লেখক নয় , লেখাই মূলধন

ধারাবাহিক।পর্ব২

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েনের ভ্রমণ

চতুর্থ অধ্যায়
পক্ষকাল শেষে শোভাযাত্রার অবসান হতেই শেং শাও নামক দলটি শি পিনের দিকে রওনা দিল। সঙ্গী হল ওইগার প্রদেশের এক বৌদ্ধ শিষ্য। পঁচিশ দিনের অবিরাম পথ চলা শেষে ফা-হিয়েন ও তাঁর অন্য সাথীরা এসে পৌঁছোলেন জু হো প্রদেশে। এ-দেশের রাজা বৌদ্ধধর্মের উপাসক। সহস্রাধিক সন্ন্যাসী আছেন এখানে আর সকলেই মহাযান ধর্মাবলম্বী। দিন পনেরো বিশ্রাম অন্তে আবার যাত্রা। দক্ষিণ দিক লক্ষ করে চার দিন পথ চলা শেষে দলটি এসে পড়ল পলান্ডু পরিসরে। এবার আবার এক নতুন দেশ ইউ হি। আবার দিন কয়েকের বিরতি। এবারের যাত্রা হবে দীর্ঘ, বিরামহীন। একটানা পঁচিশ দিন ভ্রমণ শেষে এবার এসে পৌঁছোনো গেল চি চাহ প্রদেশে। হুই চিং আর অন্য সাথীদের সঙ্গে এসে পুনরায় মিলিত হলেন তাঁরা।

পঞ্চম অধ্যায়
দেশের রাজা পঞ্চ শীল ধারণ করেছেন। এ হল পাঁচ বছরের মহাসমাবেশ। সব শ্রমণদের রাজা আমন্ত্রণ জানান এই সমাবেশে। আর বিপুল সংখ্যায় তাঁরা যোগও দেন। তাঁদের বসার আসনগুলি পূর্ব হতেই সুসজ্জিত করে রাখা হত, ছোটো ছোটো পতাকা আর স্বর্ণ রৌপ্যের সুতায় পদ্মফুলের নকশা করা শামিয়ানা দিয়ে। আসনের পিছন দিকে একেবারে নিদাগ, ঝলমলে ঝালর দিয়ে সাজানো হত। রাজা তার সব মন্ত্রী অমাত্যদের নিয়ে যাবতীয় আচার মেনে পূজার অর্ঘ্য দিতেন। এক, দুই কখনো-বা তিন মাস পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান পর্ব চলত এবং সাধারণত বসন্তকালেই বসত আসর। রাজার সভা শেষ হলে তিনি অমাত্যদের আহ্বান জানাতেন। এবার তাঁদের পূজার অর্ঘ্যদানের পালা। এই পর্বটি চলত দু-তিন, কখনো পাঁচ দিন ধরে। সকল নৈবেদ্য সারা হলে, এইবার রাজার আদেশমতো তাঁর মন্ত্রী, অমাত্যদের নিজস্ব ঘোড়ার সমকক্ষ কিছু ঘোড়ায় লাগাম, জিন পরিয়ে সাজানো হল। আনা হল অতি শুভ্র বস্ত্র, সকল প্রকারের রত্ন সম্ভার, শ্রমণদের যেমনটি প্রয়োজন। রাজা তাঁর অমাত্যবর্গ-সহ শপথ নিয়ে এ-সব সামগ্রী শ্রমণদের দান করলেন। এভাবে সন্ন্যাসীদের থেকে ভিক্ষা সামগ্রীর মাধ্যমে মুক্ত হল শ্রমণগণ। দেশটি তো পর্বতসংকুল এবং যথারীতি শীতল। গম ছাড়া আর কোনো শষ্য জন্মায় না। শ্রমণগণ তাঁদের প্রাপ্ত সামগ্রী গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ হয়ে এল মেঘলা, ফলস্বরূপ হিমশীতল হল সকাল। এই জন্যেই এ-দেশের রাজা প্রতিনিয়ত সন্ন্যাসীদের কাছে প্রার্থনা করে গেছেন যাতে তাঁদের প্রস্থানের পূর্বে খেতের গম পেকে ওঠে। বুদ্ধের ব্যবহৃত একটি পিকদানি আছে এ-দেশে। তাঁর ভিক্ষাপাত্রের মতো এটিও একই রঙের পাথরে তৈরি। আর আছে বুদ্ধের একখানি দাঁত। এবং এই দাঁতের সম্মানে এ-দেশের মানুষ তৈরি করেছে একটি প্যাগোডা। সহস্রাধিক সন্ন্যাসী আছেন এই স্থানে, তাঁরা প্রত্যেকেই হীনযান মতাবলম্বী। যত পুবে পর্বত ঘেরা স্থানে যাওয়া যায়, সেখানে মানুষ চীনাদের মতোই মোটা, খসখসে পোশাক পরে, যদিও তাদের পশম আর গরম বস্ত্রের ব্যবহার ভিন্ন। শ্রমণদের আচার অনুষ্ঠানও এখানে বিচিত্র আর অগণিত। এই দেশটি যেন পামীর, হিন্দুকুশের কোলে শিশুর ন্যায় রয়ে গেছে। আর এখান থেকে গাছপালা, ফুল, ফলের চরিত্রও যায় বদলে। চীনের সাথে মিল পাওয়া যায় কেবল বাঁশ, পেয়ারা আর আখ গাছের।

