Categories
2021-June-Prose গদ্য

দেবব্রত শ্যামরায়

বাবাকে নিয়ে, ব্যক্তিগত

একজন সাধারণ মানুষ কত নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারে। নিঃশব্দ৷ আড়ম্বরহীন। বড়ো মানুষ চলে গেলে কাগজে লেখালেখি হয়। তাঁর কাজ নিয়ে কত আলোচনা। যুবা নায়ক আত্মহত্যা করলে গুণমুগ্ধরা দীর্ঘদিন কাঁদে। স্বাভাবিক। নামহীন মানুষের সে-সব বিড়ম্বনা নেই। তার জীবনের মতোই তার মৃত্যুও বড়ো মূল্যহীন৷ সে আর কোথাও নেই, দেহে নেই, আত্মায় নেই, তার জড় উপাদানগুলি ভেঙেচুরে পঞ্চভূতে লীন। সারা জীবন সংসার ঠেলে যাওয়া ছাড়া তার বৃহত্তর কোনো কাজ নেই। প্রিয়জনের স্মৃতি ছাড়া তার আর কোনো বাসভূমি নেই। সেই স্মৃতিও ক্রমশ ধূসর হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে একদিন। পুরোনো জামাকাপড় দিয়ে দেওয়া হবে একে-তাকে৷ চশমাটা শুধু পড়ে থাকবে তাকের কোণায়। এই নিভৃত, নিরুপদ্রব মুছে যাওয়াটাই প্রকৃতির ভারি পছন্দের জিনিস। এই মহাবিশ্বে বিরাট বিপুল নক্ষত্র বা ধরা যাক ছোটো কোনো ফুল, সবই টুপটাপ ঝরে যায়। এই লেখাটি লিখিত হওয়ার সময়েও খুব কাছে, হয়তো-বা বহু আলোবছর দূরে খসে গেল কেউ, তার খবর পৌঁছোল না কোথাও। এই নীরবতা যাপনই প্রকৃতির অভ্যেস। একমাত্র মানুষই ব্যতিক্রম— স্বজনবিয়োগে মানুষই বোধহয় সবচেয়ে বেশি কাঁদে, কেঁদে কেঁদে আঁকড়ে ধরতে চায়।

কোভিড আমার বাবাকে সহসা এই নীরবতা এনে দিল। কোভিড-মৃত্যু, তাই কোনো শ্মশানবন্ধু নেই। রাত দুটোর কোভিড-নির্ধারিত শ্মশান প্রায় জনশূন্য, শুধু ভাগীরথীতীরে দু-একটা কুকুর আর ভিনগ্রহী জীবের মতো পিপিই-পরা দু-জন শ্মশানকর্মীর ঘোরাফেরা যেন কোনো অচেনা ভবিষ্যতের এক ডিসটোপিক পৃথিবীর ছবি আঁকছে। এই নীরব প্রস্থান পিতার কাঙ্ক্ষিত ছিল কিনা জানি না, তবে স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আচার-অবিশ্বাসী সন্তান সামান্য স্বস্তি পেল। মুখাগ্নি নেই, মন্ত্রপাঠ নেই, ব্রাহ্মণ নেই। নির্জন পবিত্র শোক ছাড়া বাইরে থেকে আরোপিত কিছু নেই। মনে হল, নিজের জন্যেও ঠিক এমনই নিরাভরণ বিদায় চায় সে।

বিদায় মুহূর্তটি শান্ত, নিরুপদ্রব— এই ভুল ভেঙে যেতে বেশি দেরি হল না। পিপিই-পরা সৎকারকর্মীরা অচিরেই নানা পরিষেবার দরপত্র খুলে বসলেন। কালো প্লাস্টিক সরিয়ে মৃতের মুখ দেখার মূল্য পাঁচশো, দাহের পর মৃতের নাভিকুণ্ডটি সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে চাইলে তার জন্য নগদ হাজার দুয়েক। তাঁরা জানায় যে শোকার্ত পরিজনকে তাঁরা বিরক্ত করতে চায় না, কিন্তু অনন্যোপায়, কারণ, নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কোভিড বডি নিয়ে তাঁদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হচ্ছে, অতএব এই সামান্য উপরিটুকু তাঁদের প্রাপ্য। না, কোনো পরিষেবাই আমার দরকার নেই, শুধু বাবার চলে যাওয়াটুকু দূর থেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে চাই। তা সম্ভব নয়, কেন-না ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। অতএব পকেটে যা ছিল তা দিয়ে বকশিস মিটিয়ে যখন বেরিয়ে আসি, ততক্ষণে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারে অমোঘ চুল্লির ভেতরে ঢুকে গেছে প্লাস্টিকসমেত বাবার শরীর। অবিভক্ত ভারতের নারায়ণগঞ্জ জেলার কুমুন গ্রামে একাশি বছর আগে যে-শিশুটির জন্ম হয়েছিল, দেশভাগের পর ছিন্নমূল হয়ে দিদির হাত ধরে এপারে এসে জীবনভর যে-সংগ্রামের শুরু, তার সৎ ও পরিশ্রমী জীবনের শেষতম পার্থিব চিহ্নটি এক শরতের রাতে পানিহাটির গঙ্গাতীরে একটি কোভিড শ্মশানে চিরতরে মুছে গেল। আর কোভিডকালে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ হতভাগ্য স্বজনহারা মানুষের সঙ্গে একই সুতোয় জড়িয়ে গেল আমার নাম।

ভিড় করে আসে স্মৃতি। স্মৃতিতে ভর করে আর আত্মীয়স্বজনের কাছে শোনা কথা থেকে নির্মাণ করে নিই মানুষটিকে। কোন মানুষটার কথা বলি, কোন মানুষটাকেই-বা বাদ দিই! যে-মানুষটাকে কচি বয়সেই দাদা-দিদিদের সঙ্গে উদ্বাস্তু কলোনির রাস্তায় জলের লাইনে দাঁড়াতে হত। স্কুলফেরতা গোবর কুড়োতে হত তাঁকে, মা ঘুঁটে দেবেন বলে। সেই মানুষটা ব্যারাকপুরে দেবীপ্রসাদ স্কুলে অনেকবার অংকে একশো পেয়েছে, নব্বইয়ের নীচে কোনোদিন পায়নি। যে-মানুষ উঁচু ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই নিজের খরচ চালাতে নিয়মিত টিউশনি করত, এমনকী নিজের ক্লাসের ছেলেদেরও পড়াতে পারত। সেই মানুষটাকেই একদিন বাড়ির ওপর চাপ কমাতে পড়াশুনোর পার্ট দ্রুত গুটিয়ে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হতে হয়, টেকনিকাল স্কুলের সার্টিফিকেট নিয়ে আপন দক্ষতায় চাকরি জোটে সাহেবি ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানিতে। পদোন্নতি হচ্ছিল, হঠাৎ সাহেবি কম্পানি এ-দেশে ব্যাবসা গুটোনোয় চাকরি যায়। আর পরের চাকরি না করে হাতেকলমে কিছু করার তাগিদে কিছু সেকেন্ডহ্যান্ড মেশিন কিনে শুরু হয় একান্ত নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ক্স। ইতিমধ্যে জীবনে প্রেম এসেছে। কালো লোককে কোনোদিনই পছন্দ ছিল না মায়ের। ফুচকাওলার রং কালো বলে ফুচকা না খেয়ে পয়সা ফেরত নিয়েছিল বর্ণবৈষম্যবাদী মা। এহেন মায়ের কালো প্রেমিক ও স্বামী জুটল। অতঃপর একটি সন্তান। সব কিছুর মধ্যে হুগলি শিল্পাঞ্চলের কয়েকশো অতিক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগের মধ্যে একটি হয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নেয় বাবার কারখানা। সংকটও আসে, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো-বা রাজনৈতিক। উত্থানে-পতনে, ঘাতে-প্রতিঘাতে এইভাবেই জীবন এগিয়ে চলে। জীবন যেরকম…

জীবন এরকমই। উনিশ অথবা বিশ। জনমানুষের তুচ্ছ যাপনের ভিড়ে আরও একটি সামান্য জীবনের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা কী-ই-বা প্রয়োজন? সন্তানের আগ্রহ থাকতে পারে, কিছুটা পক্ষপাতও। কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবনেই তো এমন কাহিনি আছে, তাতে জিত আছে, হার আছে, কিন্তু সে-সবই বড়ো আটপৌরে৷ তাতে কোনো অতিরিক্ত বীরত্ব নেই, সমাজ-সংসারে হইচই ফেলে দেওয়া প্রথাভাঙা কৃতিত্ব নেই, অ্যাডভেঞ্চার নেই, বরং কিছুটা অসহায় ভীরুতাই থেকে যায়, ঠিক যেমন নকশাল আমলে প্রতি রাতে আপিস ও তারপর টিউশনি সেরে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরত বাবা আর গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করত এক নববধূ।

কিন্তু আজ যখন বাবা নেই, মনে হচ্ছে, বাবার সঙ্গে বসে আরও কিছুটা সময় কাটানো উচিত ছিল আমার। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর খাতিরেই না হয় পাশে বসে দেখা উচিত ছিল বাবার পছন্দের সিরিয়াল। জানা হল না বাবার অনেক কিছু! আমি জানতে পারলাম না, কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, বাবার পছন্দের রং কী? আদৌ ‘পছন্দের রং’ শব্দবন্ধটা নিয়ে কোনোদিন কিছু ভেবেছে কিনা আমার সাদামাটা বাবা। জানা হল না, এ-জীবনে তাঁর কোনো অপ্রাপ্তির বোধ রয়ে গেল কিনা! হ্যাঁ, আন্দামানের গল্প শুনে কথায় কথায় একবার ঘুরতে যেতে চেয়েছিল বাবা। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজারো বাধ্যবাধকতার চাপে সে-সব নিয়ে কথা হয়নি আর। ঠিক যেমন জানা হল না, আর একটিবার বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে নিজের গ্রামের মাটিতে দাঁড়ানোর ইচ্ছে ছিল কিনা! সম্ভবত না, বাবা পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে ভালোবাসত না তেমন। সকালের বাজার, বসবার ঘরে নিজের চেয়ার ও টেবিলে খবরের কাগজ, চায়ের ফ্লাস্ক আর টিভির রিমোট নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছিল অবসরের দিনগুলো। বাবার হাতে অনেক সময় ছিল কথা বলার জন্য, আমারই শোনার সময় ছিল না তেমন। তাই অনেক কিছুই ভালো করে জানা হল না, বাবা…!

ঠিক যেমন জানা হল না… কোভিড হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে জীবনের শেষ সাতদিন একা একা শুয়ে, কষ্ট পেতে পেতে, চেতন থেকে অচেতনের দিকে ক্রমশ ডুবে যেতে যেতে, কার কথা ভাবছিল লোকটা? মায়ের কথা? উজানের কথা? কার মুখ দেখতে ইচ্ছে করছিল, শেষবারের মতো কার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল বাবার?

কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার পর বাজারে গেলে বাবা মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেত। এক ঘণ্টা… দু-ঘণ্টা। আমি বাড়ি থাকলে মা-র ঘ্যানঘ্যান সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে পড়তাম। হন্যে হয়ে বাবাকে খুঁজতাম।

আমাদের সবুজ মফস্সলে রাস্তার দু-ধারে সকালের রোদে বাজার বসত। আশেপাশের গ্রাম থেকে তাজা শাকসবজি আর মাটিমাখা ডিম নিয়ে আসতেন চাষি-বউ। খুব ভোরে ঘোষেদের পুকুরে জাল পড়ত। ওপার বাংলার রোদে-জলে পুষ্ট বাবার নিয়মিত মাছ না হলে চলত না। শাকও কিনত প্রচুর। বাজারের থলে উপচে পড়ত কলমি, পালং, আলোরং কুমড়ো ফুলে। মা-র মুখ ভার হত। এত শাক আনো কেন? নষ্ট হয় তো! বাজারে গিয়ে বাবার প্রথম কাজ ছিল এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘোরা। বাজার করার এটাই নাকি প্রথম সূত্র। বাজার করার আগে বাজারকে হাতের তালুর মতো চিনে নিতে হয়। দেখতে হয় কার কাছে আজ ভালো কী কী এসেছে, কী তার দাম। তারপর বাজার করা শুরু।

শুরু হত বটে, কিন্তু বাজার করা শেষই হত না অনেক সময়। বাজারের মাঝখানে ঢুকে পড়ত গল্প। রাজনীতির আলোচনা। গরম চায়ের গেলাস। সকাল হলেই আমাদের শান্ত শহরতলির রাস্তা ভরে উঠত সাইকেলের ঘণ্টিতে৷ জার্মান সিলভারের সস্তা টিফিন বাক্স চটের ব্যাগে ঝুলিয়ে সাইকেল চেপে আশেপাশের কলকারখানায় পৌঁছে যেতেন পানিহাটি শিল্পাঞ্চলের মানুষজন। ঠিক আটটায় জুটমিলের ভোঁ বাজত। পাড়ায় কোনো-না-কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসত বিনুনিবাঁধা বালিকার গলা সাধার আওয়াজ৷ চায়ের দোকানের কয়লার উনুনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত হেমন্তের অলস সকাল। রাস্তার পাশে সেদিনের গণশক্তি আটকানো থাকত বাঁশের চটায়। বাবা একাধিক খবরের কাগজ পড়ে, চা খেয়ে, চেনাজানা নানা মানুষের সঙ্গে আড্ডা মেরে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরত। বাড়ির কাছাকাছি এলে অবশ্য হাঁটার গতি বেড়ে যেত৷ অপেক্ষমান মায়ের রাগত মুখটা মনে পড়ত বোধহয়। যেদিন মনে পড়ত না আমি গিয়ে খুঁজে আনতাম। বাবাকে পেতাম কোনো চায়ের দোকানে, খবরের কাগজের ঠেকে অথবা ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমতে থাকা বন্ধুদের আড্ডায়।

বহুদিন আর সাইকেলের ঘণ্টি কোরাস শোনা যায় না। মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে কবেই। বেশিরভাগ কারখানা ভেঙে তৈরি হয়েছে টাউনশিপ। বাস্তু-অনুমোদিত অ্যাপার্টমেন্ট্স। সত্তর শতাংশ গ্রিনারি। এছাড়া যে-সব কারখানার জমিজমা নিয়ে মামলা চলছিল, সেগুলোও এক এক করে কিনে নিয়েছেন এলাকার এমএলএ-র জামাই। গোডাউন তৈরি হবে। পথের দু-ধারে মাথা তুলেছে আরও কিছু শ্রীহীন আবাসন। রাস্তা থেকে উঠে এমনই এক আবাসনের নীচে ঢুকে গেছে পুর বাজার। কৃত্রিম আলোয় ছলকে উঠছে মৃত মাছের চোখ। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে কাতলার ট্রাক ঢুকেছে রাতের শহরে।

আজ বাজারের সামনে ফ্ল্যাটের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে এইসব পুরোনো কথা মনে পড়ছিল। বাবার ক্রিমেশন সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে আমি তখন হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি একটা জেরক্সের দোকান!

