পড়ি, কেমন হয়—
“গান শেষের তুমি
হেঁটে যাও
গ্রিনরুম থেকে পায়ে পায়ে

সবটুকু আলো নিভে এলে
তোমার বিনুনি আবার নিখুঁত ইমন…”

অনেকটা এরকম। তুমি তোমার মতোই ভাববে। কিন্তু আবেগকে আরও সংযত করতে পারলে কবিতা হয়ে উঠবে আরও জমাট আরও এক্সক্লুসিভ।
‘এক্সিডেন্ট’ কবিতায় দুটি শব্দ দারুণ তৈরি হয়েছে, শুশ্রূষাকেবিন ও আদরবাহার। নতুন চিত্রনির্মাণ, নতুন নতুন শব্দ তৈরির জন্যে এরকম জোট বাঁধা একজন কবির শব্দ নিয়ে খেলার মধ্যেই পড়ে। তখন দেখা যাবে নতুন নতুন আরও শব্দ গড়ে উঠছে অভিধানের বাইরে, নিত্য ব্যবহার্যের বাইরে। নতুন নতুন দৃশ্যের মাধ্যমে শব্দের ধারণাও তখন বদলে যেতে থাকে। এই যেমন বলা হচ্ছে, ‘ধারালো সাঁকোর পাশে/ভেজা ফ্রক পেরিয়ে এসেছ, তুমি, কুমারীবাদক’ (নিষেধনামা, পৃ. ৫৮), এখানে সাঁকো যে ধারালো হতে পারে পাঠকের কাছে তা এক নতুন বার্তার মতো, নতুন অভিজ্ঞতা। ভেজা ফ্রক পেরিয়ে আসাটাও নতুন দৃশ্যকল্প, আর রয়েছে কুমারীবাদক-এর মতো নতুন শব্দজোট। এভাবেই কবিতায় নতুন পথের দিশা পাওয়া যায়। কিন্তু মুসকিল হল গোটা কবিতায় এমন চলনের ব্যবহার কম থাকছে। একটা পরম্পরা বা ভারসাম্য গড়ে তোলাটা খুব জরুরি।
‘ফাইনাল ইয়ার’ সিরিজটির মধ্যেও অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে, যেমন—
১. দেখি আলো, তোমার চুলের পাশে বড্ড মানিয়েছে (এখানে বড্ড না দিয়ে বেশ দিলে আরও ভালো লাগত)
২. অন্যমনস্কতা, জল কেঁপে ওঠে, ভেসে যায় অচেনা হরফ
৩. সাক্ষাৎকারপর্ব থেকে উঠে এলো রোদ;

এরকম আরও কিছু পঙক্তি রয়েছে যারা সামান্য পরিচর্যা পেলে আরও আলো-পরিসর পেয়ে যেত। আমরা শুধু অপেক্ষায় থাকি একজন তরুণ কবির কাছে নতুন নতুন সম্ভাবনার স্পার্কগুলো দেখব বলে।
তোমার কবিতায় অজস্র এলিমেন্ট রয়েছে যা বাংলা কবিতার আগামী দিনের উজ্জ্বল সম্পদ হতে পারে। অজস্র বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার জন্যে যথার্থ জল মাটি আলো চায়। কবির কাজ নিজের প্রতি নিজেই বেশি নির্দয় হয়ে ওঠা। আরও একটু নিজেকে ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারলেই সাইরেন ও ঘুঙুর শব্দে বেজে উঠবে নতুন বন্ধুতা। আমরা অপেক্ষায় রইলাম মনোজ। যতদূর হোক সমুদ্র, ঢেউ আছড়ে পড়ুক বুকের উপর। কবির ও পাঠকের।

শরীরে সংগীত রেখো: মনোজ দে— চিত্তরঞ্জন হীরা

আমাদের নতুন বই