ষষ্ঠ অধ্যায়
এই স্থান থেকে পশ্চিমে এগোও, মিলবে ভারতবর্ষের উত্তর খণ্ড। পথ মধ্যে হিন্দুকুশ, পামীরের বিস্তার। বুনো পেঁয়াজের ভারী ফলন এ-অঞ্চলে। এক মাস যাবৎ যাত্রা শেষে সফল হলেন তীর্থযাত্রী দল। পার করলেন এই ‘পেঁয়াজ পরিসর’। বরফের এই দেশে শীত গ্রীষ্মে ভেদ নাই কোনো। আর আছে বিষধর ড্রাগন। সামান্য প্ররোচনায় ঢেলে দেয় বিষময় বাতাস, বৃষ্টি, তুষার, বালি ঝড় বা পাথর। এমন বিপদের মুখে দশ হাজারে একজন পালাতে পারে না, এমনই ভয়ংকর। এ-দেশের মানুষকে ‘তুষার শৃঙ্গের মানব’ নাম দেওয়া চলে অবলীলায়। এ-সকল পর্বত পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছোলেন উত্তর ভারত। একেবারে সীমান্তে তো লি জাতির মানুষের বসতি। এঁদের মধ্যে শ্রমণেরা আছেন। প্রত্যেকেই হীনযান মতাবলম্বী।

বুদ্ধের ছিল আঠারো জন ব্যক্তিগত শিষ্য। আর জানা যায় যে, তাঁদেরই একজন নিষ্ক্রমণ শক্তি দ্বারা এক কুশলী শিল্পীকে স্বর্গরাজ্যে নিয়ে যান, সেখানে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্ব মূর্তির (চীনের মন্দিরে হাস্যরত ঈশ্বরের বিগ্রহ) দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বর্ণ ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে ফিরে এসে তাঁকে দিয়ে কাঠের উপর নিজের একখানি মূর্তি উৎকীর্ণ করানো যায়। এই পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে সর্বমোট তিনবার স্বর্গলোক যাত্রা করেন। অবশেষে সম্পূর্ণ করলেন আশি ফুট উচ্চতার বিশালাকায় একটি কাঠের মূর্তি, যার চরণ দু-খানিই ছিল আট ফুট লম্বা। ব্রত, উপবাসের দিনগুলোতে উজ্জ্বল দীপ্তিতে ঝলমল করে উঠত এই মূর্তি। এইখানে পূজার অর্ঘ্য দেবার জন্য এ-প্রদেশের রাজাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত।