মানুষ বুড়ো হলে হঠাৎ একসময় আকাশের তারা হয়ে যায়। উজানের দাদা অর্থাৎ, ঠাকুরদাও তারা হয়ে গেছে— বছর পাঁচেকের শিশুটিকে শোকে কিছু আস্বস্ত করার তাগিদে বিষয়টা এইভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু তাকে এসব বলার পর থেকে আরেক নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে৷ এখন সে যার নামই শোনে— মার্ক জুকেরবার্গ থেকে মমতা ব্যানার্জি— একবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নেয়, দুর্দৈবক্রমে এঁরা কেউ স্টার হয়ে গেছেন কিনা! বালাই ষাট!

যাইহোক, শিশুদিবসে উজানের ইশকুল থেকে অনলাইনে বাড়ির কাজ এসেছিল— এক পাতা হাতের লেখা— আই লাভ চাচা নেহেরু। চাচা নেহেরু কে? চাচা নেহেরু কি তারা হয়ে গেছে? হ্যাঁ, তা হয়েছে। করোনায়? না না, অনেকদিন আগেই। চাচা নেহেরুর সঙ্গে কি আমার দাদার দেখা হয়েছে? আমি ভাবতে চেষ্টা করি, নেহেরু যখন রাণাঘাটে উদ্বাস্তু শিবিরে এসেছিলেন, বাবারা ততদিনে ব্যারাকপুর সদরবাজারে, মুসলিমদের খালি করে চলে যাওয়া মহল্লায়। অর্থাৎ, জীবিত অবস্থায় কারো সঙ্গে কারো দেখা হয়নি। কিন্তু উজান আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেয়, ওই যে চাচা নেহেরু আর দাদা গল্প করছে। আমি সন্ধ্যের আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাই। দেশভাগের ক্ষত পুষে রাখা ও একসময় সক্রিয়ভাবে আরএসএস করা আমার বাবা আজ নেহেরুকে দেখে খুশি হচ্ছেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নাকি আজকের রামরাজত্বে নেহেরুকে সামনে পেয়ে তিনি একটু খুশিই হচ্ছেন? মনে আছে, আঠাশ বছর আগের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি-ভাঙাকে জাস্টিফাই না করতে পারলেও আমার মতো বিষণ্ণ ও ক্রুদ্ধ হতে পারেননি আমার বাবা। তারপর থেকে ক্রমশ বুড়ো হতে থাকা বাবাকে যত আঁকড়ে ধরেছি আমি, পুত্রের থেকে পিতা, রাজনৈতিক বোধে ও দৃষ্টিকোণে, ততই দূরতর হয়েছেন। সে-দূরত্ব আর ঘোচেনি।

উজান আঙুল দিয়ে দেখায়, দাদার পাশে অন্য ছোটো তারাটা কে বলো তো বাবাই? কে রে? ওটা পদ্মাপিসির শাশুড়ি। আমি হেসে ফেলি। পদ্মাদি, উজানের পদ্মাপিসি আমাদের পরিবারের গৃহপরিচারিকা। সম্প্রতি বৃদ্ধা শাশুড়ি মারা যাওয়ায় অশৌচ পালনের জন্য পদ্মাদি কাজে আসতে পারেনি বেশ ক-দিন। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, দুই বিরুদ্ধমতের পুরুষ কথা বলছেন, তর্ক করছেন। আর এক অনামা বৃদ্ধা চুপচাপ তাঁদের জন্য দু-কাপ গরম চা করে দিচ্ছেন। মৃত্যুর পরেও গৃহপরিচারিকার জীবন থেকে তাঁর মুক্তি হল না, এই ভেবে তিনি দুঃখিত হচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘশ্বাসে তারার আলো কাঁপছে।

সকালের বৃষ্টিধোয়া গঞ্জের বাজার। কাঁচা আমলকি একশো গ্রামের দাম পঁচিশ টাকা। অর্থাৎ, আড়াইশো টাকা কিলো। বেশ দাম! আমি আমলকি কোনোদিনই পছন্দ করতাম না তেমনভাবে। বাবা ভালোবাসতেন। দুপুরে খাবার পর আমলকি কেটে অল্প অল্প নুন ছুঁইয়ে খেতেন। মাকে দিতেন৷ আমাকেও জোর করতেন খাওয়ার জন্য। কখনো খেতাম, কখনো খেতাম না। আমলকি খাওয়ার পর এক গেলাস জল খেলে মুখটা মিষ্টি হয়ে যায়। আজ হঠাৎ আমলকি খেতে ইচ্ছে করল। বাবার স্মৃতি ক্রমশ ধূসর হচ্ছে। আমি খুব চেষ্টা করেও আজকাল আর মনে করতে পারছি না বাবার সবগুলো ওষুধের নাম। এক বছর আগেও যা ঠোঁটস্থ ছিল। অন্য দিকে আমি আস্তে আস্তে বাবার মতো হয়ে যাচ্ছি। সেই একইভাবে চুলে পাক ধরছে আমার। একইভাবে বাজার ঘুরে ব্যাগভরতি সবজি নিয়ে বাড়ি ফিরছি। বাবা প্রায় সব সবজিওয়ালা মাছওয়ালাদের নামে চিনতেন। তাঁদের বাড়ির খবরাখবর জানতেন। আমিও চিনতে শুরু করেছি অনেককেই। একটাই কারণ— বৎসরাধিক কোভিডকালে ও বাবার অবর্তমানে আমার বাজার যাওয়াটা অনেকটাই বেড়ে গেছে। সৌমেন সকালে ডিম বিক্রি করে৷ বিকেলে টোটো চালায়। গত লকডাউনে ব্যাবসা লাটে ওঠায় বাজারে মাছ নিয়ে বসেছিল কেউ কেউ। তাঁদের অনেকে এ-বছর ফিরে গেছে পুরোনো পেশায়। অটো বন্ধ ছিল যখন, সিনেমাহলের সামনে চিকেন তন্দুরের ঠেলা বসিয়েছিল রতন। বেশ সস্তা। ভালো রোজগারও হচ্ছিল। কিন্তু ওরা চিরকালের মার্কামারা বাম পরিবার বলেই নাকি তৃণমূল-নিয়ন্ত্রিত ব্যাবসায়ী সমিতি আনলকের শুরুতেই তন্দুর উঠিয়ে নিতে বলেছে, রতন সেদিনই বলছিল।

যে-কথা বলছিলাম, আমি বাবার মতো বুড়ো হয়ে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। আত্মা জলে ভেজে না, আগুনে পোড়ে না…। আত্মা বুড়ো হয় শুধু। ক্রমশ আমার হাঁটার গতি কমবে। শান্ত হয়ে আসবে হরমোন। মাঝেমধ্যে খিটখিট করব। ফুল সাউন্ড দিয়ে টিভি দেখব, এতটাই যে বিরক্ত হবে বাড়ির লোক। আর আমলকি খেতে ভালো লাগবে খুব। একশো গ্রাম ওজনে পাল্লায় চারটে মাত্র আমলকি। তাদের সবুজ শরীরে সবে হলুদ রং ধরেছে। আজ খাওয়া-দাওয়া সেরে অল্প নুন লাগিয়ে খাব৷ বসার ঘরে রাখা কাঠের চেয়ারটা ফাঁকা। সপ্তাহ মাস বছর গড়িয়ে যাচ্ছে। বর্ষা আসতে এখনও কয়েকদিন দেরি। একটুকরো অসময়ের মেঘ ঝুলে রইল শেষ দুপুরের আকাশে।

Categories
2021-June-Golpo গল্প

শমীক ষাণ্ণিগ্রাহী

সবাই মিথ্যে বলে

আমার লেখা এটা প্রথম গল্প। গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

আমার লেখা এটা প্রথম গল্প। তাই অনেক ভাবনাচিন্তা করে, সময় নিয়ে, দু-দিন অফিস কামাই করে লেখাটা শেষ করেছি।

প্রথমে গল্পটা আমি রিয়াকে পড়তে দিলাম।

রিয়া পড়ল। একবার দু-বার তিনবার। শেষে বলল, ভালো লেগেছে।

শুনে আমি খুশি হলাম। কথাটা বলতে রিয়া গতকাল রাত্রের রান্না বন্ধ রেখেছিল। এই কথাটা শুনতে আমাকে গতকাল রাত্রের খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে আনতে হয়েছে। যাইহোক গল্পটা রিয়ার ভালো লেগেছে।

গল্পটা বাবাকেও একদিন পড়তে বললাম।

পরদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কেমন লাগল?

বাবা ছোট্ট উত্তর দিয়ে বললেন, পড়ছি। তারপর হাঁটতে বেরিয়ে গেলেন।

তার পরদিন আবার জিজ্ঞেস করতে বাবা, পড়ছি। বলেই হাঁটতে বেরিয়ে গেলেন।

এভাবে একদিন দু-দিন তিনদিন করে করে পুরো সপ্তাহ কেটে গেল।

রোববার সকালের দ্বিতীয় দফা চা খেতে খেতে বাবা জানালেন গল্পটা তিনি পড়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগল? বাবা সেই আগের মতো ছোট্ট উত্তর দিলেন, ভালো। বলে খবরের কাগজে মন দিলেন।

গল্পটা বউয়ের ভালো লাগল

গল্পটা বাবার ভালো লাগল

গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

কয়েকদিন পর গল্পটা পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে পাঠালাম।

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম গল্পটা মনোনীত হবার জন্য।

অপেক্ষা করতে করতে একমাস কেটে গেল।

প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে, আমি কোনো গল্প লিখেছি। ভুলেই গেছি যে, আমার লেখা প্রথম গল্পটা আমি কোনো পত্রিকার দপ্তরে পাঠিয়েছিলাম।

রিয়া ভুলে গেছে আমার গল্পটা কখনো পড়েছে কিনা।

বাবা ভুলেই গেছেন আমি একটা গল্প লিখেছি বলে।

বাড়িতে একদিন চিঠি এল আমার নামে। আমার নামে চিঠি প্রায় আসে না বললেই চলে। যা আসে সব বাবার নামেই। যাইহোক চিঠিতে পত্রিকার সহকারী সম্পাদক জানিয়েছেন যে, গল্পটা তাদের মনোনীত হয়েছে। এবং সেটা জুলাই সংখ্যায় ছাপা হবে। পত্রিকা প্রকাশিত হলে যথা সময়ে লেখক কপি আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

গল্পটা ছাপা হবে জেনে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। সঙ্গে আরও একটা নতুন খবর।

গল্পটার জন্য আমাকে সাম্মানিক দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে আমি খুব খুশি। আমার লেখা প্রথম গল্পটা শহরের সেরা পত্রিকায় প্রকাশিত হবে।

রিয়া হাসি হাসি মুখে বলল, খুব ভালো খবর। টাকাটা পেলে আমাকে একদিন খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে।

বাবা শুনে বললেন, ভালো খবর। সামনের মাস থেকে তুমি তাহলে নতুন গল্প লিখতে শুরু করে দাও।

প্রথম গল্পটা লিখে আমি খুব মজা পেয়েছি।

গল্পটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।

আমি অপেক্ষা করছিলাম আমার দ্বিতীয় গল্পটার জন্য।

জুলাই এল। শহরে গরম বাড়ল। লোডশেডিংও বাড়ল। মিউনিসিপ্যালিটির সাপ্লাই জলের টানাটানি বাড়ল। হিসেব করে জল খরচ করার কথা বাবা বার বার মনে করিয়ে দিতে লাগলেন।

পত্রিকা প্রকাশিত হল। অতি উৎসাহে আমি বইয়ের দোকানে গিয়ে এক কপি কিনেই আনলাম।

সূচিপত্রে আমার নামটা জ্বলজ্বল করছে।

সামনের মাস থেকে আমাকে আরও নতুন গল্প লিখতে হবে।

আমি অপেক্ষা করছিলাম আমার দ্বিতীয় গল্পটার জন্য।

 

Categories
2021-June-Golpo গল্প

অনুপম মুখোপাধ্যায়

আন্ডারপাস এবং প্লাস্টিকের চেয়ার

বাড়ির কাছে একটা আন্ডারপাস। সন্ধ্যের পর সেটা একরকম শুনশান থাকে। মাথার উপর দিয়ে বিরাট বিরাট লরি যায়, বাস যায়, টেম্পো, ম্যাটাডোর, পিক আপ ভ্যান, ফিনফিনে মোটরবাইক যায়, রয়্যাল এনফিল্ড যায়। আন্ডারপাসের ভিতরে একঠায় একটা আলো জ্বলে থাকে, খাঁ-খাঁ করে। ওটা তৈরি হয়েছিল স্কুলের ছেলেমেয়েদের সুবিধার জন্য। এক বছরের উপর হয়ে গেল স্কুল বন্ধ।

কিছুদিন আগেও দেখতাম সন্ধ্যেবেলায় চেয়ার পেতে আন্ডারপাসটার মুখে একজন দশাসই পুরুষ বসে আছেন। বাড়ির সামনে। কিন্তু ওঁর বাড়ির লোককে ওঁর পাশে কখনো দেখিনি। একদম একা। বিরাট চেহারা। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে প্রায় সমান। ঘাড়টা ঝুঁকে থাকত বুকের উপর। একটা লুঙ্গি কোনোক্রমে কোমরে আটকানো। মাঝেমধ্যে পায়চারি করতেও দেখতাম, মনে হত কষ্ট করে পা ফেলছেন। আজ শুনলাম তিনি কয়েকদিন হল মারা গেছেন।

“স্ট্রোক?”

“না। কোভিড। বডি দ্যায়নি পুলিশ।”

ঠিক বিশ্বাস হল না। পাড়ার আর একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, “আরে ওর তো বিভিন্নরকমের প্রবলেম ছিল। হার্ট। কিডনি। সে-জন্যই গেছে।”

“পুলিশ বডি দিল না কেন?”

“সে পুলিশ আজকাল অমনই করছে। সন্দেহ হলেই কোভিড পেশেন্ট বলে বডি দিচ্ছে না।”

“সন্দেহ কেন? টেস্ট হয়নি?”

“অত জানি না।”

মৃত্যু এমনই একটা অবাক শূন্যস্থান তৈরি করে। আজ থেকে বছর কুড়ি আগে একটা দোকান থেকে রোজ রাত্তিরে সিগারেট কিনতাম। নিয়মিত অভ্যাস ছিল। একদিন দেখলাম দোকান বন্ধ। পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার? এর কি শরীর খারাপ-টারাপ?”

“মরে গেছে।”

“সে কী! কী হয়েছিল?”

“বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বিষ খেয়েছে।”

সেই চমক আমার আজও কাটেনি। দিব্য হাসিখুশি লোক। বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারে এটাই বিশ্বাস করা মুশকিল। সে ঝগড়া তো করলই, আবার বিষ খেল, মরেও গেল! সেই রাত্তিরে মাথার উপর তারায় ভরা আকাশটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল ওর দোকান থেকে কেনা আমার সব সিগারেটের আগুন যেন সেখানে জ্বলছে, ইয়ার্কি মারছে।

এখন আন্ডারপাসটার কাছে গেলে একটা ফাঁকা প্লাস্টিক চেয়ার চোখে পড়বে।

লোকটার ওজন ঐটুকু একটা চেয়ার কী করে রাখত, তখন অবাক হতাম, এখনও অবাক হয়েই ভাবছি।

সন্ধ্যেবেলায় একটু হাঁটতে না বেরোলে চলে না। লকডাউন চলছে। সব দোকানপাট বন্ধ থাকে। লোকজন রাস্তায় নেই। যারা মহামারিকে ভয় পায় না, তারাও পুলিশকে ভয় পায়। পুলিশের মার পুরোদমে চলছে শহরে। কোনো কিছু না ভেবেই তারা লাঠি চালিয়ে দিচ্ছে শুনছি। আমাকে বেরোতেই হয়। সন্ধ্যেবেলায় একটু বাইরের হাওয়ায় না বেরোলে দম আটকে আসে। যতই অসামাজিক হোক, আত্মবিধ্বংসী হোক, কিছু ক্ষেত্রে তো করার কিছু থাকে না।

আন্ডারপাসটা পেরিয়ে দেখলাম প্লাস্টিকের চেয়ারে আজ ভদ্রলোকের ছেলে বসে আছে। অশৌচের পোশাক পরে আছে। এরও চেহারাটা খুব মোটার দিকে। হয়তো একদিন বাবার মতোই ওবেসিটি ধরবে একেও। অমনই মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকবে, কষ্টেসৃষ্টে নড়াচড়া করবে।

একবার এই ছেলেটার সঙ্গে আমার রাস্তায় তর্ক হয়েছিল। হঠাৎ করে আমার মোটরবাইকের সামনে এসে হাজির হয়েছিল। আমি ব্রেক কষতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। ছেলেটা নিজের দোষ স্বীকার করেনি।

সেই থেকে এর সঙ্গে দেখা হলেই মনটা কিছুটা তেতো হয়ে যায়।

আজ তবু দাঁড়ালাম। বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে। ছেলেটা মুখে মাস্ক পরে নেই। বাড়ির সামনে রাস্তা থাকলেও সেখানে কেউ মাস্ক পরতে চায় না। বাড়ি আর নিরাপত্তা যেন দুটো অবিচ্ছেদ্য ধারণা।

বললাম, “খবরটা আমি আজ শুনলাম। উনি কি তাহলে কোভিডেই…”

“না না, বাবার অনেকরকমের অসুস্থতা ছিল। কোত্থেকে কোভিডের গুজবটা রটেছে কে জানে! আসলে এখন কেউ মারা গেলেই কোভিড ভেবে নিচ্ছে লোকজন।”

“তবে যে শুনলাম বডি… ইয়ে… দেহ দ্যায়নি পুলিশ!”

ছেলেটা বিরক্ত মুখে বলল, “কে বলল? আমি নিজে মুখাগ্নি করেছি। বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।”

“ওহো…”

আমি আর না দাঁড়িয়ে পা বাড়ালাম। আজ সম্ভবত ছেলেটার সঙ্গে তিক্ততা আরও বাড়ল। এরপর রাস্তাঘাটে দেখা হলে মুখটা আরও বিস্বাদ লাগবে।

ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। দু-পাশে বাড়িঘর পড়ছে। ভিতরে আলো জ্বলে আছে। কথাবার্তা আবছা শুনতে পাচ্ছি। রান্নাবান্নার আওয়াজ। টিভির শব্দ। রাস্তায় কুকুরগুলো এখন কেউ গেলেই মুখ তুলে দেখে নিচ্ছে লোকটা কে। এখন সন্ধ্যের পর থেকে সারা শহরের রাস্তায় কুকুরগুলোই প্রভুত্ব করে।

নদীর ধারে এসে পড়ল রাস্তাটা। একদম নির্জন। এখানে কুকুরও নেই। শুনশান হাওয়া দিচ্ছে একটা।

একটু কাশলাম। সেই শব্দ নদীর ওপার থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।

কী খেয়াল হল, হাততালি দিলাম।

নদীর ওপার থেকে হাততালিটা ফিরে এল।

জানতাম আসবে।

Categories
2021-June-Golpo গল্প

শুভ্র মৈত্র

একটি নিখোঁজ মেয়ের কাহিনি

ঠিকঠাক বলার জন্য আর একটু কাছে থাকার দরকার ছিল। মাঝে ঐ গাড়াটার জন্য তা সম্ভব নয়। স্থানীয় মুখে গাড়া, আসলে ছিল একটা খাঁড়ি। শোনা যায় একসময় নাকি কালিন্দ্রি নদী এই খাত দিয়েই বইত, তারপর লক গেট করে দেওয়ায় নদী আর নেই, শুধু খাতটা থেকে গেছে। এখন দূর থেকে দেখলে মজা লাগে।মানুষগুলি যেতে যেতে হঠাৎ হাপিশ, তারপর একটু বাদে হুশ করে ভেসে উঠল আবার। মানে ওই গর্তের মধ্যে নেমে আবার উঠে যাওয়া। গ্রামে ঢোকার মুখে এই গাড়া যেন মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে রেখেছে ওদের। মানে সবাইকে টাউনে যেতে নামতে হয়, আবার উঠতে হয়। গাঁয়ে ফেরার সময়ও তাই। জলের স্মৃতি শুধু ঝালিয়ে দেয় বর্ষার সময়। জল জমতে জমতে আস্ত একটা নদী হয়ে দাঁড়ায় যেন। সে-সময় রোডে যাওয়া খুব দিকদারি। এই গ্রামের মানুষ তা জানে। প্রথমে কয়েকদিন কাদা জল পার হয়ে, তারপর অঞ্চলের দেওয়া নৌকা। সেও তো আবার রমেশ ঘাটোয়ালের মর্জির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই খাঁড়ি এ গাঁয়ের সাথে জুড়ে আছে। যে-কারণে মানুষ চট করে বেরোতে পারে না, মানে টাউনে যাওয়ার জন্যও একটা আলস্য ঝাড়তে হয়। আবার ওই গাড়াটার জন্যই সহজে পুলিসও ঢুকতে পারে না। অবশ্য পুলিস এসেছিল সেই কবে, যখন রাসু-র বাবার গলাকাটা শরীরটা সকালে ওর নিজেরই দাওয়ায় দেখেছিল সবাই। পুলিস কে সেই উত্তর দিকের নঘরিয়া গিয়ে তারপর পিছন দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল গ্রামে। তাও নেহাৎ ধুলা ছাড়া কিছু ছিল না, নইলে জলের সময় কাদাতেই আটকে যেত গাড়ির টায়ার। ঐ বিরক্তিতেই বুঝি পুলিস আর আসে না, গাঁয়ের বিচার গাঁয়েই করে নেয় মানুষ।

তা ওই গাড়াটার জন্যেই পদ্মর মাকে ঠিকঠাক ঠাহর করা যায়নি। শেষমেষ কতদূর যেতে পেরেছিল পদ্মর মা, তা নিয়ে কেউই তেমন নিশ্চিত নয়। তবে মন্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য বাসে উঠতে পদ্মর মাকে দেখেছে এ-তল্লাটের বেশ কয়েকজন। “হামি কী কহ্যেছি তবে, পষ্ট দেখনু, পমিস এল, মেলাই ভিড়, তাও বুড়ি ঘুস্যে গেল”। মানে ওই ‘প্রমিস’ বাসের পা-দানিতে পা রাখা পর্যন্ত জামিলের স্বাক্ষ্যই প্রামাণ্য। তারপরে হেল্পার ছোঁড়া ওকে ভিতরে ঢুকিয়েছিল কিনা, বা কন্ডাক্টর বলেছিল কিনা পরের স্টপ নারায়ণপুরে জায়গা হবে, পদ্মর মা ওর ওই কাঁধের ঝাপসা ব্যাগটা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিনা রড ধরে, না বসতে পেরেছিল সীটে— সেটা কেউ বলতে পারে না।

তবে তপনা, মানে সুধা মাস্টারের ছেলে তপোধন, বলেছিল, “পদ্মর মা বাসে একবার পা ঠেকাতে পারলে, বসার জায়গাও পেয়্যা লিবে।” তা এই ঢিমে আঁচের সাঁঝবেলাতে তপনার কথায় আপত্তি করার মতো কিছু খুঁজে পেল না গণেশের চাটাইয়ে বসা মানুষগুলি। আসলে পদ্মর মাকে যারা চেনে— অবশ্য পাঁচকড়িটোলার কেই-বা ওকে চেনে না—সবাই জানে, রিলিফের ত্রিপল হোক বা চিড়া-গুড়, বা হাজরা বাড়ির কালীপূজার ভোগের মাংস— পদ্মর মা কখনো খালি হাতে ফেরে না। তূণে বুড়ির নানান অস্ত্র। প্রথমে ছেঁড়া শাড়িটা আরও খানিক ছিঁড়ে নিয়ে কান্নাকাটি, চোখের জল এমনিই আসে, কাজ না হলে পদ্মর নামে মানত চড়ানোর অজুহাত এমনকী স্বপ্নে পাওয়া আদেশও আছে পদ্মর মায়ের ব্যাগে। যত সব ঢ্যামনামি! মেয়েমানুষরা গলতে পারে, ব্যাটাছেলেদের জানা আছে এ-সব নাটক। কেউ পাত্তা দেয় না। অবশ্য না দিয়েই-বা উপায় কী? এর পরেই তো রাখা আছে ওদের জন্য শাপশাপান্ত। লাইনে ওর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তার বাপ ঠাকুর্দা যৌবনে ঠিক কী কী অনাচার করেছিল, বা কার বউয়ের স্বভাব কতটা খারাপ, ঠিক কতদিনের মধ্যে ওলাওঠা হয়ে মৃত্যু হবে তার— নাহ্, এর পরে আর ফিরে তাকাতে হয় না পদ্মর মাকে।