সপ্তম অধ্যায়
পর্বতের ইশারায় এগিয়ে যাও দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্ত ধরে,পাবে কঠোর, দুর্গম, অতি ভয়ংকর এক পথ। পনেরো দিন এই পথে একটানা চললেন যাত্রীদল। পাথর প্রাচীরের মতো নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে এক-একটি পর্বত। মোটামুটি একহাজার জেন তাদের উচ্চতা। দৈবাৎ প্রান্তে এসে পড়লে চোখের দৃষ্টি হয় বিহ্বল। দুর্মর সাধ জাগে এগিয়ে যাই সামনে, আর সত্যিই যদি সাড়া দাও সে-ইশারায়, হারিয়ে ফেলবে মাটি, হারিয়ে ফেলবে শূন্য। নীচে স্রোতস্বিনী সিন-তন। প্রাচীন সময়ের মানুষেরা পাথর কেটে পথ তৈরি করেছিল। পর্বতপ্রান্ত ধরে সাতশো ধাপের একটি সোপান। সে-সিঁড়ি বেয়ে যদি নীচে নামা যায়, দেখা যাবে নদীর উপরে ঝুলে আছে দড়ির সেতু। নদীর দু-টি তীরের মাঝের দৈর্ঘ্য আশি কদমের কম। চিঙ-ই-র মতে হুন সাম্রাজ্য থেকে আসা ছাং চিন বা কান ইং এই স্থানে পৌঁছোতে পারেনি। সন্ন্যাসীগণ ফা-হিয়েনের কাছে জানতে চাইলেন, পুবের দেশগুলিতে বৌদ্ধধর্মের প্রসার কোন সময় থেকে শুরু হয়। ফা-হিয়েন বললেন, “যার কাছেই আমি জানতে চেয়েছি সকলেই বলেছে যে, ভারতবর্ষের শ্রমণেরা প্রাচীন রীতি মেনে, মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের মূর্তি স্থাপনের দিন, নদী অতিক্রম করে বৌদ্ধ সূত্রাবলী এবং শৃঙ্খলাগুলি এখানে নিয়ে আসেন”। বুদ্ধের নির্বাণের তিনশ বছর পর এই মূর্তি স্থাপনা হয়। তখন চৌ সাম্রাজ্যের পিং ওয়াং রাজার শাসনকাল। এই সময় থেকেই বুদ্ধের উপদেশাবলি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মহান মৈত্রেয় ছাড়া আর কেউ বুদ্ধের ত্রিকায়া এবং তার উপদেশাবলির এমন সম্যক প্রচার করতে পারেননি। বিদেশিদের কাছে এই ধর্মবিশ্বাস এভাবেই পরিচিতি পায়।

হুন সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা মিং টি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের স্বপ্ন লালন করেছিলেন। আর ফলস্বরূপ পবিত্র গ্রন্থগুলি ফিরিয়ে আনার জন্য অভিযান শুরু হয়। বুদ্ধের প্রচলিত অনুশাসনগুলির উৎস যে কী, তা মিং টির স্বপ্নের মতো একরকম অমীমাংসিত রহস্যই হয়ে রইল।

প্রথম পর্ব

অনুবাদক: সঙ্গীতা দাস

শৈশব ও বেড়ে ওঠা উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার চাঁদপাড়া। অত এক দশকের বেশি সময় ধরে গ্রামের স্কুলে ইংরেজি ভাষার শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত। অন্তর্মুখী জীবন নিয়ে একা একা লোফালুফি খেলেন। অনুবাদ, লেখালেখি, পাঠ এ সবই নীরব কুয়াশায় আচ্ছন্ন। এই অনুবাদ, এ তাঁরই জীবনের অংশ, তাই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।

ফা-হিয়েন

ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২ খ্রিস্টাব্দ) একজন চীনা বৌদ্ধ সাধু এবং অনুবাদক ছিলেন। তিনি ৩৯৯-৪১২ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে পদব্রজে চীন থেকে ভারত পর্যন্ত এসেছিলেন এবং বৌদ্ধ লিপি সংগ্রহ করার জন্য মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ পীঠস্থানগুলো ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি এইসব ভ্রমণ বৃত্তান্ত ‘এ রেকর্ড অব বুদ্ধিস্ট কিংডমস্’ বইতে লিখেছেন।

পছন্দের বই