তা এহেন পদ্মর মা ভিড় বাসে উঠে ঠিকই বসতে পারবে এ নিয়ে খুব সন্দেহ প্রকাশ করার লোক পাওয়া গেল না। কিন্তু সংশয়টা অন্য জায়গায়, ঠিক সংশয় না বরং ভরসা বালা যায়। সদার মুখের বিড়ির ধোঁয়ার সাথে সেটাই বেরিয়ে আসে, “গাঁয়ের মাতব্বরি কী আর সবখানে চলব্যে? মন্ত্রী কি আর গাঁয়ের সুবল মেম্বার যে গেনু আর সরসরিয়ে ঘুঁস্যে গেনু!” এমনিতে সদার কথায় সায় দেওয়ার লোক হাতে গোনা, কিন্তু এই কথাটায় নড়ে উঠল অনেকগুলো মাথাই। আসলে কেউই চায় না সত্যি মন্ত্রীর কাছে যাক পদ্মর মা। নিজের চোখে মন্ত্রী দেখার অভিজ্ঞতা এখানে কারোর নেই ঠিকই, কিন্তু সবজি নিয়ে শহরের রাস্তায় বিক্রি করা তারিকুলকে তো জানাতেই হবে টাউনের হালচাল সে অনেক জানে, “মনতিরির সাথে দেখা করব্যে! হুঁহ, কতটি পুলিস থাকে মনতিরি এল্যে, জানা আছে?” মাথাগুলি আবারও নড়ল খানিক। তাতে অবশ্য জানা আছে না নেই তা ঠিক বোঝা গেল না। এটাও তেমন নিশ্চিত নয় যে, পুলিস দেখে পদ্মর মা খানিক থমকাবে কিনা। “আরে পুলিসের কথা ছেড়্যাই দাও, দুই দিনের জন্য মনতিরি জেলায় পা দেছ্যে, তার কত কাম! এ-সব প্যাঁচাল শুনার সময় আছে? ডাকব্যেই না”, আফতাবের সারুভাই নাকি টাউনের এক নেতার গাড়ি চালিয়েছিল কয় মাস, ফলে আফতাবের মতামতকে ফেলে দেওয়া যায় না। সবাই বেশ ভরসা পেতে চায়।

বুড়িকে পছন্দ করে না কেউ। করবেই-বা কী করে? একা মেয়েছেলে, তবু একটুও সম্ভ্রম আছে কারো প্রতি? সে মেম্বার হোক আর মাস্টার, কাউকে রেয়াত করে না পদ্মর মা। ডিলার যে ডিলার, সবাই এত তোয়াজ করে, পদ্মর মা যেন খড়গহস্ত, “ক্যানে পাব না ডাল? চাল মেপ্যে দিবা, কহ্যে দিনু!” কেউই সাহস করে তর্ক জুড়তে পারে না পদ্ম’র মায়ের সাথে, ফের কী থেকে কী বেরিয়ে আসে! ভয় শুধু সেটাই নয়, আসলে এই নিস্তরঙ্গ গাঁয়ে শেষ যে-ঘটনা ঘটেছিল, সেটাও তো এই বুড়ির সাথেই। আর সেটা নিয়েই এবারে মন্ত্রীর কাছে দরবার করবে পদ্মর মা।

পদ্মর মা নাকি এমন ছিল না কয়েক বছর আগেও। গ্রামের বয়স্করা বলে। তারাও কেউ পদ্মর বাবাকে দেখেনি, তবে পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত, যখন গাঁয়ের ইশকুলে যেত ও, জামাটা অত টাইট হয়নি, তখনও নাকি ওর মা মেয়ের জন্য দুধ চাইতে যেত ঘোষেদের বাড়ি মাথায় ঘোমটা দিয়েই। কেউ কেউ মুখ ঝামটা দিয়েও নাকি পার পেয়ে যেত। যেটুকু গালিগালাজ তা বরাদ্দ থাকত তা ওই পদ্ম আর ওর মরে যাওয়া বাবার জন্য। মেয়েকে নিয়ে কীভাবে চলতো পদ্মর মায়ের তা অবশ্য কেউ হলফ করে বলতে পারে না। চার কুড়ি পার করে দেওয়া হারানের ঠাকুমা বা সুকেশ জ্যাঠাও না— চলে যেত আরকী! দিন তো আর থেমে থাকে না, চলেই! কিন্তু এখন চাটাইয়ে বসা লোকগুলোর এ-সব কথা শুধুই শোনা। ওরা জানে পদ্ম যখন ইশকুল থেকে ফিরত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত পদ্মর মা, কোনো চিল শকুন যেন ভিড়তে না পারে। শুধু কি তাই, ছুটি হতে দেরি হলে সটান ইশকুলে গিয়ে হাজির হয় পদ্মর মা, “মিয়াছেল্যাদের ছেড়্যে দাও মাস্টার!” সব মেয়েদের কথা মুখেই বলা, আসলে পদ্মকে ছেড়ে দিক। সাধন-নিত্যদের স্পষ্ট মনে আছে, মাথায় প্রায় তাদের ছুঁয়ে ফেলা পদ্ম লজ্জা পেত।

সেবারের বৃষ্টিটাই সব ওলটপালট করে দিল মা-মেয়ের জীবনে। মণ্ডলবাড়ির ছাগল নিয়ে চড়াতে গেছিল পদ্মর মা, রোজকার মতোই। ফিরেও আসত ঠিক সময়েই মানে পদ্মর ইশকুল থেকে ফেরার আগেই, কিন্তু বৃষ্টিটাই সব ভণ্ডুল করে দিল। গাঁয়ের মাথায় পাকুড় গাছের তলায় ছাগল নিয়ে দাঁড়ানো পদ্মর মাকে নাকি বাড়ি ফেরতা অনেকেই দেখেছিল। তবে কিছু কথা হয়নি, ওই বৃষ্টির মধ্যে কী কথাই-বা হবে, সবার তো ঘরে ফেরার তাড়া। বৃষ্টি একটু ধরলে, মণ্ডলবাড়ি ছাগল ঢুকিয়ে, কাঁঠাল পাতা বাবুদের মুখের কাছে ধরে ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার। গাঁয়ের সব পথ মুখস্থ, অন্ধকারে যা কিছু নিয়ে গাঁয়ের মানুষ ভয় পায়, তারা অবশ্য তখনও পদ্মর মাকেই ভয় পেত। তাই ঘরে ফিরতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ঐ অন্ধকারে চোখে খানিক ঘোলা লেগেছিল বটেই। নইলে দাওয়ায় রাখা ডালের বড়ি যে ঘরে তোলা হয়নি, সে কি আর নজরে পড়ত না? পদ্ম আর তার মরা বাপের পূর্বপুরুষরা কি আর ছাড় পেত সেই সন্ধ্যায়?

ঘরে কুপি জ্বলেনি, সেটা টের পেয়েছিল পদ্মর মা। আর টের পেতেই “ক্যারে পদ্ম, কোন নাগরের জন্য ঘর আন্ধার কর‍্যে…?” বলে সম্ভাষণটা করতেই যাবে, কিন্তু গলাটা যেন তার আগেই চেপে ধরল কেউ। মনের ভিতর কু গাইল কেউ। শুধু ডেকে উঠতে পেরেছিল “পদ্ম…”। স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নরম ছিল সেই ডাক, পদ্মর শুনতে পাওয়ার কথা নয়, কেউই শুনতে পায়নি। কিন্তু পদ্মর মা নিজের বুকে নিজের ডাক শুনেছিল বার বার। সাড়া পায়নি।

বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর কাদা রাস্তায় ছপছপ করে পায়ের শব্দ শোনা গেছিল, বাড়ি ফিরেছিল আটকে থাকা মানুষ। বৃষ্টি থেমে গেলে মেঘগুলোর বড়ো গায়ে লাগে, ক্ষোভে গড়গড় করতে থাকে, ওই শব্দেই বোধহয় বড়ো মৌলবীর আজানের আওয়াজ শোনা যায়নি এ-পাড়া থেকে, তবে শাঁখের শব্দ শুনেছিল এই হাজরাপাড়ার মানুষ। শুধু পদ্মর মা যে-আওয়াজটা শুনতে চাইছিল, তা শোনা গেল না কিছুতেই। ঘরের ভিতর থেকে না, পিছনের জঙ্গল থেকে না, পায়ের সাথে লেপ্টে যাওয়া কাদার থেকে, পাকুড় গাছের ভেজা শরীর— পদ্মর গলাটা শোনা গেল না কোথাও।

গাঁয়ের মানুষ অবশ্য সেই জল কাদা ভেঙেও বেরিয়েছিল, খোঁজাখুঁজি করেছিল এদিক সেদিক। আর পদ্মর মায়ের সাথে হ্যারিকেন নিয়ে গেছিল ঠিক ছয়জন। খোঁজাখুঁজির ফাঁকে সবার মুখেই এসেছিল মেয়ের চালচলনের কথা। ঢলানি স্বভাবের কথা বলেছিল। বলেনি আরও অনেক কিছু, পদ্মর ময়লা জামার নীচে এর মধ্যেই উঁচু হয়ে যাওয়া বুকের কথা বলেনি, গায়ের সাথে সেঁটে যাওয়া ভেজা জামার নীচে খাঁজের কথা বলেনি, বেটি বলে ডেকে গায়ে হাত বোলানোর কথা বলেনি, পদ্মর সিঁটিয়ে যাওয়ার কথা— নাহ্, ভেবেছিল শুধু, মুখে বলেনি। জঙ্গলে, ঝোপের আড়ালে খুঁজছিল পদ্মকে, ওর বেমক্কা বেড়ে যাওয়া শরীরটাকে। খুঁজতে খুঁজতে গাড়ার কিনার অবধি এসে থমকে যায় সবাই। তখন অনেক জল। অবশ্য ডিঙিটা বাঁধাই ছিল ঘাটে। রমেশ ঘাটোয়ালকে বললে সে কি আর নফরকে ডিঙি খুলতে দিত না? কিন্তু কেউ আর সাহস করেনি। পদ্মর মা নিজেও কেমন থম্ মেরেছিল, হাঁটছিল খানিক ঘোর লাগা মানুষের মতো। আর মেয়েকে ডাকছে না, ওর হয়ে পদ্মর নাম ধরে ডাকার দায়িত্ব তখন ওই ছয়জনের। ডাকের তেমন জোর ছিল কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। কালকেও নিজের বউয়ের পাশে রাতে শোয়ার সময় কতজন পদ্মর ডবকা শরীরটাকে ভেবেছে, সেটাও যেমন জানা যায়নি।

শোনা যায় ঠিক তখনই নাকি ওই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটেছিল। ঘোরের মধ্যে চলতে চলতে গাড়ার কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পদ্মর মা, আর সবার মতোই। দাঁড়িয়ে ছিল অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে। হ্যারিকেনের আলোয় কয়েকজন দেখার চেষ্টাও করেছিল জলে কিছু ভাসতে দেখা যাচ্ছে কিনা। মানে পদ্মর ডবকা শরীরটা, উঁচু হয়ে ওঠা প্রাণপণ লুকিয়ে রাখা বুকদুটো, পায়ের উপর থেকে অনেকটা সরে যাওয়া ফ্রক— উঁকি মেরেছিল সবাই। আর ঠিক তখনই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পদ্মর মা। স্থির চোখে তাকিয়েছিল মানুষগুলোর দিকে। কেমন ছিল সেই চোখ, তা কেউ পরে বর্ণনা করেনি, তবে সেই দৃষ্টিতে নাকি এমন কিছু ছিল, যা মুহূর্তে স্থবির করে দেয় সবাইকে। সবার পা আটকে গেছিল মাটিতে, কিছুক্ষণ নড়তে পারেনি কেউ।

সব ঘোরই কেটে যায়। বাড়িও ফিরেছিল সবাই। কিন্তু ফেরার পথে কেউ কোনো কথা বলেনি। পদ্মর মাকে নিয়ে নয়, পদ্মর স্বভাব চরিত্র নিয়েও নয়। এমনকী নিজেদের মধ্যেও কথা বলেনি কেউ। সেদিন গাড়ার পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলির স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছিল। না, স্বাভাবিক বলতে যা বোঝায়, তা ওরা হতে পারেনি। ঘরের বউরা জানে, তাদের মরদরা সেই রাত থেকেই আর স্বাভাবিক হয়নি। সে-জন্য তারা পদ্মর মাকে দায়ী করে কিনা জানা না গেলেও, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই পদ্মর মা যে একা হয়ে গেল তা সবাই জানে। গাঁয়ের বাকি লোক যে কেউ পরদিন সকাল থেকে পদ্মকে খুঁজতে যায়নি, সেটার পিছনে ছিল ওই দৃষ্টিটা। সেই আবছা অন্ধকারে চোখ দেখতে পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু তবু ছয়জনই নাকি দেখেছিল পদ্মর মায়ের সেই ঘোলাটে চোখদুটো কী এক আশ্চর্য রং নিয়েছিল সেই রাতে!

কেউ আসেনি, কাউকে ডাকেওনি। কিন্তু সেই রাত থেকে যে-খোঁজটা শুরু হয়েছিল, সেটা থামেনি আজও। গ্রামের মানুষ জানে। এত বছর পরেও কোন মুলুকে কোন নতুন গুরুদেব এসেছেন, কে শুধু মায়ের কপাল দেখেই বলে দেবে মেয়ে কোথায়, কোন থানে মানত করলে নির্ঘাৎ ফল— পদ্মর মায়ের বিরাম নেই। থানা পুলিস তো সেই কবেই শেষ, আর যায় না। গ্রামে না আসার নানান অজুহাত দিয়েছিল পুলিস। টাউনের থানায় কোন পুলিস নাকি পদ্মর স্বভাব নিয়ে খারাপ ইঙ্গিত করেছিল, পদ্মর মা থানায় বসেই সেই ‘আবাগির ব্যাটা’-র বাপ মায়ের ঠিকুজি কুষ্ঠি খুলে বসে। পুলিসের আশা ছেড়ে দিতে হল, কিন্তু খোঁজ থামল না বুড়ির। গাঁয়ের মানুষের বাপ-বাপান্ত করা সেই যে শুরু হল, খোঁজ পাওয়ার নামে কত-না মুল্লুক ঘুরে বেড়ায় আজও। কোন কোন থানে যে মানত করেছিল বুড়ি, নিজেরও মনে নেই আর।

বছরের চাকা তো একবার ঘুরে থামে না, ঘুরেই চলে। সেই রাতে পদ্মকে খুঁজতে যাওয়া মানুষগুলির গায়ের চামড়া কুঁচকে আসে, কেউ কেউ মায়া কাটিয়েও ফেলে বউ বাচ্চা সংসার, গ্রাম— সব কিছুর। এত বছরে আর কেউ সেই রাতের কথা তোলেনি। ঝাপসা হয়ে এসেছে স্মৃতি। বগলের কাছে সেপ্টিপিন লাগানো ফ্রকে পদ্মর মুখ-চোখ সব আবছা হয়ে যায় সবার কাছে, উঁচু হয়ে ওঠা বুকদুটোও। শুধু পদ্মর মা এখনও খোঁজে, মাঝে মাঝে গ্রামের বাইরে যায় কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে, দুই তিনদিন দেখা যায় না। তারপরে একদিন আবার ভুস করে জেগে ওঠে গাড়ার ভিতর থেকে।

সেই বর্ষার পরে অনেকগুলি হা-ঘরে গ্রীষ্ম গেছে, গাড়ার জল শুকিয়ে নীচের ফাটা চামড়া বেরিয়েছে কতবার, সেই শুকনো গর্তে বাচ্চারা খেলার সময় লুকিয়েছেও কত! আবার ভরেও গেছে জলে। থইথই নৌকা। দু-একটা সরপুঁটি ছাড়া ভরা বর্ষাতেও কিছু দেয় না গাড়া। তবু পদ্মর মা ঘুরেফিরেই দোষ দিত এই গাড়াকে। আর মাঝে মাঝে অদ্ভুত চোখে তাকাত গাঁয়ের ব্যাটাছেলেদের দিকে। যেন ভেতরটা পড়ে ফেলতে চায়। দেখে নিতে চায় পদ্মর শরীরের একটুও দেখা যাচ্ছে কিনা কারো বুকের ভিতর।

নাহ্, পদ্মকে কে খেয়েছে তা এখনও বলেনি বুড়ি, কিন্তু পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার পরে কথা ফোটা ছেলেরাও মাঝে মাঝে নিজেদের দায়ি ভাবে ওই না দেখা বৃষ্টির রাতটার জন্য।

আধন্যাংটো বাচ্চার দল অবশ্য কোনোদিনই নিয়ম মানেনি, আর তাদের হিংস্রতারও কোনো পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে পিছনে ধাওয়া করে বুড়িকে ক্ষেপাত, ক্ষেপানো খুব সোজা, শুধু পদ্মর নাম বলতে হয়, আর তাতেই বুড়ি শাপশাপান্ত করে বাচ্চাদের বাপ-ঠাকুর্দা-সহ কয়েক প্রজন্মকে। তবে বেশিক্ষণ চলে না এই গালিবর্ষণ। বড়োরা দেখতে পেলে শাসন করে শিশুদের, ধমক দিয়ে নিয়ে যায় ঘরে। নিজের মনেই কথা বলতে বলতে একসময় শান্ত হয় পদ্মর মা।

এ-মুলুক সে-মুলুক ঘুরতে ঘুরতেই সেদিন খবর নিয়ে এল টাউনে মন্ত্রী আসবে। আসছে সোমবারের পরের সোমবার। গাঁয়ের কেউ জানে না। এমনকী সুবল মেম্বারও না। জানার কথাও না। মেম্বার শুধু মাঝে সাজে ঐ নঘরিয়া অঞ্চল অফিসে যায়। কিন্তু পদ্মর মা যাবে। দেখা করবে মন্ত্রীর সাথে। এ-সব কথা কেউ জিজ্ঞেস করে নি, বুড়ি নিজে থেকেই বলেছিল। রেশন দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে বলেছে, পুকুরে চান করতে গিয়ে বলেছে। সবাই জেনেছে। কিন্তু সাহস করে বলতে পারেনি, কী জিজ্ঞেস করবে মন্ত্রীকে। শুধুই কি পদ্মর খোঁজ নেবে না আরও কিছু নালিশ আছে গাঁয়ের লোকের বিরুদ্ধে। আর এত বছর পরে পদ্মকে পাওয়া গেলেও, ওকে চিনতে পারবে কেউ? গ্রামের কেউ প্রশ্ন করেনি, আসলে মন্ত্রী মানে কী ওরা জানে না কেউ। পুরোনো মানুষগুলি নেই, কিন্তু পুরোনো ভয়টা যেন ফিরে এসেছিল মন্ত্রীর নাম শুনে।

সন্ধ্যা আরও জাঁকিয়ে বসছে গ্রামের পশ্চিম কোণের আমগাছটার মাথায়।সাধন-তারিকুল-সদারা নিজেদের মধ্যে যে-কথাগুলো দিনের আলোয় বলাবলি করে—যেমন এ-বছর আমের ফলন, মাটি কাটার কাজ— এখন সেগুলো নেই। এই চাটাইয়ের আলাপ থাকে মেয়েছেলে আর গোপন ইচ্ছেগুলি নিয়ে। নিজেদের ঘরের পানসে বিবিদের কথা তুলতে চায় না কেউ। “মণ্ডলের ছোটোবিবির রস হয়েছ্যে খুব। মরদটা তো বিদেশ, ঝরাব্যি নাকি সদা?”, খ্যাক খ্যাক করে হাসে সবাই। মতিন মিয়াঁর বেওয়া বিটি বাচ্চাটাকে নিয়ে বাপের ঘরেই থাকে। সাধন নাকি নিজে চোখে দেখেছে কার্তিক গয়লার সাথে গুজুরগুজুর করে। “ক্যানে বে, গেরামে কি আমরা নাই? চান্স দিয়্যাই দেখুক না একবার!”, আবার হাসি। ক্রমশ গভীর হয় গলা।

টিনের মগ থেকে খুড়িতে ঢেলে দিচ্ছে গণেশ, “জামিলচাচা তোমার তিন খুড়ির দাম বাকী আছে কিন্তু!”— আব্বে, পেয়ে যাব্যি, হামি কি ভেগ্যে গেনুৈ ঠিকই তো, গনেশ ছাড়া সবাই মাথা নাড়ে। আর গনেশও জানে, এখন বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, বলতে নেই যে, এই এক কথা কতদিন ধরে শোনাচ্ছে জামিল। সকালেই চেয়ে চিনতে নিতে হবে। সবটাই যে পাওয়া যায় তা নয়, তবে খানিক লস ধরেই এ-ব্যাবসায় নামতে হয়। সম্পর্ক ভালো রাখা বেশি জরুরি। এই যেমন জামিলের ভাইই তো রেশনের চালটা জোগাড় করে দেয়!হিসাব কি আর গণেশ জানে না, এতদিন ধরে এ-লাইনে আছে! কাচের গেলাস তো কবেই বাদ দিয়েছে, এখন মাটির খুড়ি। প্রথম প্রথম আপত্তি উঠেছিল, কিন্তু তারপর তো অভ্যাসও হয়ে গেল সবার। “হ্যাঁ রে গণশা, এত ফিকা লাগছে ক্যানে? দুইটা টেনেও নেশাই জমে না”, সাধনের কথায় হাঁ হাঁ করে উঠল সবাই— “ঠিক ঠিক, একবারে ধক নাই। ফিকা!” গণেশ জানে এখন চুপ করে থাকতে হয়, প্রায় রোজই এই সময়টা এমন কথা ওঠে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারা সবাই বলবে, “নেশাই হল না” আর পরদিন সন্ধ্যা লাগতেই আবার এসে ভিড় করবে।

এতক্ষণ ধরে কেউ অবশ্য পদ্মর মাকে নিয়ে আর রা করেনি। বুড়ি যে মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে না, সেই বিশ্বাসটা অনেকটাই ঘন এখন। হেজে যাওয়া শরীরগুলোর উপর পড়ে থাকা ছেঁড়া কাঁথার মতো অন্ধকার নেমে এসেছে।

দূরে বড়ো রাস্তাটা দেখা যায়। ওখানে আলো আছে। মাঝে মাঝে এক-আধটা গাড়ি দাঁড়ায়, কাউকে নামিয়ে দিয়ে যায়। অবশ্য সন্ধ্যার পরে এই স্ট্যান্ডে নামার লোক প্রায় থাকেই না।

— “ক র‍্যে জগা, উঠব্যি না?”— হ্যাঁ রে এই তো এইটা মেরেই উঠি। অবশ্য দু-জনের কারো মধ্যেই ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। গণেশ জানে, এখন তিন চার বিড়ি ধরে চলবে এই উঠি উঠি খেলা, চাটাই খালি হতে হতে পিছলি বিলে শেয়ালের ডাক।

শেষমেষ ঘরের দিকে রওনা দেয় সবাই। গণেশের চট খালি হল। এদিকে আলো নেই, তাতে অবশ্য বয়েই গেছে ওদের। সদারা সবাই গন্তব্য জানে। ঘরে কুপি জ্বালিয়ে বসে আছে বউ, ভাতের মতো ঠান্ডা। জড়ানো গলায় আফতাব ধরে, “বলম পিচকারি যো তুনে মুঝে মারি…” টাউনের হলে হিন্দি বই দেখার নেশা আছে ওর। পা খুব সোজা পড়ছে না কারো। তাতে অবশ্য অসুবিধা নেই। মুখস্থ এই গাঁয়ের রাস্তা। ঐ সামনের পাকুড় গাছটা থেকে তারিকুলরা উত্তর দিকে চলে যাবে। এদিকে বাড়ি ঘর খুব বেশি নাই। মাঠের মধ্যে দিয়েই আসছিল সবাই এতক্ষণ। শর্টকাট। এবার রাস্তায় উঠবে। রাস্তায় উঠেই কচুর ঝোপের এই জায়গাটায় এসেই সবার একসাথে পেচ্ছাপ পায়… ছড়ছড়…। ছোটোবেলার কাটাকুটি খেলার কথা তোলে সাধন, একসাথে হেসে ওঠে সবাই। “তোর অজগর তো একবারে ঢোঁড়্যা হয়্যে আছে বে, ঝিম ধরা, মুত ছাড়া আর কিছু নাই”, আবার খ্যাকখ্যাক হাসি। ফিকে চাঁদ আকাশে, কোনো শব্দ নেই কোথাও। মুখ দেখা যাচ্ছে না কারো, একটা ছায়া। দূর থেকে রোডে এখনও দু-একটা আলো দেখা যাচ্ছে, আসলে শহরের ঘড়িতে এখনও সন্ধ্যা, গ্রামেই রাত। কেউ আর বাড়ির বাইরে নেই। অনেকের এতক্ষণে একঘুম সারা।

গণশের ঘর থেকে ফেরা ওদের মনে অবশ্য রঙের কমতি নেই। “আফতাবের ঘোড়া পুরা রেডি, বিবিকে নিদ পারতে দিব্যে না”, আবার হাসি। “আব্বে ছাড়, সেই ধক নাই আর বিবির। পদ্মর মতো ডাঁশা মাল কি আর আমাদের নসিবে জুটবে?” সেই পদ্ম চলে এল আবার। কেউ দেখেনি, তবু আসে। ওই বুক, থাই, শরীরের খাঁজ সব আসে ওদের চোখে। অনেকদিন আগে দেখা, বা না দেখা, শরীরটা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ওদের। দিনের আলোয় আসে না, আসতে দেয় না, কিন্তু রাতের এই ছমছমে আবছা অন্ধকারে এসে ঘাই মারে বুকের ভিতর। “গেরামে আর তেমন মাগী কোথায়?” আর্তনাদের মতো শোনায় জগার গলা। কী একটা উড়ে গেল পাকুড় গাছটা থেকে। রাতজাগা কোনো বাদুড় হবে বোধহয়। কেমন শিরশির করে ওঠে সবার। এতক্ষণের খুশি ভাবটা হঠাৎ উধাও। চুপ করে গেছে সবাই। মুখে কিছু বলে না কেউ, কিন্তু ঘরের রাস্তাটা আজকে যেন বেশিই লাগছে, কীভাবে যেন পায়ে জোর আনার চেষ্টা করে সবাই। ঝিঁঝির ডাক আরও জোরে বাজছে কানে।

— “আব্বে, সদা… কে ব্যে ওটা?”— সাধনের জড়ানো গলাতেও কী যেন ছিল। শুধু ওর হাত অনুসরণ করেই সবার চোখ আটকে গেল সামনে। গাড়া থেকে উঠে আসছে একটা শাড়ি পড়া শরীর, কাঁধে ব্যাগ। স্পষ্ট দেখা না গেলেও বলতে হবে না ওটা কে। উঠে আসছে, যেমন করে হাঁটে। ঘাড় তেড়িয়ে একবগ্গা। কাছে আসছে ক্রমশ। দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই, কেউ আর এগোতে পারছে না। চোখটায় নজর আটকেছিল সবারই। একটা অদ্ভুত রং, এই দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। সদা’র পা’টা বোধহয় আটকে গেল। সারাদিনের ভ্যাপসা গরম ভাবটা আর নেই। কেমন একটু শীত শীত করছে। আফতাব-তারিকুল কেউ কারো দিকে তাকায়নি, নইলে দেখতে পেত, মাটিতে পা বসে গেছে সবারই। বুকের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। সাধনের জিভে নোনতা স্বাদ, বমি হওয়ার আগে যেমন হয়। এগিয়ে আসছে ওই মূর্তিটা গ্রামের দিকে, ওদের দিকে। সদারা এই রাতে ছয়জন, হাতে লণ্ঠন নেই শুধু…।

Categories
2021-June-Golpo গল্প

দেবকুমার সোম

প্রতিটা খুনই আসলে রাজনৈতিক

হোম মিনিস্টারের মোবাইল ফোনটা কাকে ডাকাতি করেছে। রোববার সকাল। শীতরোদের আমেজ নিতে ব্যালকনিতে নিউজপেপার আর গরম চা নিয়ে মন্ত্রীমশাই বসেছিলেন। পাশেই ছিল অ্যান্ড্রয়েড ফোন। ব্যালকনির গ্রিল ছিল খোলা। তিনতলার ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের ব্যালকনি ঘোঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাশের আবাসনের নধর নারকোলগাছ। মন্ত্রীর মন ছিল কাগজ আর চায়ে। এর মধ্যে সুযোগ বুঝে ধাঁ করে নারকোলগাছ থেকে উড়ে এসে কাকটা মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে গেল। গেল, গেল, গেল। ধর, ধর। হোম মিনিস্টার চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর তীব্র চিংকারে ভয় পেয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন তাঁর গিন্নি। ছেলেটা তখনও বিছানায় ল্যাদ খাচ্ছিল। সেও তড়াক লাফিয়ে এক ছুটে ব্যালকনিতে। মন্ত্রীর বউমা মনযোগ দিয়ে হাতে নেলপলিশ লাগাচ্ছিল। শ্বশুরের আর্তস্বরে তার হাত থেকে নেলপলিশের শিশিখানা পড়ে গেল। সে সোফা থেকে ঘাড়টা জিরাফের মতো দীর্ঘ করে একবার বোঝার চেষ্টা করল। মন্ত্রীর পাঁচ বছর বয়সের নাতি,— সেও ছুটে এল বাথরুম থেকে হেগো পোঁদে।

সকলেরই চোখ গোল গোল। মাগো! এও কি কেউ কখনো শুনেছে? কাকে চামচ চুরি করে, ছুরি চুরি করে, তা বলে মোবাইল! তুমি এত বেখেয়ালে থাকো কী করে? তোমার চোখের সামনে থেকে কাকটা মোবাইলটা তুলে নিয়ে গেল। মন্ত্রীর বউ আর পাঁচজন বাঙালি বউ থেকে পৃথক নন।

আর নিল তো নিল, একেবারে ধাঁ। বাবা, ইউ আর নো মোর আ সাধারণ পারসেন। তুমি এখন হোম মিনিস্টার।

তাহলে বল এখন লোকের কাছে মুখ দেখানো যাবে? ছেলের কথায় মা জনসমর্থন পান।

মন্ত্রীমশাইয়ের বিরক্ত বোধ হয়। মালটা চুরি হয়ে গেল, আর তোমরা দাঁত ক্যালাচ্ছ! তাঁর মাথা ঠিক থাকে না। আর থাকবেই-বা কী করে? ফোনের মধ্যে কত কী যে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যের সব নেতা-নেত্রীদের গোপন হোয়াট্সঅ্যাপ। শিঞ্জিনির কিছু হট ছবি। পানু ভিডিয়ো। অনেকগুলো গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইল্স। সবচেয়ে বড়ো কথা ডকুমেন্ট। প্রচুর ডকুমেন্ট। হায় হায় কারো হাতে পড়লে কী হবে। দাদু, তুমি তো পুলিশ মন্ত্রী। গুলি ছুড়তে পারলে না: নাতিটা মন্ত্রীমশাইয়ের হাত ধরে টান দেয়। বউমা, ও বউমা, দেখছ না তাতান হেগো পৌঁদে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে ছুচিয়ে দাও। মন্ত্রীগিন্নি চিল্লে ওঠেন।

কাকটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। নারকোলগাছের লম্বা লম্বা পাতার মধ্যে ওর বাসা। সেখানে সেঁদিয়ে গেছে। মন্ত্রীমশাইয়ের ছেলে তার ফোন থেকে ফোন করে। মন্ত্রীর ফোনটা বেজে যায়। ওঁ জয় জগদীশো হরে। সোয়ামি জয় জগদীশো হরে। ওঁ জয় জগদীশো হরে। ব্যালকনি থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ফোনের চিৎকারে কাকটা তার পাতাঘেরা বাসার বাইরে আসে।

ওই তো। ওই তো হারামজাদাটা। নামা মালটাকে। হোম মিনিস্টার খেঁকিয়ে ওঠেন।

কিন্তু কে নামাবে? কাকে নামাবে?

তখনই চাঁদুদাকে বলেছিলাম, ও-সব নারকোলগাছ-টাছ হাটাও। তুমি তখন শুনলে না আমার কথা। এবার বোঝো। ছেলে সুযোগ পেয়ে পুরোনো ঝাল ঝাড়ে।

হ্যাঁরে হারামজাদা। তোর চাঁদুদা ফ্ল্যাট তৈরি করতে গিয়ে পাশের বাড়ির নারকোলগাছটা কাটত আর গাছ খুন করার দায়ে আমার পোলিটিক্যাল কেরিয়ারটা মায়ের ভোগে যেত। এই যে ঘরে বসে বেকার ফুটুনি ঝাড়িস, তখন পারতিস ম্যাও সামলাতে। শালা, ছেলে না অপজিশন পার্টির লোক। দাদু, ওই কাকটাকে চিনতে পেরেছ? তাতানের ফের মঞ্চে প্রবেশ। গত মাসে ওর বাসাটাতেই আমরা গুলতি মেরেছিলাম।

কাকপরিবারের সঙ্গে হোম মিনিস্টারের ঝামেলা নতুন নয়। এখন যেখানে আবাসনটা দাঁড়িয়ে আছে একসময় সেখানে পুকুর ছিল। পুকুর পাড়েই অন্য গাছেদের মধ্যে ছিল এই নারকোলগাছটা। প্রমোটার চাঁদুদা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে ক্রমে পুকুর ভরাট করে বিল্ডিং তোলেন। হোম মিনিস্টার প্রায় জলের দামে বারোশো স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট পেয়ে যান। কিন্তু তাঁর পড়শি থেকে যায় নারকোলগাছসমেত কাক পরিবার। অনুমান এই কাক পরিবারটা উদ্বাস্তু নয়। আর তারা উদ্বাস্তু হতেও চায় না। ফলে প্রথম থেকেই দু-তরফেই আকচা-আকচি শুরু হয়। মানুষগুলো উড়ে এসে জুড়ে বসায় শুরু হয় অন্তর্ঘাত। মন্ত্রীমশাইয়ের স্ত্রী ব্যালকনিতে ফুলের টব রাখলে কাকগুলো বিনা প্ররোচনায় উড়ে এসে ফুল ছিঁড়ে নষ্ট করে। রোদে বাসন শুকাতে দিলে চামচ-ছুরি উধাও করে দেয়। কাকের জ্বালাতন থেকে বাঁচতে ব্যালকনিতে লোহার গ্রিল লাগানো হল। ফলে কাকেরা সপরিবারে চিৎকার আর লাফান-ঝাপান শুরু করে দিল। সুযোগ পেলেই চোরাগোপ্তা গেরিলা ফাইট চলতেই থাকল। ফলে দাদু আর নাতি শঠ করে একদিন একটা গুলতি জোগাড় করলেন। ছাদে উঠে এলোপাথাড়ি গুলতি চালিয়ে কাকের কিছু ডিমও ভাঙলেন। এমন রাষ্ট্রবাদী প্রতিঘাতে কাকেরা মুষড়ে পড়েছিল। আজ আবার বেশ কিছুদিন পরে চরম আঘাত।

হোম মিনিস্টারের চিৎকার-চেঁচামিচিতে তাঁর দেহরক্ষীরা ফ্ল্যাটে চলে এল। মন্ত্রী নির্দেশ দিলেন, একটা লোক জোগাড় করতে যে কিনা ভালো গাছি। সে নারকোলগাছে উঠে মোবাইলটা কাকের বাসা থেকে উদ্ধার করে আনবে। কিন্তু শহরে হুট বলতে গাছি পাওয়া যাবে কোথায়? খবর ছুটল ওলা-উবেরের বেগে। শেষে লোকাল থানার বড়োবাবু একটা ক্ষীণজীবী লোককে ধরে নিয়ে এলেন। একে কোথ থেকে পাকড়াও করলেন। মন্ত্রী বেশ অবাক।

আর বলবেন না ছ্যার। থানার লক্-আপে ছিল। ছিঁচকে মাল। তবে ভালো গাছি। বড়োবাবু বুক ফুলিয়ে জবাব দেন। এই কেষ্টা এই নারকোলগাছটার মগডালে উঠে ছ্যারের মোবাইলটা ফিরিয়ে আন।

দেখিস বাবা, সাবধান। কাকগুলো বড়ো খচ্চর। হোম মিনিস্টারের সাবধান বাণী। তবে গাছি লোকটা যতই করিৎকর্মা হোক, কাকের সঙ্গে পেরে ওঠে না। তাকে গাছে উঠতে দেখে প্রথমেই তারা পিরিচ-পিরিচ করে ও ছড়াতে লাগল। লোকটার খালি গায়ে সাদা সাদাটে-হলদে গুয়ে ভরতি হয়ে গেল। লোকটা তবুও অদম্য। তাকে কাছাকাছি উঠে আসতে দেখে কাক পরিবার সাঁ করে নীচে নেমে লোকটার চোখ খুবলে নিতে চাইল। পিঠে নখের আঁচড়ে রক্ত বইয়ে দিল। লোকটা দক্ষ। কিন্তু এমন গেরিলা ফাইটে সে দিশেহারা হয়ে ওপর থেকে ঝুনো নারকোলের মতো ধপ্ করে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। ফলে ফের আর একটা কেলেঙ্কারি। মিডিয়া জানলেই চিত্তির!

ঘণ্টা খানেক ভালো মতো শুশ্রূষা করার পরে লোকটাকে ফের লক্-আপে চালান দেওয়া গেল। পার্টির ছেলেরা এর মধ্যে খবর পেয়ে গেছে। তারা দল বেঁধে এসে নারকোলগাছটাকে গোড়া থেকে বাঁকাতে লাগল। উদ্দেশ্য ঝাঁকুনির চোটে যদি ফোনটা নীচে পড়ে।

শালা, গান্ডু আর কাকে বলে। রাগে ফেটে পড়েন হোম মিনিস্টার। ওরে শুয়োরগুলোকে কেউ বোঝাও অত ওপর থেকে পড়লে আমার ফোনটার আর কিছু থাকবে না।

দাদা, ফায়ার বিগ্রেড ডাকব? পার্টির তরুণ-তুর্কি নেতা কানের কাছে ফিশফিশ করে।

কেন ভাই! হোম মিনিস্টার ঘাবড়ে যান। আমার পোঁদে কি আগুন লেগেছে? না, ছোটোবেলায় টিনটিন কমিক্সে পড়েছিলাম, কুট্টুস এমন তিনতলায় আটকে যেতে ফায়ার বিগ্রেড এসে তাকে উদ্ধার করে। আমাদের কুটুস নেই, মোবাইল আছে।

এই কে আছিস, এই আঁতেলটাকে হাটা তো এখান থেকে।

দেখতে দেখতে সূর্য মাথার ওপরে উঠতে থাকে। নারকোলগাছের ছায়াও ক্রমে ছোটো, আরও ছোটো। কাকগুলো মোবাইল পাহারা দিচ্ছে। বাসা ছেড়ে নড়ার নাম নেই।

স্যার, আমি একটা ডিভাইস ইনভেন্ট করেছি। মন্ত্রীর সেক্রেটারি আই.এ.এস. বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকস ছাত্র ছিলেন। হোম মিনিস্টারের পড়াশুনো খুব বেশি দূর নয়। ফলে লোকটাকে এড়িয়ে চলতেই তিনি পছন্দ করেন। তবুও সেক্রেটারির কথায় তাঁর চোখ চিক্ চিক্ করে ওঠে।

ডিভাইসটা আর কিছুই নয়, দুটো লম্বা বাঁশকে পরপর দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। তার এক মাথায় বেশ বড়ো একটা মেটালের আঁকশি। অনেকটা মানুষের পাঁচ আঙুলের থাবার মতো। কৌশল হল, বাঁশটা নারকোলগাছে কাকেদের বাসা বরাবর নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর আঁকশি দিয়ে সম্পূর্ণ বাসাটা তুলে আনা হবে।

পরিকল্পনা দেখে সকলেই ফের উৎসাহী হয়ে ওঠে। প্রথমে ছাদ থেকে। তারপর বারান্দা থেকে অনেকবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দেখা যায় দুটো বাঁশ জোড় দিয়েও কাকের বাসার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাকুল্যে পাঁচটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাঁশ বাঁধা হয়। তারপর কাকের বাসা অবধি যখন আঁকশি পৌঁছাল, ততক্ষণে মড় মড় শব্দ উঠেছে। বাঁশের বাঁধন পলকা হয়ে গেছে। সেক্রেটারি আই.এ.এস. ফলে ফের তিনি ত্রুটিগুলো ঠিক করলেন। আবার আঁকশি ওঠানো গেল। কিন্তু এতদূর থেকে আঁকশিতে বাসা তুলে আনা গেল না।

শালা বিজ্ঞানের ব জানে না বালের সেক্রেটারি হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা পেছন থেকে ফুট কাটে। ডাইনামিক্স পড়েছে! পলিটিক্যাল সায়েন্স আর ফিজিক্স এক হল!

মরার আগেই যার মড়ার খবর করে দেয়, সেই মিডিয়াকূল এর মধ্যে এসে হাজির। আজ বিকেলে হোম মিনিস্টারের একটা প্রেস কনফারেন্স রয়েছে। গত পরশু পুরুলিয়ায় ফসলের দাম না পাওয়া চাষিরা হাই-ওয়ে আটকালে পুলিশের গুলিতে তিনজন মারা যায়। বিরোধীরা হোম মিনিস্টারের রেজিগনেশন দাবি করেছে। আজকে বিকেলে সেই নিয়ে প্রেস কনফারেন্স। তারপর সন্ধ্যেবেলায় টিভি চ্যানেলে প্যানেল ডিসকাশন। আবাসনের ভেতরে দু-চারটে ওবি ভ্যান আর বুম হাতে ছেলেমি মেয়েগুলো হামলে পড়েছে। চলছে লাইভ টেলিকাস্ট। সঙ্গে রানিং কমেন্ট্রি। এরই মধ্যে একটা চ্যানেল আবার স্টুডিয়োতে কিছু আঁতেল জোগাড় করে ঘটনার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক, মানসিক এবং যৌবিক বিশ্লেষণ শুরু করেছে। পায়ে পায়ে পার্টির নেতারাও এসে হাজির। এত লোকের জন্য চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করতে প্রমোটার চাদু আর তাঁর সিন্ডিকেটের লোকজনের হাঁপ ধরে গেল।

এভাবে দেখতে দেখতে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিমে। কিন্তু বিজ্ঞান, ঝাড়-ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রপতঞ্জলিতেও না উদ্ধার হল হোম মিনিস্টারের মোবাইল ফোন। না পারা গেল কাকেদের অবস্থান ধর্মঘট থেকে সরাতে। ফলে, একে একে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ও নিয়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা ক্রমে কেটে পড়লেন। হোম মিনিস্টার আজ সকাল থেকেই গৃহবন্দি। মাঝে একবার মুখ্যমন্ত্রীর ফোন এসেছিল। তিনি খিস্তি করে মা-বোন এক করে দিয়েছেন।

ফলে সকলে চলে গেলে মন্ত্রীমশাইয়ের আবাসন ফের স্বাভাবিক হয়ে আসে। সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পরে হোম মিনিস্টার ক্লান্ত, হতাশ, রিক্ত তাঁর বারোশো স্কোয়ার ফুটের ভূগোলে ফিরে আসেন।

সারাদিন এ তাকে, সে একে বিস্তর দোষারোপ করে পরিবারের সকলেই এত ক্লাস্ত আর নতুন কোনো প্রসঙ্গ উঠে আসে না। সারাদিন প্রায় খাওয়া-দাওয়া হয়নি। ছেলে হোটেল থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসে। সকলেই আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। সারাদিন নারকোলগাছ-নারকোলগাছ করে হোম মিনিস্টারের মাথা এখন ঘুরছে।

রাত তখন ঠিক কত জানা নেই। হঠাৎ কাকের চিৎকারে হোম মিনিস্টারের ঘুম ভেঙে যায়। ধড়মড় করে বিছানায় জেগে ওঠেন। নাইট ল্যাম্পের আলোয় দেখেন তাঁর স্ত্রী খুব কুৎসিংভাবে ঘুমিয়ে। কাকটা ব্যালকনি থেকে ডাকছে। তিনি উঠে যান। এ কি সকালে যেখান ফোনটা তুলে নিয়েছিল কাকে, সেটা সেখানেই! কাকটা তাহলে এত কাণ্ড করে শেষমেষ ফেরত দিয়ে গেল। তিনি খুব দ্রুত হাতে তুলে নেন মোবাইল ফোনটা। সুইচ্ড অফ। অন করার জন্য সুইচ টিপতেই অন্ধকার ব্যালকনি আলো ঝলমল করে ওঠে। সেই ঝলমলে আলোর ছিটে লাগে হোম মিনিস্টারের দু-চোখে। কিন্তু এ কী! ফোনটাকে রি-সেট করে দিয়েছে। না আছে মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যের সব নেতা-নেত্রীদের গোপন হোয়াট্সঅ্যাপ। শিঞ্জিনির হট ছবিগুলো। পানু ভিডিয়ো। গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস। কিংবা ডকুমেন্ট। মন্ত্রীমশাইয়ের ফোন ফ্যাকটরি রি-সেট হয়ে গেছে। কেবল স্ক্রিন সেভার হিসেবে স্ক্রল হচ্ছে গোটা গোটা বাংলায় লেখা একটা বাক্য— প্রতিটা খুনই আসলে রাজনৈতিক।

Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

অর্ঘ্যকমল পাত্র

ধ্রুপদী

আমার বন্ধুরা কত কথাই বলে, তোমাকে দেখলে
তোমার বন্ধুরা কত কথাই বলে, আমাকে দেখলে

অথচ,
আমি তোমাকে দেখলে চুপ
তুমি আমাকে দেখলে চুপ

আমাদের বন্ধুরা কত কথাই না বলে
আমাদের দেখলে…

অপেক্ষা

সে আসতে পারে শেষ মুহূর্তে—
এই কথা ভেবে
আমি মুহূর্তকে আর-ও দীর্ঘ করে রাখি

যে-কোনো মুহূর্তে সে আসবেই—
এই কথা ভেবে
আমি মুহূর্তকে বড়ো বেশি ছোটো করে ফেলি

এবং এর ফলে
মুহূর্তেরা ভেঙে যায়
টুকরো করে আমাকে!

অসুখ

যে-বৃষ্টি তুমি চেয়েছিলে
যে-বৃষ্টিতে তুমি ভিজেছিলে সারারাত

সে-বৃষ্টিকে চোখেও দেখিনি আমি।
আমি কেবল চেয়েছিলাম
তার গন্ধ…
এই
এবং বৃষ্টির গন্ধে
ঘুমিয়ে পড়েছি সারারাত…

তৃতীয় বিশ্ব

পাহাড়ের গল্প মাঝেমধ্যেই শুরু হয়
পাহাড়ের গল্প কোনোদিনই শেষ হয় না

এবং যাদের কোনোদিন-ই
কোনো পাহাড় দেখা হয়নি
পাহাড়ের গল্প শুনে
তাদের ভিতরে ভিতরেও

একটা বিশাল পাহাড় জেগে ওঠে

যে-সব আর কিনে দেওয়া হল না

চুড়ি
শুধুমাত্র শৌখিন সৌন্দর্য
বেশিদিন থাকে না

ভেঙে যায়। চুরমার…

টিপ
সংস্কারে বিশ্বাস নেই। জানি।
অসতর্কতার মতো পুনরাধুনিক তুমি

অগত্যা তোমার কপালে
পরিয়ে দিতে চাই না— আমার চিহ্ন

কাজল
এ যেন তোমার
উতলা চোখের বালি।

কোনো কোনো ঢেউ আসে
ঘেঁটে দেয়…

লিপস্টিক
সে তো
ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া মেজোবোন

শুধু গান ধরলেই
উজ্জ্বল লাগে সব কিছু!

Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

রাজর্ষি দে

ওবিচুয়ারি

আমি শুধু মুছে গেছি জলে
অমেয় বালি দানা ঝরে গেছে ঘড়ি থেকে
বালি পড়ে কিচকিচ দৃষ্টি ঝাপসা হল কার
তার হদিস তত্ত্বতালাশ আপাতত থাক
অযথা বোঝা ভারী করে কাঁধ

সমাহিত বিকেলের দিন ঢলে গেল কবে
কবে?
সে-হিসেব রাখিনি তো
হঠাৎ জানালায় চোখ গেলে
বুক খাঁ-খাঁ করে ওঠে
ফেরিওয়ালা ডেকে গেলে মনে পড়ে
কার কার ডাক ফাঁকি পড়ে গেল

বন্ধুরা ভালো আছে
আত্মীয়পরিজনও
নিশ্চয়ই
অবশ্য ডিসেম্বর হতে হতে কত স্বজন ঝরে গেছে
সে-হিসেব রাখেনি দশ-পাঁচের খাতা
আজ বটতলা একা
টর্চ ফেলে দেখি
শেষ পত্র যাই যাই করে

তবু
টেবিলে পেনটা পড়ে আছে
আলমারি ঝাড়লে
এখনো দু-তিনটে শখের জামা পাবে
সূদুর কাপ্তানির অবশেষ—
দু-সাইজ ছোটো জিন্স
এইভাবে জঞ্জাল পোষে কেউ?
ফেলে দাও, ফেলে দাও
সব দিক শান্তিকল্যাণ হোক

মারিজাতক পঙক্তিগুচ্ছ

এ অদ্ভুত অন্ধকারে একলা আলো দিচ্ছে চিতা
*
জলে যার লাশ ভেসে গেল তার ছিল সাঁতারে অনীহা
*
শ্বাসের মূল্য মিটিয়ে দিতে ভাতের ভাঁড়ারে চাবি
*
মুখোশ পরা নিষ্কলঙ্ক হল্
*
যে-কোনো স্পর্শ স্যানিটাইজ করে নাও
*
সন্তান মরে গেলেও বিড়ম্বনা বাড়ে

লিপ টু লিপ

শ্বাস না পেলে নীল লাগে
দৃষ্টি বিন্দু হয় নক্ষত্রের মতন
ধ্রুবতারা ফিশফিশ করেছে শ্বাপদের কানে
এইবারে সভ্যতা ঝরে যাবে প্লাস্টার হয়ে
স্যান্ড-পেপার ঘষা হাপরের ডাকে
ক্ষুৎপিপাসাও দূরে যায় (দারাপুত্র এ-ক্ষেত্রে অলীক)

একটু হাওয়া ছাড়ো প্লিস
অন্তত এই অজুহাতে, হয়ে যাক লিপ-টু-লিপ

দু-হাত রেখেছি মাটিতে

বিষ শুষে নিই কানা চোখে
বিশ-আঙুল শিকড় বুনি
চতুষ্পদ কুকুরের ধারা
জ্বর পেটে চাঁদ খেয়ে নিই

চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়

হাড়মাস খেয়েছিস শালী
আমিও ছিঁড়েছি নাভিডোর
কে কাকে খেয়েছি আগে পিছে
মাংসের গুণ মাপা হোক

পোয়াতী ঘাসের দুধ

পোয়াতী ঘাসের বুক বেয়ে
শিশিরের দুধ ঝরে পড়ে
শুষে নিলে মা-হারা যুবক
প্রেমিকার নাভিমূল পড়ে

Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

সায়ন

নাকছাবি ভাঙা দেশ!


জানালা খোলো, আলোপাহাড়ের দেশ
প্রিয়ার কাজল, জেলের মধ্যে নাতাশার হাত মুঠো
বিদুৎ লিখি অন্ধগলির ভাষায়

নিষ্ঠুর চাঁদ, পাখিনীর ঈর্ষা বিলাপ
আয়না দেখে গণতন্ত্রের হাড়-মাস

মেঘ আসে, চন্দনকাঠের আগুন
দেওয়ালে কি আছে জানো? বিরাট ছোবল—

যত রাত গেছে কেটে
কাচের ছায়া
মনের উপর ছেয়ে গেল
নাকছাবি ভাঙা দেশ


কে যাও ওই পথে, আশ্রয়
পাথর এঁকে দেয় তোমার রক্তাক্ত নূপুর
কত ঢেউ ঝাপিয়ে পড়ে ছাদের মাটি
গাছের হাতে বাঁধা মধুবনী আঁচল

হরিণের জেগে থাকা চোখে নামে বৃষ্টিভরা মেঘ
ওই দেখো— কী বিরাট চুলে ফাঁস লেগেছে সন্ধ্যামালতি চাঁদ,
পীতাভ নদীঘর, জলের নীচে জল
এই গর্ভ বৃন্দাবন, আমাদের ভারতবর্ষ প্রাণ
বাধ ভাঙনের আলিঙ্গন

সমুদ্রের ওপারে সুন্দরী গাছের ঘর
নগরের আকাশ গলা চাঁদ নিয়ে পুঁথিপাঠ
পাথরে বসে স্পর্শ করে অক্সিজেনহীন দেশ


মাজারের ভিতর লুকিয়ে আছে মানুষ,
ইট পাথরের দেহ। সাঁইজি তার সাধনানীলের গান ধরতেই, উঁচুতে লাফ দিল পিতার কলজের আগুন।

তমালতলা আর বেনুবনছায়ার জলে— লালনের কোলজে রঙের ছায়া। জ্যোৎস্নার আলোয় ডুবে যাচ্ছে অলীক মানুষের সংসার!


আমরা ফিরে এলাম বধ্যভূমির আখরায়
স্বচ্ছন্দ মৃত্যুছাপ, প্রাচীন ভূমিতাপ গন্ধ।
পাঁজরের ইতিহাস লিখতে লিখতে আঁকড়ে ধরি ভগবানের কবজি… বরাহমিহিরের খাতা
মেঘের কাছে দেখি— বৃষ্টির ভেজা চুলের আকাশ

এখন সকাল হয় শিশির আর সায়ানাইড বিন্দুর মাঝে।


ঝড়ে পোড়া হাজার চাষির চিৎকার, থালায় কান্নার গ্রাস
বন্ধ দরজায় ওলট-পালট হয়ে যায়
যাকে তুমি কোনো একদিন
ছায়ামানুষের দেহ ভেবে চেয়েছিলে ভোট।

লোকটা দৌড়ে এল বহু দেশ, নগর, গ্রাম, খাপ পঞ্চায়েত— তবুও ওর কোনো দেশ নেই

এখন শুধু হাত ভরা করোটির বোঝা,
ডান হাতে স্ট্র্যাপ ছেঁড়া চটি।

 

Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

স্বজনকথা


গাছবৃত্তে লেখা পদ্য। গাছশীর্ষে ন্যুব্জ মাতা-পিতা
উঠে দেখছে কামপ্রবাহ; কালো আকাশ উন্মুক্ত স্তন।
“আয়” ডাকছে, “আয়” ডাকছে, আমি সে-স্তন মুঠোয় রাখি যেই
ঝরে পড়ল ন্যুব্জ মাতা, ন্যুব্জ পিতা— হলুদ বিদ্যুৎ।
শ্মশানবঁধূ কাঠ সাজাল, কাঠ জ্বালাল, গাছবৃত্তে লেখা
পারিবারিক হাড় জ্বলছে; চিতাকাষ্ঠে ন্যুব্জ মাতা-পিতা
কুঁকড়ে গেল; অন্ধকার; আলো ফুটলে ন্যাড়ামুণ্ডি হই।
মুঠো শক্ত, স্তনমাংস আদরে নয় ব্যথায় কাতরায়।

ন্যুব্জ মাতা, ন্যুব্জ পিতা একসঙ্গে বৈতরণী পার।
আমি দেখছি প্রতি পর্বে পাতাবর্ণ বাদামি হয়ে যায়।
“আয়” ডাকছে, “আয়” ডাকছে গাছবৃত্তে জন্ম নেওয়া জরা।
তর্পণের সময়কাল। মায়াকুণ্ডে চংক্রমণ করি।
গাছবৃত্তে লেখা পদ্য শিকড় ভেঙে আছড়ে পড়ে মাঠে।
ন্যুব্জ মাতাপিতার মুখ আকাশস্তন চুষছে সারারাত…


অন্ধকারে নেমে আসছি। স্বপ্নে কার খুকির চিৎকার
খুনদৃশ্য দেখার মতো তীক্ষ্ণ ভয়ে হঠাৎ জ্বলে ওঠে?
হত্যা এত কঠিন, তবু কোথাও কোনো প্রশিক্ষণ নেই।
অন্ধকারে নেমে আসছি। গঙ্গাজল, আমায় ত্রাণ দাও।
এখন যাকে অনাত্মীয় ভেবেছি, তার আত্মীয়-শরীর
গলা বাড়ায়। ছাগের গলা। খাঁড়ার মতো আমার স্পৃহা নামে।
অন্ধকারে মাথা গড়ায়। স্বপ্নে কার খুকির চিৎকার
খুনশব্দ শোনার মতো মুগ্ধ শোকে হঠাৎ জ্বলে ওঠে?

এখন শোক অনপনেয়। অথচ খুকি বোধের মতো চুপ।
কার যে মেয়ে! আমার? তবে স্বপ্নে কেন মুখোশ-পরিহিতা?
দেখেছে তার বিশাল সখা হত্যা শেষে শিশুর মতো কাঁদে।
অন্ধকারে নেমে আসছি। স্বপ্নে তার মাটির মতো হাত
আমার হাত স্পর্শ করে; রক্ত ছুঁয়ে মোমের মতো জ্বলে।
অনেক হল! গঙ্গাজল, বাপ-বেটিকে এবার ত্রাণ দাও।


এই আমার ঘর-দুয়ার। হিংস্র থেকে হিংস্রতর রোজ।
পশুর মতো দু-তিনজন। ক্ষুব্ধ খুব। হাঁড়ির জল ফোটে।
ফুটতে থাকি সপরিবার। ধোঁয়ার মতো অলীক, নিরাকার
এই আমার ঘর-দুয়ার শূন্যে উঠে শূন্য পেড়ে আনে।
বৃত্তে বসি। শূন্য খাই। চিন্তামণি বঁটিতে আঁশ ঘষে।
হিংস্র থেকে হিংস্রতর। ভাতের থালা বিষের চোটে নীল।
সে-বিষ শেষে কথামৃত। শরীর থেকে মায়া-প্রপঞ্চর
আদিম বীজ বেরিয়ে যায়; ঘর-দুয়ার মৃতের মতো চুপ…

এই আমার দুয়ার-ঘর। মন্দিরের সাপের মতো রোজ
দৈব কোনো লিঙ্গ ভেবে আমার আয়ু জড়িয়ে জেগে থাকে।
চিন্তামণি বঁটি জাগায়। আমার আঁশ সিঁটিয়ে যায় ভয়ে।
মাছের মতো দু-তিনজন। বেকুব খুব। কড়ায় তেল ফোটে।
আঁশের মায়া তলিয়ে গেছে। সবার দেহ নুন-হলুদে মাখা।
এই আমার ঘর-দুয়ার। চিন্তামণি, জমিয়ে রাঁধো। খাই…


রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। উড়ে মরছে আরোগ্যের ছাই।
ঘোর চিনছি। জড় চিনছি। বাস্তবিক জড় কিচ্ছু নেই।
প্রাণবাষ্প ঘিরে ধরছে। দূরে মৃত্যু একা। অপেক্ষায়…
ঘোর কিন্তু যুবতী আয়া। রাত বাড়লে পথ্য কাছে রাখে।
খাদ্য গেল ভিতরে আর তখন থেকে প্রবল বমিভাব।
রোগবন্ধু শিয়রে বসে; কানের পাশে ঠান্ডা মুড়ো নামে—
“এখন থেকে লেখার হাত দাসানুদাস, বশংবদ নয়।”
রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। উড়ে যাচ্ছে পঙ্গু স্থিতিকাল।

স্বজন ছিল লিখনকাম। এখন হাত আমার আওতায়
থাকে না আর; পৃষ্ঠা বোঝে রমণগতি বদলে গেছে খুব।
সে স্বৈরিণী, তবুও তার শরীর কাঁপে। গর্ভপথ জড়।
কিন্তু, দ্যাখো, জড় চিনেছি। বাস্তবিক জড় কিচ্ছু নেই।
প্রাণবাষ্প ফিকে হচ্ছে। মরণ কাছে। রভস উবে যায়…
রোগ বিদ্যা। রোগ বন্ধু। ক্রমান্বয়ে আমার মাথা চাটে।


ক্ষণজন্মা আমি একটি সুলক্ষণা মেয়ে পয়দা করে
স্ত্রী-র গর্ভ খুশি করেছি। আঁতুর ম-ম করেছে তার ওমে।
আমার ঘাড়ে তিন-চারটে ফুটোর মতো জন্মদাগ দেখে
গুরু আমায় বলেছিলেন, “গতজন্মে সদ্যোজাত মৃগ
ছিলিস, তোর ঘাড় কামড়ে এক বাঘিনী আরামে খেয়েছিল…”
আমার স্ত্রী বা মেয়ের জ্ঞানে এ-সব কিছু রাখিনি। তবু রাতে
খেলাচ্ছলে মেয়ে আমার ঘাড়ে নরম থাবা বোলায়, বলে—
“এগুলো ছুঁলে ব্যথা লাগছে? এ-দাগগুলো কোথায় পেলে, বাবা?”

স্বপ্নে দেখি মেয়ে আমার সেই বাঘিনী; চক্ষু জ্বেলে ঘোরে।
এই আমায় দেখল। ছুট। ছিটকে যায় অরণ্যের মাটি।
আর্তনাদ। দু-একবার। ঘাড়ের পেশী কামড় মেখে স্থির।
আদরমুখো তিন শাবক কিছুটা খেল… বাকিটা মেয়ে খায়…
“এ-দাগগুলো কোথায় পেলে? এ-গুলো ছুঁলে ব্যথা লাগছে, বাবা?”
ঘুমপুতুল মেয়ের গায়ে খুঁজে মরছি কালো ডোরার শোক…


মন্ত্রখাকী ঘর আমার। চিবিয়ে খায় মারণ-উচাটন।
বশবর্তী রাখতে চাই। কিন্তু ঘর এমন চঞ্চলা,
মধ্যরাতে উলটে দেয় লক্ষ্মীভাঁড়। পয়সা ছড়াছড়ি।
পয়সা যে-ই গড়িয়ে পড়ে, সারা উঠোন প্রবল বেঁকে যায়।
মন্ত্রখাকী ঘর আমার। যাগ-যজ্ঞে নরমুণ্ড ছোঁড়ে।
নরকরোটি অগ্নি ছোঁয়। সত্ত্বগুণ সিঁটিয়ে যায় ভয়ে।
ভয়? না মোহ? চিলেকোঠায় চুল বিছিয়ে দুর্বিপাক বসে।
যজ্ঞাহুতি কিচ্ছু নেই। সমিধ ডোবে মারণী বন্যায়…

শুধুমাত্র একতারার পরাৎপর ধুন জাগালে কেউ,
ঘর-দুয়ার ঘুমায়। সুখ। খোকার মুখে চাঁদের দুধ নামে।
বাপ-পিতেমো যে-শাপ পেয়ে অন্ধপ্রাণ, দৃশ্য থেকে দূর,
সে-শাপ নেভে; দৃশ্যাতীত স্বপ্নঘোরে দৃশ্য হয়ে যায়।
অলপ্পেয়ে ঘর আমার অলখ্ সাঁই দেখার লোভে-লোভে
আমায় ফের বাউল করে ভাসিয়ে দিল ত্রিনদী সঙ্গমে।

Categories
2021-JUNE-KOBITA কবিতা

শানু চৌধুরী

বোধের চিরায়ত দাগ


প্রকোপ থেকে উঠে আসে
ভিক্ষুণীদের প্রাতিমোক্ষ লোকোত্তরবাদ
বেলাশেষের তন্ত্র সংগীত,
আমাদের স্বরচিত গুম্ফায় কোনোদিন আসেনি
ডাকার্ণবের বিধিত অনুক্ষণ।
আমি জানি সাধনার ভিতর ছড়িয়ে থাকে কথা
অথচ বর্ণময়ী মায়ায় ভেদ হল না আমাদের সন্ধ্যাভাষা
তবু প্রকাশ হয়, মুদ্রা ও যন্ত্রের প্রহেলী
যেখানে অভিনিবেশ করেছিল যৌবন যোগিনীর সঞ্চয়।


শাদা শালুর ওপর শান্ত মুদ্রাটি
ছড়িয়ে আছে অর্হৎ-এর অপেক্ষায়
তবু রসায়ন থেকে চুঁইয়ে পড়ে আকাঙ্ক্ষার বস্তুসকল
আনাজ শরীরে।
বোধিচিত্ত ও নিরাত্মা দেবী উন্মত্ত হও, বিহারে যাও
কারণ, আমাদের শবরে জ্ঞান-চৈতন্য বলে কিছু নেই আর
শুধুই মিছিমিছি ফাঁকা হল
মানুষের কঙ্গুরমোচিত জোৎস্নাবাড়ি


শুঁড়িনীর মদ বেচার উপমায়
ভিজেছিল বিবর্ণ চীবরের রশ্মিগুলি
অথচ দেখা হল না ধর্মের দ্রোহিতা দিয়ে
শিষ্যের কপ্পতি!
হে ভিক্ষু কোন ভুলে তুমি শিঙের পাত্রে রেখেছিল নুন?
যেখানে সঞ্চয়ের অপরাধ কট্টর হতে হতে
জন্ম দিল, সিঙ্গিলোণ কপ্পোর ধারা?


নিসীদন, তোমার কুয়াশায় কাটে
ঘনঘোর তেনজিন।
অথচ উপোষথ-শালায় আজ্ঞা ভেঙে গেলে
জেগে ওঠে চৈতন্য রত্নের কাহন।
আমি বলি শিথিল হও।
সোনারূপা ছুঁয়ে দেখে নাও দশবুত্থর
ধর্মবিরুদ্ধতা!


পাটা সিন্দুকের ভিতর ছিল গণিতের ভুল
যেখানে ভিক্ষুদের দানশীল ফোঁটা গুণে নেয় বছরের হিসেব
জেনে রাখো, পাটলিপুত্রের সংগীত
স্বীকার করেনি মহাসাংঘিকের দল
তবু বিনয় বলতে গেলে কর্মকে মানতে হয়।